মোড়কজাত পণ্য
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২৫ অক্টোবর ২০২৫ ১১:২৩ এএম
বাজারে এখন প্যাকেটজাত পণ্যের যুগ। চাল, ডাল, লবণ, তেল, দুধ, মসলা, বিস্কুট, এমনকি পানীয়Ñ সবই সুন্দর ও আকর্ষণীয় মোড়কে ভোক্তার দৃষ্টি ধরে রাখে। চকচকে প্যাকেট আর ঝলমলে লেবেল দেখে আমরাও প্রতিদিন দোকান থেকে নিশ্চিন্তে প্যাকেটজাত এসব পণ্য কিনে থাকি। কিন্তু এই মোড়কের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ প্রতারণা, ওজনে কারচুপি। এটা এমন এক নীরব শোষণ, যা বুঝে ওঠার আগেই আমাদের পকেট হালকা করে দিচ্ছে, হাতিয়ে নিচ্ছে টাকা। বিস্ময়কর সত্য হচ্ছেÑ নামিদামি কোম্পানিগুলোও এই নীরব প্রতারণায় যুক্ত।
বাস্তবতা হচ্ছে, ১ কেজি লেখা পণ্যের প্যাকেট খুলে দেখা যায়, ৫০ থেকে ৩০ গ্রাম পণ্য কম। ৫০০ গ্রামের প্যাকেটে থাকে ৪৫০ গ্রাম। এমনকি ৯০ গ্রামের চানাচুর এখন ৮০ গ্রাম, ১৫ গ্রামের চিপস এখন ১২ গ্রাম। অথচ দাম একই, কমছে শুধু ভোক্তার পাওনা। কেউ কেউ আবার প্যাকেটের প্লাস্টিক বা আর্দ্রতাকে পণ্যের ওজনে ধরে নিচ্ছে। কেউ কেউ আবার বরফ বা পানি মিশিয়ে বাড়িয়ে দিচ্ছে ওজন। ফলে ক্রেতা দাম দিচ্ছে পূর্ণ ওজনের, কিন্তু পাচ্ছে কম পণ্যÑ এ যেন এক বৈধ চুরির কৌশল!
এভাবে ক্রেতা না জেনেই প্রতিদিন পণ্য কম পাচ্ছে, যা যোগ হয়ে বছরে দাঁড়াচ্ছে কোটি টাকার অংকে। ওজনে সামান্য ঘাটতি, কিন্তু তাতেই কোটি টাকার বে-আইনি মুনাফা উঠছে কোম্পানিগুলোর ঘরে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজারে এই ওজন কারচুপি ভোক্তার বিশ্বাস ও ন্যায্যতার ওপর সরাসরি আঘাত হানছে। তারা ভোক্তাদের সচেতন হওয়ার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের নৈতিকতার জায়গা থেকে দায়িত্বশীল হওয়ার কথা বলছেন। ভোক্তা অধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি এক ধরনের ‘গোপন মূল্যবৃদ্ধি’ বা প্যাকেজিং প্রতারণা, যা রোধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
এই অনিয়ম বা প্রতারণা আজ আর বিচ্ছিন্ন নয়, বরং বাজারের অলিখিত নিয়মে পরিণত হচ্ছে। মানুষ এখন দ্রুত কেনাকাটা করে, প্যাকেট খুলে কেউ ওজন মাপে না। তদারকি সংস্থার দুর্বলতা, জনবল সংকট আর অবহেলাই এই প্রতারণাকে অবাধ করে তুলেছে। সরকারি সংস্থা বিএসটিআই ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর মাঝেমধ্যে অভিযান চালালেও তা অল্প সময়ের জন্য প্রভাব ফেলেÑ স্থায়ী সমাধান আসে না। আমরা মনে করি, এভাবে কম পণ্য দিয়ে বেশি টাকা নেওয়া অসৎ উপায়। এটা বন্ধ করা জরুরি।
এই ধরনের প্রতারণা রোধে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ সালের ২৬নং-এর (৪৬)-এ বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি কোনো পণ্য সরবরাহ বা বিক্রয়ের সময় ভোক্তাকে প্রতিশ্রুত ওজন অপেক্ষা কম ওজনে উক্ত পণ্য বিক্রয় বা সরবরাহ করিলে তিনি অনূর্ধ্ব এক বছর কারাদণ্ড বা অনধিক পঞ্চাশ (৫০) হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।’ বিএসটিআইর পণ্য মোড়কজাত বিধিতেও বলা আছে, প্যাকেটজাত পণ্যের গায়ে প্রতিষ্ঠানের নাম, ঠিকানা, পণ্যের পরিমাণ, উৎপাদন তারিখ ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ, মূল্য এবং পণ্যের উপাদানগুলো উল্লেখ করতে হবে। কোনো পণ্যের ক্ষেত্রে এসব বিষয়ে ব্যত্যয় ঘটলে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা জরিমানা অথবা ২ মাসের জেলের বিধান রয়েছে। তার মানে আইন আছে, বাস্তবায়ন নেই।
