× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

মানুষের অঙ্গ পাচার

কিডনি বাণিজ্যের জালে বাংলাদেশ

ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব ও দাউদ ইব্রাহিম হাসান

প্রকাশ : ২৯ অক্টোবর ২০২৫ ১৪:১০ পিএম

কিডনি বাণিজ্যের জালে বাংলাদেশ

এক দশক আগেও কিডনি ব্যবসা ছিল বিচ্ছিন্ন ও স্থানীয় দালালদের দ্বারা পরিচালিত একটি ছোট অপরাধ। তখন দরিদ্র মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে তাদের অল্প টাকায় কিডনি কিনতে বাধ্য করা হতো। সেই সময়টা ছিল অনেকটা বিচ্ছিন্ন একটি বদ্বীপের মতো, যেখানে অপরাধের ঢেউ বড় আকার ধারণ করত না। কিন্তু এখন চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই অবৈধ ব্যবসা এখন একটি সুসংগঠিত আন্তর্জাতিক চক্রে পরিণত হয়েছে, যার সঙ্গে উচ্চপদস্থ ডাক্তার, হাসপাতাল এবং বিত্তশালী মানুষ জড়িত। এই চক্রটি মূলত দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র ও অশিক্ষিত মানুষদের টার্গেট করে। তাদের ঋণের প্রলোভন, উন্নত জীবনের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি বা চাকরির আশ্বাস দিয়ে ফাঁদে ফেলা হয়। আন্তর্জাতিক মানব পাচার চক্রের মতো করেই এই অপরাধীরা কাজ করে।

এই চক্রটি প্রথমে গ্রামের অসহায় পরিবারগুলোকে চিহ্নিত করে। তারপর বিভিন্ন প্রলোভন যেমন- বিদেশে ভালো চাকরি, মেয়ের বিয়েতে টাকা বা ফসলের ক্ষতির জন্য ঋণ দেওয়ার কথা বলে তাদের বিশ্বাস অর্জন করে। একবার যদি তারা সেই ফাঁদে পা দেয়, তখন কিডনি বিক্রির প্রস্তাব আসে। প্রাথমিকভাবে অনেকেই রাজি হতে চায় না, কিন্তু দালালরা তাদের মানসিক চাপ ও মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে রাজি করিয়ে ফেলে। এই প্রক্রিয়ায় গ্রাম থেকে শহরে, শহর থেকে দেশের নামকরা ক্লিনিকে এবং শেষ পর্যন্ত বিদেশে কিডনি পাচার করা হয়। একটি কিডনির জন্য বিক্রেতাকে মাত্র ২-৩ লাখ টাকা দেওয়া হয়, কিন্তু সেই কিডনি গ্রহীতার কাছে ২০-৩০ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়। এই বিপুল অঙ্কের মুনাফা শুধু অপরাধীদেরকেই নয়, কিছু অসাধু ডাক্তার এবং হাসপাতালকেও এই ঘৃণ্য কাজে যুক্ত হতে উৎসাহিত করছে।

কিডনি বিক্রির পরে বিক্রেতার স্বাস্থ্যের কোনো খোঁজ রাখা হয় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারা স্থায়ীভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে, যা তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তোলে। কিডনি বিক্রি করে হয়তো কিছুদিনের জন্য আর্থিক সংকট কেটে যায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির কারণে তারা আর কখনও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে না। এই চক্রের সঙ্গে জড়িত উচ্চবিত্তশ্রেণি নিজেদের অর্থের জোরে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যায়, আর দরিদ্র বিক্রেতা জীবনভর ভুগতে থাকে।

যদি এই অবৈধ কিডনি ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে এর ভবিষ্যৎ পরিণতি হবে ভয়াবহ। বর্তমানেই আমরা এর প্রভাব দেখতে পাচ্ছি। ছাত্রসমাজ থেকে শুরু করে শিশুরা পর্যন্ত এই সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে অসৎ দালালেরা ছাত্রদের লোভ দেখিয়ে বা ঋণের জালে জড়িয়ে তাদের কিডনি বিক্রি করতে প্রলুব্ধ করছে। অন্যদিকে, মানব পাচার চক্রের মাধ্যমে শিশুদেরকেও টার্গেট করা হচ্ছে।

ভবিষ্যতে দারিদ্র্য ও চিকিৎসার উচ্চ ব্যয়ের কারণে এই ব্যবসা আরও বড় আকার ধারণ করবে। এটি শুধু স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতিই বাড়াবে না, মানব পাচারের মতোই এটি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সুনামকে ক্ষুণ্ন করবে। 

অতীতের বিচ্ছিন্ন অপরাধ এখন যে সুসংগঠিত আন্তর্জাতিক চক্রে পরিণত হয়েছে, তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে আমাদের সবাইকে একত্রিত হতে হবে। তরুণ সমাজকে এই অপরাধের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। বিভিন্ন সামাজিক সংস্থা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো গণসচেতনতা তৈরির কাজ করতে পারে। যেমন, একটি স্কুল যদি প্রতিবছর কিছু সচেতনতামূলক কর্মশালার আয়োজন করে, যেখানে কিডনি বিক্রির ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরা হবে, তবে ছাত্ররা এই ধরনের প্রলোভন থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারবে। একইভাবে, পাড়া-মহল্লার ক্লাবগুলো দরিদ্র মানুষদের অর্থনৈতিক সহায়তার জন্য ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি বা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারে, যাতে তারা সহজেই দালালদের ফাঁদে না পড়ে। এই উদ্যোগগুলো যদি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, তবে তা বাংলাদেশের একটি সঠিক কার্যব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করবে।

এই সমস্যাটি গভীর এবং বহুমুখী। এর সমাধানে প্রয়োজন গভীর চিন্তা ও সমন্বিত পদক্ষেপ। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে আরও কঠোর হতে হবে এবং আন্তর্জাতিক চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে হবে। যেসব হাসপাতাল ও ডাক্তার এই অপরাধের সঙ্গে জড়িত, তাদের লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর শাস্তির বিধান করা অপরিহার্য। পাশাপাশি, দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে এই অপরাধের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করতে হবে এবং তাদের অর্থনৈতিক সহায়তা দিতে হবে। গণমাধ্যমে এই বিষয়ে প্রতিবেদন ও আলোচনা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন, যাতে অপরাধীরা ধরা পড়ে এবং সাধারণ মানুষ সচেতন হয়।

এই সমস্যাটি প্রতিরোধযোগ্য এবং এটি সম্ভব যদি আমরা সবাই সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করি। একটি দৃঢ় রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে, যা আকস্মিক দুর্ঘটনা মোকাবিলায় সাহায্য করবে। যে সমাজে একটি মানুষের জীবন তার অঙ্গের মূল্যে নির্ধারিত হয়, সেই সমাজ সভ্য নয়।

ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব, সহকারী অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয

দাউদ ইব্রাহিম হাসান, রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা