× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন হাত ধরাধরি করে চলে

শহিদুল ইসলাম

প্রকাশ : ১৭ ডিসেম্বর ২০২২ ১৪:৫৮ পিএম

অলঙ্করণ : প্রবা

অলঙ্করণ : প্রবা

২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৮২৪ মার্কিন ডলার হয়েছে, যা এর আগের অর্থবছরের তুলনায় ২৩৩ ডলার বেশি। এর আগের ২০২০-২১ অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাব অনুযায়ী, মাথাপিছু আয় ছিল ২ হাজার ৫৯১ ডলার। আইএমএফের বৈশ্বিক ইকোনোমিক আউটলুক প্রতিবেদনের সর্বশেষ সংস্করণটি গতকাল গত ৯ নভেম্বর প্রকাশিত হয়েছে। এপ্রিলে আইএমএফ জানিয়েছিল, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে। তবে সর্বশেষ প্রতিবেদনে জ্বালানি ও খাদ্যের উচ্চমূল্য, মূল্যস্ফীতি, উচ্চ সুদের হার ও ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের কারণ দেখিয়ে পূর্বাভাস সংশোধন করে ৬ শতাংশের কথা বলা হয়েছে। তাও যদি হয় তাহলে সেটা হবে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বিরল রেকর্ড। তা ছাড়া সামাজিক উন্নয়ন সূচকের নানা ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন হিংসা করার মতো, বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায়।

মনে আছে, নোবেলবিজয়ী অর্থনীতিবিদ গুনার মিরডাল (১৯৭৪), অমর্ত্য সেন (১৯৯৮) বাংলাদেশের এই অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের ভূয়সী প্রশংসা করেন। প্রশংসা করলেও একইসঙ্গে তারা বাংলাদেশের দুর্বল জায়গাগুলোও শনাক্ত করতে ভুল করেননি, যা এখনকার প্রেক্ষাপটে কতটা প্রাসঙ্গিক তাই আজ খতিয়ে দেখা জরুরি। আমরা নতুনভাবে এসব কিছুই ভাবার কথা বলি। নতুন পরিকল্পনার কথা বলি। তবে পুরোনো শঙ্কাকেও অর্থনীতিতে প্রাধান্য না দিয়ে উপায় নেই। খ্যাতিমান এই দুই অর্থনীতিবিদের মতে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভারত-পাকিস্তানের চাইতে ভালো করলেও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণ, দুর্নীতি প্রতিরোধ, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ, সর্বোপরি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো গঠনে ব্যর্থ হয়েছে। তবে সরকারের ৭ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা এখনও অপরিবর্তিত রয়েছে।

অর্থনীতিবিদরা এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে কি না এ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। সঙ্গত কারণেই বলছি, কারণ অপুষ্টি ও অশিক্ষা বাংলাদেশের উন্নয়নের গতি বহুলাংশে হ্রাস করেছে। অমর্ত্য সেন বলেন, ‘অপুষ্টি ও অশিক্ষার অপর নামই স্বাধীনতাহীনতা’। দুই অর্থনীতিবিদ প্রমাণ করেছেন, মাথাপিছু আয়ের হিসেবে কোনো দেশের সার্বিক উন্নয়নের ধারণা পাওয়া যায় না। বিজ্ঞান-প্রযুক্তির উন্নয়নে বাংলাদেশ ভারত-পাকিস্তানের চেয়ে এখনো পিছিয়ে। ফলে বাংলাদেশের চোখ ধাঁধানো সাফল্য অনেকাংশে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। এমন চলতে থাকলে ভবিষ্যত উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। অমর্ত্য সেন ও গুনার মিরডাল দুজনই মনে করেন, সুযোগের সমতা সৃষ্টি, শ্রমের উৎপাদন শক্তিবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন অপুষ্টির অবসান এবং মানসম্পন্ন উচ্চশিক্ষার প্রসার, গণতান্ত্রিক অবকাঠামো নির্মাণ, কৃষির উন্নয়নে প্রয়োজনীয় ভর্তুকি প্রদানে সরকারি হস্তক্ষেপ ইত্যাদি ভবিষ্যত উন্নয়নের গতি ধরে রাখার জন্য অত্যন্ত দরকার। তা ছাড়া তারা মনে করেন, রাজনীতির ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও নারী এখনও পুরুষতন্ত্রের শক্ত নিগড়ে বন্দি। ওই সময় নতুন প্রবন্ধিত বিবাহনীতি, যা এখনও অনেক জায়গায় বলবৎ আছে, তা সার্বিক পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটাবে বলে আশঙ্কা ব্যক্ত করেছিলেন তারা।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, পোষাক শিল্পের উন্নয়নে যাদের অবদান সবচেয়ে বেশি, সেই ৮৫ ভাগ নারী এখনও প্রতিকূলতাহীন জীবন-যাপন করতে পারছেন না। তারা সবচেয়ে কমমূল্যে শ্রম বিক্রি করছেন, কিন্তু বিনিময়ে তারা অনেকক্ষেত্রে পাচ্ছেন লাঞ্ছনা, অবমাননা। বিশেষত করোনা মহামারিতে পোষাক শিল্পের প্রাণশক্তি নারীকর্মীদের নানা অজুহাত দেখিয়ে ছাঁটাইয়ের ঘটনাও ঘটেছে। সংবাদমাধ্যমসহ বেশ কয়েকটি গবেষণা সংস্থার তথ্য ঘাঁটলে দেখা যাবে, নারী চরম ঝুঁকি নিয়ে পোষাক খাতকে সচল রেখেছে তখন। আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থা ভালো নয়, তা নতুন করে বলার কিছু নেই। আলোচ্য দুই অর্থনীতিবিদ এই দুটি বিষয়ে জোর দিয়েই মতামত ব্যক্ত করেছিলেন। মাথাপিছু আয়বৃদ্ধির সঙ্গে এ অবস্থা মোটেই আশ্বস্তকর নয়। কিন্তু এই বাস্তব সত্যতো আর অস্বীকার করা যায় না। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সমাজে বৈষম্য বাড়ছে, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা খারাপ থেকে খারাপের দিকে এগুচ্ছে। তাই তারা বলেন, ‘ইকোনোমিক গ্রোথ অন ইটস ওউন ডাজ নট বাই পলিটিক্যাল স্ট্যাবিলিটি।’ এ বিষয়ে আন্দ্রে গুঙার ফ্যাঙ্কের বিখ্যাত তত্ত্বের কথা মনে পড়ে গেল। অনুন্নয়নের উন্নয়ন (ডেভেলপমেন্ট অব আন্ডারডেভেলপমেন্ট)।

কথায় বলে, নদীর এ পাড় ভাঙে ও পাড় গড়ে। গুঙার ফ্যাঙ্কের কথা কত সত্যি তা আমরা আজ হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করছি। অনুন্নয়নের উন্নয়ন। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অনুন্নয়নের বিনিময়ে মুষ্টিমেয় ধনিক শ্রেণির উন্নয়ন। তাই ইতিহাস সৃষ্টিকারী অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরও বাংলাদেশের যেদিকে তাকানো যায়, কেবল ধস আর অবক্ষয়। হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, দুর্ঘটনা, শিশু নির্যাতন, জলবায়ু পরিবর্তনের অবঘাত এবং অরাজনৈতিক অস্থিরতার দৈনন্দিন খবর। প্রাকৃতিক তাণ্ডবের সঙ্গে এসব মানবসৃষ্ট ঘটনা বাংলাদেশের সব অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের সাফল্য ম্লান করে দিচ্ছে। দুর্নীতি, ব্যাংক থেকে অর্থ লুট ও বিদেশে অর্থপাচার বাংলাদেশের ভবিষ্যত উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইনের চোখে ধনী-দরিদ্রের পার্থক্য প্রকট হয়ে উঠছে। তদুপরি মৌলবাদের অপছায়া দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক শান্তি  বিনষ্টের কারণ হিসেবে জিইয়ে আছে। বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-টেকনিক্যাল শিক্ষার খরচ কমিয়ে এবং মাদ্রাসাশিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে অবস্থার আরও অবনতি ঘটানো হয়েছে। ধনিক শ্রেণির লোভ-লালসার শিকার প্রকৃতি। ঢাকার পানি নিষ্কাশনের সব রাস্তা বন্ধ হবার ফলে মাত্র একরাতের বৃষ্টিতে ঢাকা এক সাগরে পরিণত হচ্ছে। ঢাকার রাজপথে নৌকা চলাচলের দৃশ্য বাংলাদেশের মানুষ দেখেছে। প্রকৃতির দান বিনষ্ট করছেন যারা, তারা একবারও ভাবছেন না যে তারা বাংলাদেশকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছেন। জলবায়ু পরিবর্তন রোধে বাংলাদেশের অর্জন খুবই কম। বনজঙ্গল পরিষ্কার করে ঘরবাড়ি, শিল্প-কারখানা তৈরির ফলে প্রকৃতি তার ভারসাম্য হারাচ্ছে। একদিকে মানুষ বাড়ছে অর্থাৎ বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস বাড়ছে, অন্যদিকে গাছ ধ্বংস করে তা শোষণ করার সুযোগ কমিয়ে দিচ্ছে।

বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ রাজধানীর একটা ঢাকা আজ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। চলতি বছর ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং-এর তাণ্ডবে ঢাকার অনেক বাড়ির নিচতলায় পানি ঢুকে যে বিপর্যয়ের সৃষ্টি করে তা এরই সর্বসাম্প্রতিক প্রমাণ। নীতিনির্ধারকরা যেন দরকার-অদরকারের ফারাকই বুঝে উঠতে পারছেন না। সাবমেরিন, যুদ্ধজাহাজসহ যুদ্ধাস্ত্র কেনা বেশি দরকার নাকি দেশের, বিশেষ করে ঢাকার কাঠামোগত উন্নয়ন বেশি দরকার-এ নিয়ে যদি একটা গণভোট নেওয়া যেত, তাহলে দেশবাসী দ্বিতীয় অপশনের পক্ষে ব্যাপক হারে তাদের মত প্রকাশ করতেন এমন ধারণা অনেকের।

বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় দিয়ে লেখাটি শুরু করেছিলাম। সেইসঙ্গে যদি জানা যেত আমাদের মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ কত, তাহলে বুঝতাম, যে শিশু আজ জন্মগ্রহণ করল, তাদের প্রত্যেকের মাথার ওপর আমরা কত ঋণের বোঝা চাপিয়ে যাচ্ছি। ধার করে পোলাও খাওয়ার চেয়ে ডালভাত খেতে রাজি আছে এ দেশের শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ। কিন্তু অপর ১০ ভাগ মানুষের অপ্রয়োজনীয় বিলাসবহুল জীবনযাপনই সরকারের ভিশনকে আবছা করে তুলছে। প্রথম বিশ্বে যেমন ৮০/৯০ ভাগ মানুষই তৃতীয় বিশ্বের মানুষের মতো বসবাস করে, তেমনি তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশ বাংলাদেশে কিছু মানুষ ‘প্রথম বিশ্ব’ তৈরি করে সেখানে কেমন জীবনযাপন করছে, তার পরিচয় আমরা পেয়েছি নিকট অতীতের কয়েকটি ঘটনারও খোঁজ পেয়ে। জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষ যদি তাদের জীবনযাত্রার ধরন না পালটায়, তাহলে পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব আর বেশিদিন নাই। বাংলাদেশের প্রায় ৭০টি প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদ ইতোমধ্যেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

বর্তমান অর্থনৈতিক কাঠামো অনেক মানুষকে লোভ-লালসায় আক্রান্ত করেছে। সমাজের প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা তাদের নেই। লাভ ও লোভের জন্য তারা যেকোনো পর্যায়ে নামতে পারে। ‘দি গার্ডিয়ান’ পত্রিকায় চলতি বছর ১০ জুলাই ডেমিয়াম ব্যারিংটন নামে একজন জলবায়ু বিশেষজ্ঞ এবং পত্রিকাটির জলবায়ু বিষয়ক সম্পাদক জানিয়েছিলেন, ১৭৭টি স্তন্যপায়ী প্রজাতির অর্ধেকের ওপর গবেষণা করে দেখা গেছে যে, তাদের অধিকাংশেরই প্রায় ৮০ ভাগ বিলুপ্ত হয়ে গেছে ১৯০০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে। মিলিয়ন বছর আগে জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে যে গতিতে প্রজাতি বিলুপ্ত হয়েছে, তার চেয়ে বর্তমানের গতি অনেক বেশি। জুওলজিক্যাল সার্ভে অব লন্ডনের রবিন ফ্রিম্যান বলছেন, ৩০০০ প্রজাতির শতকরা ৫০ ভাগ প্রাণী গত ১৯৭০ সালের পর বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

সব দিক বিবেচনায়, বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ১৬০২ ডলার হলেও তা সামাজিক পরিসরে সব মানুষের উন্নয়ন ঘটাতে পারেনি। অবশ্য আমাদের সামনে আশার বাণী আছে, ২০৪১ সালে আমাদের মাথাপিছু আয় ১২,০০০ ডলারে উন্নীত হবে। শুনলে মনটা দুলে ওঠে। একইসঙ্গে এই প্রশ্নও জাগে, দেশের সার্বিক অবস্থা এখনকার চেয়েও খারাপ হয়ে যাবে নাতো? কারণ উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন হাত ধরাধরি করে চলে। কোন্ হাত বেশি শক্তিশালী, তার ওপরই নির্ভর করবে ২০৪১ সালের বাংলাদেশের কাঠামো। সেদিন কেউ বলবে নাতো আমরা ২০২২ সালেই ভালো ছিলাম?

 

লেখক : সাবেক অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

 

 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা