বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
এম এ বাকী বিল্লাহ
প্রকাশ : ২৪ অক্টোবর ২০২৫ ০৯:৫২ এএম
আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২৫ ০৯:৫২ এএম
সম্প্রতি হাইকোর্ট একটি যুগান্তকারী আদেশ দিয়েছেনÑ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থাপনা (ম্যানেজিং) কমিটি গঠন-সংক্রান্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৮ সেপ্টেম্বরের পরিপত্রের কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। বিচারপতি কাজী জিনাত হক ও বিচারপতি আইনুন নাহার সিদ্দিকার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন এবং রুল জারি করেন। রিটটি দায়ের করেছিলেন এমরান হোসেনসহ চারটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অ্যাডহক কমিটির সভাপতি।
এই রিটের পেছনে রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার নীতিতে একটি গুরুতর পরিবর্তন, যেখানে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির যোগ্যতা সীমিত করে দেওয়া হয় কেবল সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নবম গ্রেড বা তার ওপরের কর্মকর্তাদের মধ্যে। অবসরপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রেও শর্ত ছিল অন্তত পঞ্চম গ্রেডের কর্মকর্তা হতে হবে। অর্থাৎ যে ব্যক্তি সমাজে প্রতিষ্ঠিত, শিক্ষানুরাগী, সংগঠক, স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী, এমনকি শিক্ষা খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তি তিনি যদি রাষ্ট্রীয় চাকরিজীবী না হন, তাহলে তিনি ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হওয়ার অযোগ্য। এটি নিঃসন্দেহে একটি আমলাতান্ত্রিক বৈষম্য। দেশের প্রায় ২০ হাজার বেসরকারি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে সমাজের মানুষ, অভিভাবক, স্থানীয় উদ্যোক্তা ও শিক্ষানুরাগীদের উদ্যোগে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে আর্থিক, মানবসম্পদ ও সাংগঠনিক টেকসই তা সম্পূর্ণরূপে সমাজের বহুমাত্রিক অংশগ্রহণের ওপর নির্ভরশীল। সেখানে সভাপতির দায়িত্ব কেবল প্রশাসনিক পদ নয়Ñ এটি একটি নেতৃত্বমূলক অবস্থান, যা প্রতিষ্ঠানের দিকনির্দেশনা, নীতি নির্ধারণ, শিক্ষক নিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং অভিভাবক-শিক্ষকের সম্পর্ক রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সাম্প্রতিক প্রবিধান সংশোধনের মাধ্যমে এই দায়িত্ব কেবল সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য সংরক্ষিত রাখার ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষমতা কার্যত আমলাতন্ত্রের হাতে সঁপে দেওয়া হয়েছে। এটি শিক্ষা প্রশাসনকে বিকেন্দ্রীকরণের বদলে আরও কেন্দ্রীয় ও নিয়ন্ত্রিত করে তুলবে। ফলে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের জায়গা সংকুচিত হবে এবং বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমে তাদের স্বাতন্ত্র্য হারাবে।
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকেও এটি সংবিধানের ১৯(১) ও ২৮(২) অনুচ্ছেদে বর্ণিত সমানাধিকারের নীতি লঙ্ঘন করে। সংবিধান বলে, সকল নাগরিকের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সমান অধিকার থাকবে। অথচ এই প্রবিধান নাগরিকদের যোগ্যতাকে ‘চাকরির পদমর্যাদা’ দ্বারা পরিমাপ করছে, যা যুক্তি ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
এক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়Ñ একজন সরকারি কর্মকর্তা কেনই-বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সভাপতি হতে ‘যোগ্য’, অথচ একজন স্নাতকোত্তর, অভিজ্ঞ সমাজকর্মী বা শিক্ষক অভিভাবক হবেন ‘অযোগ্য’? শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্দেশ্য হয়তো ছিল দক্ষ প্রশাসনিক তদারকি নিশ্চিত করা, কিন্তু বাস্তবে এটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সামাজিক নেতৃত্বের সংকট সৃষ্টি করবে।
আরেকটি গুরুতর সমস্যা হলো, বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির নাম প্রস্তাবের ক্ষেত্রে প্রধান শিক্ষক বা অধ্যক্ষের ভূমিকা প্রায় একচ্ছত্র। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রধান শিক্ষক তার ব্যক্তিগত পছন্দ বা প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম প্রস্তাব করেন। এতে যোগ্য ও নিষ্ঠাবান সমাজসেবীরা বাদ পড়ে যান। ফলে বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ প্রশাসন ব্যক্তিনির্ভর, পক্ষপাতদুষ্ট এবং অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে।
এই স্বেচ্ছাচারিতা রোধে একটি বিকল্প প্রক্রিয়া প্রবর্তন জরুরি। প্রস্তাব হতে পারেÑ ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি পদে আগ্রহী ব্যক্তিরা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রার্থিতা ঘোষণা করবেন। প্রধান শিক্ষক বাধ্য থাকবেন সকল প্রার্থীর নাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে পাঠাতে। এরপর ইউএনও বা একটি নিরপেক্ষ মনোনয়ন বোর্ড (যেখানে শিক্ষা কর্মকর্তা, স্থানীয় বিশিষ্টজন ও সমাজকর্মী অন্তর্ভুক্ত থাকবেন) আবেদনকারীদের যাচাই-বাছাই করে তিনজন প্রার্থীর নাম সুপারিশ করবেন। চূড়ান্ত অনুমোদন আসবে শিক্ষা বোর্ড বা প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে।
এই প্রক্রিয়ায় তিনটি সুফল নিশ্চিত হবেÑ প্রথমত, প্রধান শিক্ষকের ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রভাব কমবে; দ্বিতীয়ত, সমাজের যোগ্য ও শিক্ষানুরাগী নাগরিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে; তৃতীয়ত, বিদ্যালয়ের প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে।
শিক্ষা ব্যবস্থাপনা কোনো একক প্রশাসনিক দায় নয়Ñ এটি সমাজ, শিক্ষক, অভিভাবক ও প্রশাসনের যৌথ দায়িত্ব। তাই ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হওয়ার যোগ্যতা নির্ধারণে কেবল চাকরির পদ নয়, বিবেচনা করতে হবে শিক্ষাগত যোগ্যতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও নৈতিক নেতৃত্বের গুণাবলি।
আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয়Ñ বাংলাদেশের অনেক সফল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে সরকারি চাকরিজীবীদের নয়, বরং স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবীদের হাতে। তারা ছিলেন সমাজের ‘অফিসিয়াল নন-লিডার’, কিন্তু প্রকৃত অর্থে ‘শিক্ষা আন্দোলনের সৈনিক’। সেই গণমানুষের নেতৃত্বকে বাদ দিয়ে আমলাতান্ত্রিক পরিসরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালানোর প্রয়াস কেবল দূরত্ব বাড়াবে, সৃষ্টিশীলতা নয়।
অতএব, শিক্ষা প্রশাসনে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে আহ্বান জানাইÑ এই বিতর্কিত সংশোধন প্রত্যাহার করে এমন একটি প্রবিধান তৈরি করুন, যা প্রশাসনিক দক্ষতার পাশাপাশি নাগরিক অংশগ্রহণ ও শিক্ষার মানবিক মূল্যবোধকে একসঙ্গে ধারণ করবে।
এম এ বাকী বিল্লাহ
লেখক ও সংগঠক