× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

কূটনীতি থেকে অর্থনীতি

চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের ৫০ বছর

সাইফুল ইসলাম শান্ত, কলাম লেখক

প্রকাশ : ২৮ অক্টোবর ২০২৫ ১১:২০ এএম

চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের ৫০ বছর

পঞ্চাশ বছর, একটি রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের ইতিহাসে সময়টা অল্প নয়। ১৯৭৫ সালের ৪ অক্টোবর বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে এই অর্ধ শতাব্দীতে দুই দেশ পারস্পরিক বোঝাপড়া, সহযোগিতা ও আস্থার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সময়ের সঙ্গে সম্পর্কের রূপ বদলেছে কিন্তু এর মূল ভিত্তি পারস্পরিক সম্মান ও অভিন্ন উন্নয়ন আকাঙ্ক্ষা এখনও অটুট রয়েছে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর প্রথম দিকের বছরগুলোয় চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কিছু রাজনৈতিক জটিলতা ছিল। বিশেষ করে কোল্ড যুদ্ধের সময়কার বৈশ্বিক মেরূকরণের কারণে। কিন্তু দেশ স্বাধীনের চার বছর পর উভয় দেশ দ্রুতই বাস্তবমুখী কূটনীতির পথে অগ্রসর হয়। ধীরে ধীরে বাণিজ্য, সংস্কৃতি ও অবকাঠামো উন্নয়নকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে নতুন মাত্রার বন্ধুত্ব। আজ ৫০ বছর পর চীন বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী ও বাণিজ্য অংশীদার।

অর্থনীতি ও বাণিজ্যে নতুন বাস্তবতা

বর্তমানে বাংলাদেশ ও চীনের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ২৮ বিলিয়ন ডলার ছুঁয়েছে, যার মধ্যে চীন বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ আমদানির উৎস। পোশাক শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, বৈদ্যুতিক সামগ্রী ও ভোক্তা পণ্যসহ নানা খাতেই চীনের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা ব্যাপক। যদিও রপ্তানি খাত এখনও তুলনামূলক সীমিত। তার পরও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি বাড়ছেÑ বিশেষ করে কৃষিপণ্য, পাটজাত সামগ্রী ও ওষুধ খাতে। 

২০২০ সালে চীন বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্যের জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধা ঘোষণা করে, যা বাণিজ্যে এক নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। এই উদ্যোগের ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা চীনা বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছেন, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির বৈচিত্র্য আনতে সহায়তা করছে। তবে বাণিজ্য ভারসাম্য এখনও চীনের পক্ষে ভারী। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে নিজস্ব রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে প্রবেশের মাধ্যমে এই ব্যবধান কমানো।

বিনিয়োগ ও অবকাঠামো সহযোগিতা

চীনের বিনিয়োগ এখন বাংলাদেশের উন্নয়ন কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ। পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ প্রকল্প, কর্ণফুলী টানেল, পায়রা ও মাতারবাড়ী বন্দর, একাধিক বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলÑ সবক্ষেত্রেই চীনের আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা স্পষ্ট। বিশ্বব্যাপী ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই)-এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশ এখন চীনের দক্ষিণ এশিয়া কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এই উদ্যোগে বাংলাদেশের অবস্থান ভৌগোলিক ও কৌশলগত উভয় দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। এটি চীনের জন্য বঙ্গোপসাগরের প্রবেশদ্বার হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশের জন্যও এটি অবকাঠামো উন্নয়ন ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের বড় সুযোগ এনে দিয়েছে।

তবে এখানেও ভারসাম্যের প্রশ্ন আসে। বড় প্রকল্পগুলোয় চীনা ঋণের পরিমাণ বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে ঋণ ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে আমাদের আরও বেশি সতর্ক থাকতে হবে। সরকারের উচিত হবে চীনা বিনিয়োগের পাশাপাশি অন্যান্য উৎস থেকে অর্থায়ন বৃদ্ধি করা, যাতে অর্থনৈতিক নীতিতে ভারসাম্য বজায় থাকে।

রাজনীতি ও কূটনীতিতে আস্থার সম্পর্ক

চীন সব সময় বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অহস্তক্ষেপের নীতি অনুসরণ করেছে। এই অবস্থান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সর্বদা একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিয়েছেÑ একদিকে চীন, অন্যদিকে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে কৌশলগত সমন্বয় করেছে।

