অর্থনীতি
ড. মো. আইনুল ইসলাম
প্রকাশ : ২৯ অক্টোবর ২০২৫ ১৪:১৫ পিএম
আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০২৫ ১৪:১৭ পিএম
২০২৫ সালের অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার কেবল একাডেমিক অর্জনের স্বীকৃতি নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চিন্তার এক ঐতিহাসিক পুনর্মূল্যায়ন। এ বছর পুরস্কারপ্রাপ্ত তিন অর্থনীতিবিদ- জোয়েল মোকির, ফিলিপ আগিয়োঁ ও পিটার হাউইট অর্থনীতির সেই মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন, যা মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্রবৃদ্ধিকে রহস্যময় করে তুলেছে- কেন কিছু সমাজ উন্নত হয়, আর কিছু সমাজ স্থবির থাকে? তাদের গবেষণা, বিশেষ করে ‘উদ্ভাবননির্ভর প্রবৃদ্ধি’ ও ‘সৃজনশীল ধ্বংসের তত্ত্ব’, আধুনিক অর্থনীতিকে নতুন দৃষ্টিকোণ দিয়েছে, যা বাংলাদেশের বাস্তবতায় গভীর প্রাসঙ্গিকতা রাখে। মোকিরের গবেষণায় দেখা যায়, ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে উদ্ভাবন কখনোই হঠাৎ করে আসেনি- এটি সমাজের জ্ঞানভিত্তিক সংস্কৃতির ফসল। তার মতে, শিল্পবিপ্লবের সাফল্য শুধু প্রযুক্তিগত নয়, বরং এটি ছিল জ্ঞানের প্রতি সমাজের উন্মুক্ত মনোভাবের ফল। অর্থাৎ উদ্ভাবন তখনই টেকসই হয় যখন সমাজ পুরনো ধ্যানধারণাকে ভেঙে নতুনকে গ্রহণ করতে প্রস্তুত থাকে। অন্যদিকে আগিয়োঁ ও হাউইট তাদের ১৯৯২ সালের মডেলে ব্যাখ্যা করেছেন, উদ্ভাবন একটি দ্বিমুখী শক্তি- এটি নতুন সৃষ্টি করে, কিন্তু পুরনোকেও ধ্বংস করে। তাদের এই ‘সৃজনশীল ধ্বংসের তত্ত্ব’ অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ গতিশীলতা বোঝার সবচেয়ে প্রভাবশালী ধারণাগুলোর একটি, যা শুম্পিটারের পুঁজিবাদ বিশ্লেষণের আধুনিক সংস্করণ।
‘সৃজনশীল ধ্বংসের তত্ত্ব’ অনুসারে, প্রতিটি নতুন উদ্ভাবন পুরনো প্রযুক্তি বা শিল্পকে অচল করে দেয়, কিন্তু সেই ধ্বংসের ভেতর দিয়েই জন্ম নেয় নতুন প্রবৃদ্ধি। যেমন ইন্টারনেট পুরনো প্রিন্ট মিডিয়াকে কোণঠাসা করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে তৈরি করেছে ডিজিটাল অর্থনীতি ও নতুন কর্মসংস্থান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই প্রক্রিয়াটি স্বাভাবিকভাবে ঘটেছে, কারণ সেখানে উদ্ভাবনকে বাধাগ্রস্ত করার মতো প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবন্ধকতা তুলনামূলকভাবে কম। সিলিকন ভ্যালির স্টার্টআপ সংস্কৃতি এই সৃজনশীল ধ্বংসের সবচেয়ে সফল উদাহরণ- যেখানে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো প্রতিনিয়ত পুরনো ব্যবসায়িক মডেলকে প্রতিস্থাপন করছে। ১৯৯০-এর দশকে যেসব প্রতিষ্ঠান আধিপত্য বিস্তার করেছিল, তাদের অনেকেই আজ বিলুপ্ত; কিন্তু এই প্রতিযোগিতাই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে গতিশীল রেখেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের বাস্তবতা অনেকটাই বিপরীত। এখানে উদ্ভাবন প্রক্রিয়াকে বারবার বাধাগ্রস্ত করেছে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং প্রশাসনিক অদক্ষতা।
নোবেল কমিটি বলেছে, ‘প্রবৃদ্ধি কখনোই নিশ্চিত নয়; মানবসভ্যতার ইতিহাসে স্থবিরতাই ছিল স্বাভাবিক’। এই উক্তি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসের জন্য গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশের দীর্ঘ পথচলা মূলত স্থবিরতা থেকে প্রবৃদ্ধির দিকে উত্তরণের ইতিহাস। ঔপনিবেশিক আমলে বাংলার অর্থনীতি ছিল কৃষিনির্ভর ও একমুখী, যেখানে শিল্পায়ন ছিল অবহেলিত। ব্রিটিশ শাসনের শোষণমূলক নীতিতে শিল্প ধ্বংস হয় এবং খাদ্যঘাটতি ও দারিদ্র্য চিরস্থায়ী রূপ নেয়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ আবারও বিধ্বস্ত অর্থনীতি নিয়ে যাত্রা শুরু করে। ১৯৭০-এর দশকে প্রবৃদ্ধি ছিল ২-৩ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
দুর্ভিক্ষ, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও দুর্নীতি প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে। কিন্তু ২০০০-এর দশক থেকে বাংলাদেশ এক বিস্ময়কর উত্থানের সাক্ষী হয়- প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশে পৌঁছে, তৈরি পোশাক শিল্প বিশ্ববাজারে জায়গা করে নেয় এবং দারিদ্র্য হার নাটকীয়ভাবে কমে যায়। তবে এই প্রবৃদ্ধি মূলত শ্রমনির্ভর, উদ্ভাবননির্ভর নয়। তৈরি পোশাক খাত এখনও প্রধান রপ্তানি উৎস (৮০ শতাংশ) কিন্তু উৎপাদনপ্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে প্রযুক্তিগতভাবে অনুন্নত। ফলে প্রতিযোগিতা ও উৎপাদনশীলতা স্থবির হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। এটি ঠিক সেই পরিস্থিতি, যেটি মোকির ও আগিয়োঁ-হাউইটের তত্ত্বে বলা ‘উদ্ভাবনের স্থবিরতা’ হিসেবে পরিচিত। উদ্ভাবন না ঘটলে পুরনো শিল্পগুলো অচল হয়, কিন্তু নতুন শিল্প না গড়ে উঠলে অর্থনীতি স্থবিরতায় নিমজ্জিত হয়- বাংলাদেশ এখন এই সংকটেই রয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন নতুন বাজার সৃষ্টি করে, যেখানে ফিনটেক, এআই বা ক্লিন এনার্জি শিল্প দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। বাংলাদেশেও একই প্রবণতা দেখা দিচ্ছে, তবে ক্ষুদ্র পরিসরে। বিকাশ, নগদ বা রকেটের মতো মোবাইল আর্থিক সেবাগুলো ‘সৃজনশীল ধ্বংসের’ উদাহরণ- এরা ঐতিহ্যবাহী ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে আংশিক প্রতিস্থাপন করেছে এবং কোটি মানুষকে অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির সুযোগ দিয়েছে। কৃষিতে জলবায়ু-সহনশীল ধান, সবজি ও মাছের জাত উদ্ভাবন পুরনো কৃষিপদ্ধতিকে প্রতিস্থাপন করে উৎপাদন বাড়িয়েছে।
ডিজিটাল বাংলাদেশ উদ্যোগ প্রশাসনিক সেবাকে প্রযুক্তিভিত্তিক করেছে। তবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো গবেষণা ও উন্নয়নে (আরঅ্যান্ডডি) বিনিয়োগের অভাব। বর্তমানে এটি জিডিপির মাত্র ০.৩ শতাংশ, যেখানে দক্ষিণ কোরিয়ায় ৪.৯ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রে ৩.৫ শতাংশ। এর ফলে দেশীয় উদ্ভাবন বিকাশের জায়গা সংকুচিত, আর বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। উপরন্তু প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা ও দুর্নীতিবিরোধী কাঠামোর দুর্বলতা নতুন প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তাদের বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।
২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ছিল ৭.২ শতাংশ, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা নেমে আসে ৫.২ শতাংশে এবং ২০২৪-২৫ সালের প্রাক্কলন অনুযায়ী তা আরও কমে ৩.৯৭ শতাংশে পৌঁছবে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক উদ্ভাবন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানও ১১২ থেকে নেমে ১০৬-এ এসেছে, যা উন্নতির ইঙ্গিত দিলেও এখনও বিশ্ব মানদণ্ডের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি টেকসই করতে হলে উদ্ভাবনের হার বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। বাংলাদেশের অর্থনীতিকে উদ্ভাবননির্ভর করতে হলে তিনটি দিককে প্রাধান্য দিতে হবে। প্রথমত, শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন- যেখানে প্রযুক্তি, গবেষণা ও উদ্যোক্তার দক্ষতা বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, উদ্ভাবনবান্ধব নীতি ও প্রণোদনা, যেমন- স্টার্টআপ ইনকিউবেশন, ট্যাক্স ছাড় এবং প্রযুক্তি হস্তান্তর সহজীকরণ। তৃতীয়ত, গবেষণায় বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ, যা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের মধ্যে অংশীদারত্ব তৈরি করবে।
রবার্ট সলোর প্রবৃদ্ধি তত্ত্ব অনুযায়ী, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অর্ধেকেরও বেশি আসে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন থেকে। এই সত্যটি বাংলাদেশের জন্য আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এখানে দারিদ্র্য হ্রাসের দ্রুততার পেছনে উদ্ভাবনেরই অবদান ছিল। তৈরি পোশাক শিল্পে আধুনিক যন্ত্রপাতি, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা ও দক্ষ নারীকর্মীর সংযোজন উৎপাদনশীলতা বাড়িয়েছে; কৃষিতে উচ্চফলনশীল জাত, ডিজিটাল কৃষি পরামর্শ ও বাজার সংযোগ কৃষকের আয় স্থিতিশীল করেছে; আর্থিক প্রযুক্তি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পুঁজিসম্পৃক্তি বাড়িয়েছে। কিন্তু নোবেল কমিটির ভাষায়, ‘উদ্ভাবনকে বাধাগ্রস্ত করলে প্রবৃদ্ধি স্থবির হয়’- এই সতর্কবার্তাটিই আজ বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দুর্নীতি, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রশাসনিক জটিলতা যদি নতুন উদ্যোগকে দমন করে, তবে দেশ ‘সৃজনশীল ধ্বংসের’ ইতিবাচক দিকটি কাজে লাগাতে পারবে না। তুলনামূলকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে উদ্ভাবনকে স্বাগত জানানো হয়, এমনকি যখন তা পুরনো শিল্পকে ধ্বংস করে তখনও। সেখানে ব্যর্থতা শেখারই এক অংশ, কিন্তু বাংলাদেশে ব্যর্থ উদ্যোক্তা সামাজিকভাবে নিরুৎসাহিত। এই সাংস্কৃতিক ব্যবধানই দুই দেশের মধ্যে উদ্ভাবনী ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় পার্থক্য। অর্থাৎ, ২০২৫ সালের অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার আমাদের শেখায়- উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক নীতির ফল নয়, এটি একটি মানসিকতার রূপান্তর। বাংলাদেশ যদি সমাজে উদ্ভাবন-সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারে, গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ায় এবং সৃজনশীল ধ্বংসকে ভয় না পায়, তবে স্থবিরতা ভেঙে টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো উদ্ভাবননির্ভর অর্থনীতি আজও বাংলাদেশের জন্য একটি দৃষ্টান্ত- যেখানে ধ্বংস মানেই শেষ নয়, বরং নতুন সূচনা।
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদদের বার্তাটি স্পষ্ট- উদ্ভাবনই টেকসই উন্নয়নের মূল চালক, আর স্থবিরতা মানে পতনের পূর্বাভাস। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সৃজনশীল ধ্বংসের তত্ত্ব প্রয়োগ মানে হলো- পুরনো অদক্ষ ব্যবস্থাকে প্রতিস্থাপন করে নতুন উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে প্রবৃদ্ধির নতুন ধারা সৃষ্টি করা। যদি আমরা সাহসী নীতি পরিকল্পনা প্রণয়ন ও সমাজে জ্ঞানভিত্তিক মনোভাব গড়ে তুলতে পারি, তবে বাংলাদেশও একদিন উদ্ভাবননির্ভর প্রবৃদ্ধির বিশ্বনেতৃত্বে জায়গা করে নিতে পারবে।
ড. মো. আইনুল ইসলাম
অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়