‘কাজীর গরু কেতাবে আছে গোয়ালে নেই’- এই সুযোগে ভোক্তারা ঠকছেন, আর ব্যবসায়ীরা বাড়তি মুনাফা করছেন। এই ব্যাপারে কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেছেন, বাংলাদেশের বাজারে ভোক্তারা নিয়মিতভাবে দাম, মান ও ওজনে প্রতারিত হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা ইচ্ছামতো পণ্যের দাম বাড়াচ্ছেন অথচ ওজনে কম দিচ্ছেন এবং মানহীন পণ্য বাজারে ছাড়ছেন। বিএসটিআই মান সনদ দিলেও কার্যকর তদারকির অভাবে এসব অনিয়ম থামছে না।
আসলে তদারকির অভাবই এই নীরব প্রতারণার মূল কারণ। এমনও দেখা যাচ্ছে, ছোট ও মাঝারি প্যাকেটজাত প্রতিষ্ঠান কোনো অনুমোদন ছাড়াই পণ্য বাজারজাত করছে। কিছু কোম্পানি মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য নতুন মোড়কে বাজারজাত করছে। এই পরিস্থিতি কেবল ভোক্তাকে নয়, সৎ ব্যবসায়ীদেরকেও বিপাকে ফেলছে। এসব প্রতারণার প্রতিযোগিতায় সৎ ব্যবসা টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে।
আমরা মনে করি, এখনই সময় প্রতারণা রোধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার। এই ক্ষেত্রে প্রতিটি প্যাকেটজাত পণ্যের জন্য বিএসটিআই সনদ বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং নিয়মিতভাবে তা পরীক্ষা করতে হবে। জেলা পর্যায়ে ওজন যাচাই কেন্দ্র চালু করা জরুরি। যারা ওজনে কারচুপি করবে, তাদের শাস্তি শুধু জরিমানায় সীমাবদ্ধ না রেখে প্রকাশ্যে নাম ঘোষণা করতে হবে, যাতে অন্যরা সতর্ক হয়। সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ভোক্তার। সচেতন ক্রেতাই পারে প্রতারণা ঠেকাতে। কেনার সময় মোড়কের তথ্য পড়ুন, সন্দেহ হলে অভিযোগ করুন। মনে রাখতে হবে, একটি ছোট উদাসীনতাই বড় প্রতারণার পথ খুলে দেয়।
আমরা মনে করি, প্যাকেটজাত পণ্যে ওজনে কারচুপি কোনো ক্ষুদ্র অনিয়ম নয়Ñ এটি জাতির নৈতিক ও অর্থনৈতিক অবক্ষয়। মনে রাখতে হবে, ন্যায্য ওজনের নিশ্চয়তা শুধু ভোক্তার অধিকার নয়, এটি একটি রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা। বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে প্যাকেটজাত পণ্যে এই নীরব প্রতারণা বন্ধ করতে হবে। অন্যথায় সুন্দর মোড়কের আড়ালে প্রতিদিনই ক্রেতারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে আর বাড়বে অসাধুদের মুনাফা। প্রতিদিন অজান্তেই আমরা যে প্রতারিত হচ্ছি, তা বন্ধ করতে হলে রাষ্ট্র, প্রশাসন ও জনগণকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। ন্যায্য ওজন, ন্যায্য দামÑ এটাই হোক সবার সম্মিলিত দাবি। নীরব প্রতারণার এই পর্দা এখনই ছিঁড়ে ফেলতে হবে।