চীন জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশকে বিভিন্ন সময়ে সমর্থন দিয়েছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা সংকটের প্রেক্ষাপটে, যদিও সেই সমর্থন মাঝে মাঝে ‘নিরপেক্ষতা’র ছায়া নিয়ে এসেছে। আবার বাংলাদেশের জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন, দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা ও বৈশ্বিক জলবায়ু আলোচনায় চীন একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে ভূমিকা রাখছে।

প্রযুক্তি, শিক্ষা ও জনসম্পর্কের সেতুবন্ধন

চীন শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন না, বাংলাদেশের মানবসম্পদ উন্নয়নেরও অংশীদার। প্রতি বছর শত শত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী চীনে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ পাচ্ছেন। তথ্যপ্রযুক্তি, ইঞ্জিনিয়ারিং, চিকিৎসা ও ব্যবসা প্রশাসনÑ বিভিন্ন বিষয়ে চীনা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের অন্যতম গন্তব্য। এছাড়া হুয়াওয়ে, শাওমি, অপো, ভিভোসহ চীনা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর উপস্থিতি বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতিকে গতিশীল করেছে। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ রূপকল্প বাস্তবায়নে চীনের প্রযুক্তিগত সহায়তা একটি বড় ভূমিকা রেখেছে।

অর্থনীতি ও রাজনীতির বাইরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সাংস্কৃতিক সংযোগ। দুই দেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়ছে। চীনা ভাষা শিক্ষা, সাংস্কৃতিক বিনিময়, চলচ্চিত্র উৎসব, পর্যটন সবক্ষেত্রেই পারস্পরিক আগ্রহ বাড়ছে। ঢাকায় কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট চীনা সংস্কৃতি ও ভাষা প্রচারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। অপরদিকে চীনে ‘বাংলাদেশ কালচারাল উইক’ আয়োজন বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতিকে নতুন দর্শকের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে।

ভবিষ্যতের পথচলা

অর্ধ শতাব্দীর এই বন্ধুত্ব এখন এক নতুন উচ্চতায় দাঁড়িয়ে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক বাণিজ্য উত্তেজনাÑ এই তিন বাস্তবতা দুই দেশকেই নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। বাংলাদেশের লক্ষ্য এখন উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তর। আর চীন চায় বিশ্ব বাণিজ্য ও প্রযুক্তি ব্যবস্থায় নিজের প্রভাব আরও বিস্তৃত করতে। এই দুই আকাঙ্ক্ষা একে অপরের পরিপূরক হতে পারে যদি সম্পর্কটি কেবল সরকারি নয়, বেসরকারি খাত ও জনগণের মধ্যেও গভীরভাবে স্থাপিত হয়।

চীন-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্কের পঞ্চাশ বছরের এই যাত্রা নিঃসন্দেহে গর্বের। এটি দুই জাতির পারস্পরিক আস্থা, সম্মান ও সহযোগিতার এক জীবন্ত ইতিহাস। এই ৫০ বছরে সম্পর্ক বহু পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে গেছে। বিশ্বরাজনীতির পালাবদল, অর্থনৈতিক বাস্তবতার রূপান্তর এবং আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার নতুন সমীকরণÑ সবকিছুই এ সম্পর্ককে পরীক্ষিত করেছে, আবার দৃঢ়ও করেছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় সম্পর্কটিকে শুধু উন্নয়ন সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পরস্পরের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্বে রূপ দেওয়া সময়ের দাবি। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এ সম্পর্ক যেন অর্থনৈতিক লাভের গণ্ডি ছাড়িয়ে সাংস্কৃতিক বিনিময়, প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার এক দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে। অর্ধ শতাব্দীর এই যাত্রা আমাদের শিখিয়েছে, সত্যিকারের বন্ধুত্ব কেবল কূটনৈতিক বিবৃতিতে নয়, মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনায় নিহিত।

সুতরাং ৫০ বছরের অর্জনকে ভিত্তি করে এখন সময় এসেছে ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা স্পষ্ট করার। একটি সম্পর্ক, যা আগামী প্রজন্মের জন্য শান্তি, সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়নের পথ উন্মুক্ত করবে। অর্ধ শতাব্দীর বন্ধুত্বের এই মাইলফলকে দাঁড়িয়ে আমরা আশা করতে পারিÑ আগামী ৫০ বছর আরও গভীর, পরিণত ও মানবিক হবে আমাদের এই সম্পর্কের পথচলা।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা