ইমেইল থেকে
হাবিবুর রহমান
প্রকাশ : ২৫ অক্টোবর ২০২৫ ১৩:০১ পিএম
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রফেসর ইমমেরিটাস সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্যার প্রয়াত হলেন। তিনি আমার শ্রেণিকক্ষের শিক্ষক ছিলেন। ইংরেজি বিভাগে পড়তে যাওয়ার আগে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যার ও সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্যার উনাদেরকে চিনতাম, কারণ উনাদের লেখা জাতীয় দৈনিকে পড়েছি ততদিনে। মফস্বল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে নিজের জানাশোনা নিয়ে শিক্ষকদের সঙ্গে চিন্তা বিনিময়ের সাহস করে উঠতে পারিনি আমরা অনেকেই। কিন্তু স্যারকে শ্রেণিকক্ষে পেয়ে মনের ভেতরে সাহস জন্মাল। স্যার গ্রাম ও মফস্বলকে অস্তিত্বের সবচেয়ে মজবুত শেকড় হিসেবে ভাবতেন। শহরের মধ্যে মফস্বলকে গুলিয়ে ফেলে বিভেদমূলক তুলনা করতে অপছন্দ করতেন।
স্যারের ক্লাস নেওয়া ও বিভিন্ন জায়গায় কথা বলায় মফস্বলি আয়েশ ও রসবোধ সহজে ধরা দিত। শিল্প-সাহিত্যের নিগূঢ় সব তত্ত্ব ও বিবরণকে সরল করে গল্প-উদাহরণের অবয়বে উন্মুক্ত করে দিতেন শ্রেণিকক্ষে। এমন সহজ করে বলতে পারাটা ও বোঝাতে পারার যে স্বতঃস্ফূর্ত প্রচেষ্টা সেটা শ্রেণিকক্ষের ভেতরে শ্রেণি পরিচয় ভাঙার বড় একটা প্রয়াস। সব ধরনের বা শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য জ্ঞান যেন সমানভাবে বোধগম্য হয়– সেটার একটা দর্শনগত দিক স্যারের শিক্ষক আচরণে ধরা পড়ত। তিনি শিক্ষার সংস্কারের কথা বারংবার বলতেন। শিক্ষার ভেতরে সংস্কৃতির সহাবস্থান নিয়ে তিনি গুরুত্বারোপ করেছেন। শিক্ষা ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনের মাধ্যমেই মানুষের বন্ধন ও ঐক্য সুনিশ্চিত হয়। শাসকরা সেটা হতে দেয়নি তাদের সুবিধার রাজনীতির স্বার্থে।
ভাষার ব্যবহার একজন বুদ্ধিজীবীর ভূমিকার খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা অনুষঙ্গ। ভাষার প্রয়োগ ও রাজনীতি নিয়ে একজন বুদ্ধিজীবীকে সজাগ ও সংবেদনশীল থাকতে হয়। তিনি এই ক্ষেত্রে দারুণ পারদর্শী ছিলেন। মুখের কথায় তিনি মানুষকে জুড়ে দিতে পারতেন। বাংলা বলতেন অত্যন্ত সুন্দর করে। ইংরেজি যখন বলতেন সেটাও শিক্ষার্থীদের জন্য যেন বোধগম্য হয় সেভাবেই বলতেন। বাংলায় লিখেও তার ভূখণ্ডের মানুষের গল্প বলেছেন। বাংলা-ইংরেজির মুখোমুখি মর্যাদা-অমর্যাদার দ্বন্দ্বকে তিনি কখনোই পাত্তা দেননি শিক্ষক ও লেখক হিসেবে।
আশাবাদী শিক্ষক মানুষ হিসেবে শিক্ষার্থীদের সামর্থ্যে তিনি আশা রাখতেন। তিনি স্মৃতিকে সম্পদ বলতেন। আমাদের দেশের ইতিহাস ও আমাদের তরুণদের ইতিহাস নানান সংগ্রাম, বেদনা ও মিলনের স্মৃতিতে গড়া। মনজুর স্যার এটা ধরেই ভিত গড়েছেন তার শিক্ষকতা ও লেখনীর জগতের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির শিক্ষক হিসেবে নিজের শ্রেণিবোধকে বড় ভাবার প্রবণতায় তিনি আস্থা রাখেননি। নিজের আদর্শ দিয়ে অন্যকে প্রভাবিত করা কিংবা চাপিয়ে দেওয়ার মতো মানসিকতা তার ভেতরে দেখিনি। সাহিত্য সমালোচনার আধুনিক তাত্ত্বিক জায়গাগুলোকে তিনি নেড়ে দেখতেন। তার পাঠদান ও লেখনীতে সেটার প্রভাব বোঝা গিয়েছে সব সময়।
নিজেকে সৃষ্টিশীল মানুষ হিসেবে অবিরাম ঢেলে দিয়েছেন। তিনি নিজ ভাষায় কথাসাহিত্য লেখা, অনুবাদ, সাহিত্য-শিক্ষা-শিল্প সমালোচনার পাশাপাশি ইংরেজি ভাষায় গবেষণা, অনুবাদ ও সমালোচনায় সফলতা দেখিয়েছেন। তার এমন বিস্তর আগ্রহ, কর্ম ও ধারাবাহিক চর্চা তাকে আধুনিক সময়ে আমাদের উপমহাদেশ তো বটেই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও বিরল একজন শেকড়-সন্ধানী বুদ্ধিজীবীতে পরিণত করেছে।
তিনি একজন সরব আনন্দসংক্রামক মানুষ ছিলেন। এমন মানুষটি কি হঠাৎ নীরব হয়ে গিয়েছিলেন? তিনি হাসপাতালে যাওয়ার আগে পর্যন্ত শিক্ষকতায় যুক্ত ছিলেন। বিগত সময়ে তিনি কি সচেতনভাবে তার জন-অভিজ্ঞতাকে সংকুচিত করে ফেলেছিলেন? স্বভাববিরুদ্ধ নীরবতা পেয়ে বসেছিল কি স্যারকে? নানান পরিবর্তনের অভিঘাত কি তাকে কষ্ট দিচ্ছিল? সংবেদনশীল লেখক ও প্রেরণাদায়ী শিক্ষকদের ভেতরে কি নিঃসঙ্গতা পেয়ে বসে? জানা কোনো উত্তর নেই; জানি শুধু প্রিয় স্যার চলে গেছেন।
ব্যক্তিগত একটা স্মৃতি দিয়ে লেখাটি শেষ করতে চাই। ইংরেজি বিভাগের আমাদের বন্ধু সোহেল অসুস্থ হলো। ওর চিকিৎসার জন্য আমরা কনসার্ট আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিলাম। স্যার এল আর বি ব্যান্ডের আয়ুব বাচ্চুকে চিঠি লিখে আমাদের দিয়ে পাঠালেন। আরেক শিল্পী মেহরিনকে ফোনে বলে দিলেন। কনসার্টের স্পন্সর জোগাড় করে দিতে স্যার সাহায্য করলেন। সফল আয়োজন হলো। সোহেল তবু বাঁচল না। আয়ুব বাচ্চু চলে গেলেন ২০১৮ সালে। আজ আমাদের মনজুর স্যার চলে গেলেন। শত ভাঙনের মুখে আমাদেরকে জুড়ে রাখার মানুষগুলো চলে যাচ্ছেন।
হাবিবুর রহমান
পিএইচডি গবেষক, কার্টিন ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়া