মেট্রোরেল ট্র্যাজেডি
ড. তানভীর মুশতাফী
প্রকাশ : ২৯ অক্টোবর ২০২৫ ১৪:০৬ পিএম
আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০২৫ ১৪:১১ পিএম
শহরটা দুপুরে একটু থমকে গেল। ফার্মগেট স্টেশনের নিচে হঠাৎ ভারী কিছু পড়ে একজন মানুষ মারা গেলেন। ট্রেন থেমে গেল। রাস্তার ওপর ধুলা উড়ল, লোকজন জটলা করল, মোবাইলে ভিডিও তুলল। কিন্তু ক্যামেরার ভিড়ে যে প্রশ্নটা বারবার মাথায় উঠছিল, সেটি আমি চুপচাপ করে ফেললাম। এটি কীভাবে সম্ভব হলো। কে এর দায় নেবে।
মৃত মানুষের নাম আবুল কালাম। শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার ঈশ্বরকাঠি গ্রাম থেকে এসেছিলেন শহরে, হয়তো কাজের সন্ধানে, হয়তো এক টুকরো ভালো জীবনের খোঁজে। নামটা খবরের কাগজে ছাপা হবে, তারপর ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাবে। নামটা কাগজে ছোট, কিন্তু তার ভেতরে থাকে একটি পরিবারের ধোঁয়া ওঠা রান্নাঘর, রোদে শুকানো উঠোন, আর এক মায়ের নোনতা অশ্রু। সেই বাড়িটায় সন্ধ্যা নামবে কেমন করে, কল্পনা করলে বুকের ভেতরটা টনটন করে ওঠে। সরকারের উপদেষ্টা এসে বললেন, পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি হয়েছে, দুই সপ্তাহে রিপোর্ট দেবেন। পরিবারের দায়িত্ব নেবে ডিএমটিসিএল, প্রাথমিক ক্ষতিপূরণ পাঁচ লাখ টাকা। এই কথাগুলো শুনলে ভালোই লাগার কথা। তবু মনে হয়, আমরা কি খুব সহজে সবকিছুর দাম বেঁধে ফেলতে শিখে গেছি। পাঁচ লাখ টাকা। একটা জীবন। একটা ভুল। তারপর আর কিছু না। না, এটা এমনভাবে শেষ হওয়ার কথা নয়।
আরেকটি খবরও একই সঙ্গে ভাসল। যে জিনিসটা মাথায় পড়ে মানুষটা মারা গেলেন, সেটি পড়ে চায়ের একটি দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, দোকানদার আমির আলীসহ দুজন আহত। ভাবুন, ফুটপাতে বিকালের দিকে যে ছোট দোকানগুলোতে আমরা দাঁড়িয়ে চা খাই, আড্ডা দিই, সেখানে আজ মৃত্যু এসে হাত রেখেছিল। কারও মাথার ওপর দিয়ে চলে গেছে, কারও ঘাড় ছুঁয়ে গেছে। শহর বলে কথা, এখানে মাথার ওপরে সবসময় কিছু না কিছু ঝুলে আছে। তবু এভাবে নয়। এখানেই আমার আসল কথা। এটা নতুন কিছু নয়। ঠিক তেরো মাস আগে ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে একই ধরনের বিয়ারিং প্যাড পড়ে সার্ভিস বন্ধ হয়েছিল। আমরা তখন ভেবেছিলাম, বড় ক্ষতি হয়নি, ভাগ্য ভালো। আচ্ছা, সেই ঘটনার পরে কী হলো। আমরা কি পূর্ণাঙ্গ, প্রকাশ্য তদন্ত রিপোর্ট দেখেছি। টেন্ডার ডকুমেন্ট, সরবরাহকারীর মান নিয়ন্ত্রণ, সাইটের তদারকি, সবকিছুর সূক্ষ্ম খোঁজখবর কি জনগণের সামনে এসেছে। না কি কয়েকটি বৈঠক, কয়েকটি ফাইলে সই, তারপর নীরবতার ওপরে আরেকটি নীরবতা। যদি সত্যিই শেখা হতো, আজ আবার কেন।
শুরুটা টেন্ডার দিয়ে করি। এখানেই আলো দরকার সবচেয়ে বেশি। বড় প্রকল্পে কাগজ নিখুঁত, কিন্তু কাজের জায়গায় তিনটি স্থায়ী ফুটো দেখা যায়। প্রথমত, যোগ্যতার শর্ত ধীরে ধীরে নরম হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত, সরবরাহকারীর মান যাচাই কাগজে হয়, মাঠে হয় না। তৃতীয়ত, কাজ শেষে স্বাধীন পরীক্ষা ও প্রকাশ্য অডিট আমরা করি না, বা করলে প্রকাশ করি না। এই তিনটির যেকোনো একটি ঘটলে, যে অংশটা আকাশের নিচে ঝুলে থাকে, সেটি একদিন মাটিতে পড়েই যায়। আজ পড়েছে একজন মানুষের জীবনের ওপর। সরকারি কর্মকর্তা আর প্রকৌশলীরা এই শহরের সুরক্ষার প্রহরী। আমি জানি, সিস্টেমের ভেতরে কাজ করা সহজ নয়। তবু পেশাগত সততা বলে একটা জিনিস আছে। আগেরবার যখন একই ধরনের অংশ পড়ে গিয়েছিল, সেটি ছিল সতর্কবার্তা। তখনই করিডোরজুড়ে জরুরি পরিদর্শন, ব্যাচভিত্তিক নমুনা পরীক্ষা, প্রয়োজনে পরিবর্তন- এসব হওয়া উচিত ছিল। মৃত্যুটা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে, করা কাজ যথেষ্ট হয়নি। তাই আর দায়িত্ব ঝেড়ে ফেললে চলবে না। নামসহ জবাবদিহি চাই, কোথায় কোথায় ভুল, সবটা খুলে বলতে হবে, অস্বস্তি স্বীকার করেই।
আজকের ঘটনাকে ঘিরে বলা হচ্ছে, পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে, প্রয়োজনে চাকরির ব্যবস্থা করা হবে। ভালো কথা। কিন্তু আরও জরুরি কথা থাকছে। তদন্তের অন্তর্বর্তী রিপোর্ট ১৪ দিনের মধ্যে প্রকাশ করুন, পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট ৩০ দিনের মধ্যে। টেন্ডার ডকুমেন্ট, সরবরাহকারীর কিউসি রিপোর্ট, সাইট সুপারভিশনের ডায়েরি, সবকিছু জনসমক্ষে আনুন। সত্য বেরোতে দিন, ভাঙনটা ছিল নথিতে, না মাঠে। তাতে কিছু সম্মান কাঁপবে, কিন্তু শহরের মাথাটা টিকে যাবে। আরেকটা বিষয় স্পষ্ট করা দরকার। আজ ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়েছে। ঠিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু এটাও বোঝায়, ঝুঁকি হয়তো এক জায়গায় আটকে নেই। আজ যদি একটি অংশ পড়ে, পাশের অংশগুলো কেমন আছে, সেটা জানতে আমাদের অপেক্ষা করা উচিত নয়। সিস্টেম মানে পুরো সিস্টেম। আমরা টুকরো টুকরো করে নিরাপত্তা বানাতে পারি না।
কিছু কথা সরাসরি বলা যাক, সহজ ভাষায়। খারাপ জিনিস কীভাবে ঢুকে পড়ে। ঢুকে পড়ে যখন আমরা সুবিধার জন্য চোখ বুজে থাকি। ঢুকে পড়ে যখন ফাইলে সব ঠিক আছে বলে সই করে ফেলি, কিন্তু মাঠে গিয়ে তাকাই না। ঢুকে পড়ে যখন যে ইঞ্জিনিয়ার আপত্তি তোলে, তাকে কোণঠাসা করে রাখা হয়, আর যে আপত্তিই তোলে না, সে হয়ে ওঠে প্রিয় মানুষ। এই সংস্কৃতির মূল্য আমরা সবাই দিচ্ছি। কেউ টাকা দিয়ে, কেউ অপেক্ষা দিয়ে, আর আজ একজন প্রাণ দিয়ে। আজকের মানুষের মৃত্যুকে আমরা কি কেবল সংবাদে রেখে দেব। নাকি এটাকে শহরের চরিত্র বদলানোর একটা সূচনা করব। আমি চাই, আমরা দ্বিতীয়টাই করি। খুব সাধারণ এক গল্প। সকালে বেরোনো মানুষ দুপুরে আর ঘরে ফিরলেন না। তবু যদি কেউ জবাব না দেয়, কেউ সরে না দাঁড়ায়, সেটা চরম অন্যায়। দায়িত্বশীলরা আগে সত্যটা বলুন, পরের ধাপে ভুলগুলো ঠিক করেন, আর শেষ ধাপে ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দিন।
আমি জানি, লেখা পড়ে শহর বদলায় না। তবু লেখার কাজ হলো মনে করিয়ে দেওয়া। আবুল কালামের নামে আজ আমরা একটা ন্যায্যতা চাই। পরিবারের পাশে দাঁড়ানো তো আছেই, তার সঙ্গে সত্য প্রকাশ এবং দায় নির্ধারণ। আর টেন্ডার থেকে মাঠ পর্যন্ত কঠোর শুদ্ধি দোকানটা আবার দাঁড়াবে, আমির আলীও হয়তো আগের মতোই চা ঢালবেন। তবু যে মানুষটা আর ফিরবেন না, তার জায়গাটা চিরকাল ফাঁকাই থাকবে। তাই কথা শেষ করি ব্যক্তিগত অনুরোধ দিয়ে- শহরটা নিরাপদ চাই।
ড. তানভীর মুশতাফী
সহযোগী অধ্যাপক, পুরকৌশল ও পরিবেশ প্রকৌশল বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়