নৌপথ পুনরুদ্ধার
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২৬ অক্টোবর ২০২৫ ১০:০৮ এএম
নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশÑ এই পরিচয়টা শুধু ইতিহাসে নয়, আমাদের সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও পরিবেশের গভীরে প্রোথিত। একসময় দেশের নানাপ্রান্তে ছিল অসংখ্য নদনদী ও একে কেন্দ্র করে বিস্তৃত নৌপথ। নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে সভ্যতা। নদীই আমাদের জীবনযাপনকে রহমান রেখেছে। নদী তীরেই গড়ে উঠেছে সব বাণিজ্যকেন্দ্র। সার্বিক যোগাযোগ, বাণিজ্য, পণ্য পরিবহনÑ সবকিছুর প্রাণ ছিল এসব নদীনির্ভর পথ। কিন্তু দেশের নদীগুলো আজ চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। একসময় দেশের ২৪ হাজার কিলোমিটার নদীপথ নৌচলাচলের উপযোগী ছিল। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার কিলোমিটারের নিচে। সময়ের বিবর্তনে দখল, দূষণ, ভরাট ও প্রবাহ সংকটে নদীগুলোর প্রাকৃতিক জীবনধারা ভেঙে পড়েছে। ফলে নৌপথগুলো ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। একের পর এক নদী শুকিয়ে যাচ্ছে, সংযোগ খালগুলো ভরাট হচ্ছে। এসব কারণে জলযান চলাচল প্রায় বন্ধ। পরিস্থিতি এমন পর্যায়েÑ যে দেশ একসময় নৌযান পরিবহনের জন্য খ্যাত ছিল, আজ সেখানে নৌপথ রক্ষাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই নদী বাঁচাতে রাষ্ট্র, প্রশাসন ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি। কেননা নদী মরে যাওয়া মানেই আমাদের জীবনপ্রবাহ শুকিয়ে যাওয়া।
এমনি বাস্তবতায় দেশব্যাপী বন্ধ হয়ে যাওয়া নৌপথ পুনরুদ্ধার, দখল-দূষণমুক্ত নদী ও নদীমাতৃক বাংলাদেশের ঐতিহ্য পুনর্জাগরণের দাবিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস নদী থেকে প্রতীকী নৌযাত্রা শুরু করেছে নদী ও প্রকৃতি সুরক্ষা সামাজিক আন্দোলন ‘তরী বাংলাদেশ’। সংগঠনটি চায় নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ ও নৌপথ পুনরুদ্ধারের অধিকার। তরী বাংলাদেশ মনে করে, নৌপথ সচল হলে সড়কপথের চাপ কমবে, পরিবেশ রক্ষা পাবে, অর্থনীতি লাভবান হবে। উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় এবং সময়োপযোগী তাতে কোনো দ্বিমত নেই। এই অসাধারণ উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই এবং এর সাফল্য কামনা করছি। আমরা চাই, এই উদ্যোগের মাধ্যমে নৌপথ বাঁচুক, নদী বাঁচুকÑ নদীমাতৃক বাংলাদেশ টিকে থাকুক।
২৫ অক্টোবর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ অনলাইন ভার্সনে বন্ধ নৌপথ পুনরুদ্ধারের দাবিতে ‘তিতাস থেকে বুড়িগঙ্গা’ নৌযাত্রা শীর্ষক প্রতিবেদনে জানা যায়, ‘তিতাস থেকে বুড়িগঙ্গা’ শীর্ষক এই কর্মসূচির আওতায় গত ২৪ অক্টোবর ভোর ৬টায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস নদীর আনন্দবাজার ঘাট থেকে ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর সদরঘাটের উদ্দেশে নৌযাত্রা শুরু করে। এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বিকালে সদরঘাটে বিআইডব্লিউটি-এর নতুন টার্মিনাল ভবনের দ্বিতীয় তলায় অনুষ্ঠিত হয় নদী-সুরক্ষা বিষয়ক মতবিনিময় সভা। সভায় অংশ নেন পরিবেশ আন্দোলনের কর্মী, গবেষক, নৌপরিবহন বিশেষজ্ঞ, সরকারি সংস্থার প্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের সদস্যরা। বক্তারা সরকারের প্রতি অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ, শিল্পবর্জ্য ও পয়ঃবর্জ্য নিয়ন্ত্রণ, নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান।
পরিসংখ্যান বলছে, দেশে বর্তমানে ঘোষিত নৌপথের সংখ্যা ৭০০’রও কিছু বেশি। কিন্তু সচল এর অর্ধেকও নয়। গতিপথ পরিবর্তনসহ নানা কারণে প্রতিদিনই নদীর মৃত্যু ঘটছে। বর্ষা শেষে নদী ও খালের বুক শুকিয়ে গেলে ছোট জাহাজ বা নৌকা চলাচল অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে গ্রামীণ অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, পণ্য পরিবহনে খরচ বাড়ছে, আর বিকল্প সড়ক পরিবহনের চাপ সৃষ্টি করছে যানজট ও জ্বালানি সংকট। অন্যদিকে, নৌপথ হারানোর সঙ্গে সঙ্গে জলাশয়নির্ভর জীবিকাও ধ্বংস হচ্ছে। জেলেরা কাজ হারাচ্ছে, নৌকার কারিগররা পেশা বদলাচ্ছেন এবং জনগণ হারাচ্ছে পরিবেশগত ভারসাম্য। এভাবেই নদীমাতৃক জীবনের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি বিলীন হয়ে যাচ্ছে নীরবে। শহুরে উন্নয়নের নামে খাল-নদী ভরাট করা এখন একপ্রকার ‘অভ্যাস’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ এই খাল ও নদীগুলোই একসময় ছিল বাংলাদেশের শিরা-উপশিরার মতো চলাচলের মাধ্যম।
আমরা মনে করি, নদীন নাব্যতা ও নৌপথ রক্ষায় এখনই দরকার রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল উদ্যোগ। পাশাপাশি জনগণের সচেতনতা এবং তরী বাংলাদেশ-এর মতো সংগঠনগুলোর এমন দায়িত্বশীল ভূমিকা। এই ক্ষেত্রে নিয়মিত নদী খনন, খাল উদ্ধার অভিযান, দখলদার উচ্ছেদ এবং বর্জ্য ফেলার ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ জরুরি। এই ক্ষেত্রে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়কে স্থায়ী ও কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন করা দরকার, যাতে হারানো নৌপথগুলো পুনরুদ্ধার ও রক্ষণাবেক্ষণ করা যায়। একই সঙ্গে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নদী রক্ষা কমিটি সক্রিয় করে নদী পুনরুদ্ধারের জন-অভিযান গড়ে তোলা দরকার।
আমরা আবারও বলছি, বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন ও পরিবেশ সুরক্ষার জন্য নৌপথ পুনরুজ্জীবন এখন সময়ের দাবি। নদী বাঁচলে দেশ বাঁচবেÑ এই সত্য সামনে রেখে আমাদের আগামীর উদ্যোগ নিতে হবে। হারিয়ে যাওয়া নৌপথগুলো ফিরিয়ে আনা হবে আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জীবনের ধারাকে সুরক্ষা দেওয়া। তাই আর দেরি নয়, এখনই নৌপথ পুনরুদ্ধার অভিযানকে অগ্রাধিকার দিন। আমরা ‘তরী বাংলাদেশ’-এর কর্মসূচির শতভাগ বাস্তবায়ন দেখতে চাই।