ইমেইল থেকে
ড. মো. আনোয়ার হোসেন
প্রকাশ : ২৫ অক্টোবর ২০২৫ ১১:২৮ এএম
আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২৫ ১১:৩১ এএম
২০১৮ সালের জুলাই মাসে ঘটে যাওয়া সড়ক দুর্ঘটনায় দুই কলেজ শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় শুরু হওয়া আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে প্রতিবছর ২২ অক্টোবরকে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস হিসেবে পালন করা হয়। শিক্ষার্থীরা ৯ দফা দাবিতে রাস্তায় নেমে আসে এবং এই আন্দোলনের ফলে দ্রুততম সময়ে সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ পাস হয়। নিরাপদ সড়ক দিবস পালনের প্রধান উদ্দেশ্য হলো সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং সড়ক আইন মেনে চলার গুরুত্ব বোঝানো। এ বছরের নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা এই দিনে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করে, যেমন শোভাযাত্রা ও আলোচনা সভা। ২০২৫ সালের জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো ‘মানসম্মত হেলমেট ও নিরাপদ গতি, কমবে জীবন ও সম্পদের ক্ষতি’।
সড়ক নিরাপত্তা উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন বাংলাদেশ সরকারি সংস্থা ও বিশ্বব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার সমন্বয়ে একটি বহুমুখী প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। সরকার সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এটি যাত্রীবাহী যানবাহন, পথচারী, চালক এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের সুরক্ষার বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেবে।
বাংলাদেশের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের ইতিহাস শুরু হয় ১৯৯৩ সালে চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের স্ত্রী সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার পর তার নেতৃত্বে গঠিত ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিসচা) আন্দোলনের মাধ্যমে। তবে, ২০১৮ সালে ঢাকার বিমানবন্দর সড়কে দুই বাসের সংঘর্ষে কলেজ ছাত্র-ছাত্রী নিহত হওয়ার পর শিক্ষার্থীরা এই দাবিতে দেশব্যাপী যে আন্দোলন গড়ে তোলে, তা এই ইতিহাসকে এক নতুন মাত্রা দেয়। ২০১৮ সালের এই আন্দোলনটি পরে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং সরকারিভাবে ‘নিরাপদ সড়ক দিবস’ পালনের দাবি ওঠে।
গত ১০ বছরে বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা থেকে ভিন্ন ভিন্ন পরিসংখ্যান পাওয়া যায়। নিম্নে প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হলো: বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদন অনুযায়ী (২০১৪-২০২৪ পর্যন্ত ১১ বছরে) : দুর্ঘটনা : ৬০,৯৮০টি। নিহত : ১,০৫,৩৩৮ জন। আহত : ১,৪৯,৮৪৭ জন।
২০২৪ সালে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৬,৩৫৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৮,৫৪৩ জন নিহত এবং ১২,৬০৮ জন আহত হন। ২০২৩ সালে একই সংস্থার তথ্যে, ৬,২৬১টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭,৯০২ জন নিহত এবং ১০,৩৭২ জন আহত হয়েছিল। ২০২২ সালে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, ৬,৮২৯টি দুর্ঘটনায় ৭,৭১৩ জন নিহত এবং ১২,৬১৫ জন আহত হন। ২০১৯ সালে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী জাতীয় সংসদকে জানান, ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের এপ্রিল পর্যন্ত দশ বছরে ২৫,৫২৬ জন মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। বিভিন্ন সংস্থার পরিসংখ্যানে কিছু পার্থক্য দেখা যায়, যা তথ্য সংগ্রহের ভিন্ন পদ্ধতির কারণে হতে পারে। তবে, সব প্রতিবেদনে হতাহতের সংখ্যা ব্যাপক বলে উঠে এসেছে এবং এটি একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
বাংলাদেশের সড়ককে নিরাপদ করতে হলে চালক, পথচারী, যানবাহন এবং রাস্তার পরিবেশÑ এই চারটি ক্ষেত্রেই সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
চালকদের জন্য : প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সিংÑ চালকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে এবং লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে আরও কঠোর নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে। ট্রাফিক নিয়ম মেনে চলাÑ বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো এবং মোবাইল ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। শারীরিক ও মানসিক সুস্থতাÑ ক্লান্তি বা অন্য কোনো মানসিক অস্থিরতা থাকলে গাড়ি চালানো থেকে বিরত থাকতে হবে।
পথচারীদের জন্য : সচেতনতা ও নিয়ম মেনে চলাÑ রাস্তা পার হওয়ার সময় জেব্রাক্রসিং ব্যবহার করা, কানে ইয়ার ফোন বা মোবাইলে কথা না বলা উচিত। রাস্তা পরিচ্ছন্ন রাখাÑ রাস্তায় কোনো আবর্জনা, ফলের খোসা বা অন্যান্য ময়লা ফেলা থেকে বিরত থাকতে হবে।
বিভিন্ন গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, অনেক সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে চালকদের মাদকাসক্তি একটি বড় কারণ। এমনকি কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ৩০ শতাংশ পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনার জন্য চালকের মাদক সেবন দায়ী। কারণ মাদকাসক্ত চালকরা যাত্রাপথে নিম্নলিখিত প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হন : প্রতিক্রিয়া ক্ষমতা কমে যাওয়াÑ মাদক সেবনের ফলে মস্তিষ্কের কার্যকারিতা ধীর হয়ে যায় এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর ক্ষমতা কমে যায়। ফলে সামনে কোনো অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি, যেমনÑ হঠাৎ ব্রেক চাপা বা পথচারী চলে আসা, এড়িয়ে যাওয়া তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে অক্ষমতাÑ মাদকাসক্তি যুক্তিতর্ক ও সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে ব্যাহত করে। নেশাগ্রস্ত অবস্থায় একজন চালক তার গতি, অন্য গাড়ির দূরত্ব এবং সময়ের ব্যবধান সঠিকভাবে নির্ণয় করতে পারে না।
বাংলাদেশে নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠা করতে হলে, সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর মতো আইনগুলোর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে নিয়ম লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। সড়ক খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করাও অপরিহার্য।
ড. মো. আনোয়ার হোসেন
প্রাবন্ধিক ও প্রেসিডেন্ট আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী সংগঠন ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল এন্টি অ্যালকোহল