বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২৩ অক্টোবর ২০২৫ ১২:০৩ পিএম
বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার পরিসর দিন দিন বিস্তৃত হচ্ছে। বিশেষ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বিগত দুই দশকে ক্রমাগত বেড়েছে। একসময় হাতেগোনা কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল, এখন তা শতাধিক ছাড়িয়েছে। ক্রমাগত উচ্চশিক্ষার প্রসারে এই সংখ্যাবৃদ্ধিকে ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখাই যায়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সংখ্যা বাড়লেও মানের তেমন উন্নয়ন ঘটেনি এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। বরং অনেক প্রতিষ্ঠান শিক্ষা নয়, ব্যবসায়িক চিন্তাধারায় পরিচালিত হচ্ছে।
২২ অক্টোবর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়Ñ সংখ্যা বাড়লেও মান বাড়েনি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১০ বছরে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে ৩৪টি। একই সময়ে অনুমোদন নেওয়া সাতটি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের কার্যক্রম চালুই করতে পারেনি। আবার অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে একজনও অধ্যাপক নেই। গবেষণা খরায় ভুগছে উচ্চশিক্ষার এসব প্রতিষ্ঠান। এমনকি কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের মান কোন পর্যায়ে রয়েছেÑ এ বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো তালিকাও নেই। এতে করে শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠান বাছাই করতে গিয়ে পড়তে হচ্ছে বহুবিধ সমস্যায়। এখানে উল্লেখ্য, দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা শুরু হয় ১৯৯২ সালে। সেই ধারাবাহিকতায় ২০১৪ সাল পর্যন্ত এ সংখ্যা ছিল ৮০টি। ২০১৫ থেকে ১৬ সাল পর্যন্ত ১০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন পায়। ২০২৩ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ১১৪টি। অনুমোদন পাওয়া অন্য সাতটি বিশ্ববিদ্যালয় কোনো ধরনের কার্যক্রম চালু করতে পারেনি। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় চলছে ১১ থেকে ২০ জন শিক্ষক দিয়ে। নেই অধ্যাপক। সহযোগী, সহকারী ও প্রভাষক দিয়ে চলছে শিক্ষাকার্যক্রম।
অথচ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০-এর ৩৫নং ধারায় বলা হয়েছে, শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে প্রতিটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি অভ্যন্তরীণ ‘গুণগত মান নিশ্চিতকরণ সেল বা ইউনিট’ থাকবে এবং সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক প্রতিবেদনে এ বিষয়ে গৃহীত ব্যবস্থাদি সম্পর্কে একটি বিবরণী থাকতে হবে। শিক্ষা সংশ্লিষ্টরাও স্বীকার করছেন, দেশে হাতেগোনা কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া বেশিরভাগেরই শিক্ষার মান উন্নত নয়। তারা মনে করেন, শিক্ষার্থীরা এতে হাতে-কলমে শিক্ষা থেকে তারা পিছিয়ে পড়ছে। তাই দক্ষতাসম্পন্ন গ্র্যাজুয়েট তৈরি হতে পারছে না। তারা মনে করেন, এ ক্ষেত্রে ইউজিসির সেখানে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ রয়েছে।
ভুলে গেলে চলবে না, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমিত আসন সংকট দূর করা এবং শিক্ষায় বৈচিত্র্য আনা। কিন্তু এখন দেখা যায়, অনেক প্রতিষ্ঠান মানসম্পন্ন শিক্ষক, গবেষণাগার, গ্রন্থাগার বা একাডেমিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ। শিক্ষার্থী ভর্তি হচ্ছে, টিউশন ফি দিচ্ছে, ডিগ্রিও পাচ্ছেÑ কিন্তু সেই ডিগ্রির মূল্য প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে চাকরির বাজারে। একাডেমিক তদারকির অভাব, মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থার দুর্বলতা এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের সীমিত ভূমিকা এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস নেই ভাড়া করা ভবনে চলছে, যেখানে শ্রেণিকক্ষের উপযুক্ত পরিবেশই নেই। এভাবে উচ্চশিক্ষাকে বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত করা হচ্ছে, যা দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মেধা বিকাশের জন্য ভয়াবহ সংকেত।
আসলে বেশি বেশি বিশ্ববিদ্যালয় ও আইএ-বিএ কলেজ মানেই শিক্ষার বিস্তার নয়। এগুলো কার্যত শিক্ষা-বাণিজ্য। যেন ‘ডিগ্রি’ বেচার দোকান। তাই শিক্ষার আমূল সংস্কার দরকার। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জনশক্তির চাহিদা নিরূপণ করে তার আলোকে শিক্ষিত-প্রশিক্ষিত জনসম্পদ গড়তে হবে পরিকল্পিতভাবে। বৃত্তিমূলক ও পেশাভিত্তিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণকে প্রাধান্য দিতে হবে। আমরা মনে করি, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা কেবল মেধাবীদের জন্য সংরক্ষিত করা উচিত। মেধাহীনদের উচ্চশিক্ষা জাতীয় সম্পদ ও সময়ের অপচয় মাত্র। এতে প্রকৃত জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার কোনো অগ্রগতিই হচ্ছে না।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মানোন্নয়নে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এই ক্ষেত্রে প্রথমত, শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা ও যোগ্যতাভিত্তিক নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে। যোগ্য শিক্ষক ছাড়া মানসম্মত শিক্ষা সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা তহবিল, গ্রন্থাগার ও আধুনিক ল্যাবরেটরি থাকা বাধ্যতামূলক করতে হবে। তৃতীয়ত, ইউজিসির মাধ্যমে নিয়মিত একাডেমিক অডিট পরিচালনা এবং মান যাচাইয়ের ফল প্রকাশ করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা প্রকৃত তথ্য জানতে পারেন। একই সঙ্গে পাঠ্যক্রমকে সময়োপযোগী করতে হবেÑ যাতে শিল্প, প্রযুক্তি ও চাকরির বাজারের সঙ্গে উচ্চশিক্ষার সংযোগ তৈরি হয়। অনলাইন ও প্রাকটিক্যাল লার্নিংয়ের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী পরামর্শ কেন্দ্র ও ক্যারিয়ার গাইডেন্স সেল সক্রিয় করাও সময়ের দাবি।
আমরা চাই, বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় ব্যবসায়িক নয়, একাডেমিক মানসিকতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আমরা মনে করি, শিক্ষাকে সেবামূলক কাজ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা গেলে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সত্যিকারের মানসম্পন্ন উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে ওঠা সম্ভব। আমরা আরও মনে করি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে জাতি গঠনের ক্ষেত্র হিসেবেও ভাবা উচিত। তাই শিক্ষাকে আর ব্যবসা নয়, সেবা খাত হিসেবে দেখার মানসিকতা ফিরিয়ে আনুন। তবেই এই ক্রমবর্ধমান সংখ্যার ভিড়ে মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠবে, যা বিশ্বমানের উচ্চশিক্ষার পথে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেবে। আমরা শিক্ষা জ্ঞান, দক্ষতা ও যোগ্যতা অর্জনের ক্ষেত্র হিসেবে সংকোচনের কথা বলছি না, পরিকল্পিত শিক্ষার কথা বলছি।