× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

অর্থনীতি

মূল্যস্ফীতির চাপে পিষ্ট জীবন এবং মেধার মূল্যায়ন

ড. আলা উদ্দিন, অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০২৫ ১১:০৪ এএম

মূল্যস্ফীতির চাপে পিষ্ট জীবন এবং মেধার মূল্যায়ন

২০১৫ সালে ঘোষিত সর্বশেষ জাতীয় বেতন কাঠামোর পর কেটে গেছে প্রায় এক দশক। এই দীর্ঘ সময়ে দেশের অর্থনীতিতে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন, আকাশ ছুঁয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম, আর জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে বহুগুণে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিশেষ করে শিক্ষক সমাজ, চরম আর্থিক সংকটে দিনাতিপাত করছেন। বিলম্বিত হলেও নতুন করে বেতন কাঠামো নির্ধারণের সরকারি উদ্যোগ শুরু হয়েছে। এই পদক্ষেপ একদিকে যেমন আশার সঞ্চার করেছে, অন্যদিকে প্রশ্ন তুলেছেÑ আর কতকাল মূল্যস্ফীতির কশাঘাতে জর্জরিত হয়ে থাকতে হবে রাষ্ট্রের এই গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভগুলোকে? সম্মানজনক জীবনধারণের অধিকার এবং মেধাবী প্রজন্মকে ধরে রাখার তাগিদেই এই বেতন কাঠামো নিয়ে আলোচনা এখন সময়ের দাবি।

২০১৫ সালের পর থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতি ধারাবাহিকভাবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির শিকার। পরিসংখ্যান যাই বলুক না কেন, বাজারে চাল-ডাল থেকে শুরু করে শিক্ষা ও চিকিৎসার খরচÑ সবকিছুই সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। সরকারি বেতন, যা ২০১৫ সালের হারেই স্থির রয়েছে, এই চরম মূল্যস্ফীতির সঙ্গে পাল্লা দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। একজন মধ্যম বা নিম্ন-আয়ের সরকারি কর্মচারী, যিনি সম্পূর্ণভাবে বেতনের ওপর নির্ভরশীল, তার সংসার চালানো আজ এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। বিশেষত ঢাকা বা অন্যান্য বড় শহরে বসবাসকারী কর্মচারীদের বাড়িভাড়া, সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ এবং স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক চাহিদা পূরণে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

সরকার নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু করেছে বটে, কিন্তু এই দেরির কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক চাপ ও মানসিক কষ্টের দিকটি প্রায়শই আলোচনায় আসে না। ১০ বছর একটি দীর্ঘ সময়। এই সময়ের মধ্যে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে বেতনের প্রকৃত মূল্য বহুলাংশে কমে গেছে। জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে বেতন কাঠামো স্থির রাখলে, তা প্রকারান্তরে বেতন হ্রাস করারই নামান্তর। অথচ নতুন কাঠামো তৈরির আলোচনার সময় কেবল ‘রাষ্ট্রের সামর্থ্য’ বা ‘অর্থনৈতিক চাপ’-এর কথাই জোর দিয়ে বলা হয়, কিন্তু কর্মচারীদের সম্মানজনক জীবনধারণের অধিকার এবং মূল্যস্ফীতিজনিত কারণে তাদের ওপর আরোপিত চরম বোঝার কথা সেভাবে গুরুত্ব পায় না। রাষ্ট্রের উচিত তার কর্মীদের একটি নির্দিষ্ট মানসম্মত জীবন নিশ্চিত করার অঙ্গীকার রক্ষা করা।

সাধারণত একটি কথা বহুল প্রচলিত যে, বেতন না বাড়লে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে লোভ-লালসা ও ঘুষ গ্রহণের প্রবণতা বাড়ে, যা দুর্নীতির জন্ম দেয়। এই যুক্তি আংশিকভাবে সত্য হতে পারে, তবে এটিই মোটেও প্রধান কারণ নয়। তাই দুর্নীতিপরায়ণ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে বেতন বাড়ানো অপেক্ষা মুদ্রাস্ফীতি ও পদ ও যোগ্যতা অনুযায়ী সম্মানজনক বেতন নিয়ে যথোচিত পদক্ষেপ গ্রহণই সর্বাগ্রে বিবেচ্য হওয়া উচিত। মনে রাখা বাঞ্ছনীয় যে, যখন একজন সৎ কর্মচারী তার মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে ব্যর্থ হন, তখন নৈতিকতা ও বাস্তবতার মাঝে সংঘাত সৃষ্টি হয়। কম বেতন বা ন্যায্য জীবন ধারণের সুযোগের অভাব অনেককেই অনৈতিক পথে ঠেলে দিতে পারে।

তবে এর উল্টো দিকটিও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। দুর্নীতি একটি কাঠামোগত ও সাংস্কৃতিক সমস্যা, যা শুধু বেতন বৃদ্ধির মাধ্যমে সম্পূর্ণ দূর করা সম্ভব নয়। অনেক বিত্তবান মানুষ দুর্নীতির সঙ্গে যুগ যুগ ধরে যুক্ত, যার কোটি কোটি টাকা ব্যাংকে জমা, ঢাকা শহরে একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে। এটি অনস্বীকার্য যে, সঠিক ও পর্যাপ্ত বেতন কর্মচারীকে দুর্নীতিমুক্ত থাকার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক সমর্থন জোগায়। যখন একজন কর্মচারী জানেন যে তার বেতন তার পরিবারকে একটি মর্যাদাপূর্ণ জীবন দিতে সক্ষম, তখন তার পক্ষে সৎ থাকা সহজ হয়। তাই নতুন বেতন কাঠামো কেবল জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানোর জন্য নয়, বরং সুশাসন ও নৈতিকতার মান উন্নত করার জন্যও জরুরি। পেট ও পেশার সম্মান নিশ্চিত করতে না পারলে কেবল আইন দিয়ে দুর্নীতি দমন করা কঠিন।

এই বেতন কাঠামোর আলোচনায় সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত ও ক্ষতিগ্রস্ত একটি অংশ হলো শিক্ষক সমাজ। প্রাথমিক, মাধ্যমিক, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়Ñ সর্বস্তরের শিক্ষকরাই সমাজের মেরুদণ্ড। একটি দেশের ভবিষ্যতের কারিগর তারা। কিন্তু বাংলাদেশে শিক্ষকতা পেশা, বিশেষ করে সরকারি ও বেসরকারি স্কুল-কলেজে, আজও আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদার দিক থেকে পিছিয়ে।

সঠিক বেতন ও সামাজিক সম্মান না পেলে মেধাবীরা কেন সরকারি চাকরি, বিশেষ করে শিক্ষকতা, বেছে নেবেন? এই প্রশ্নটি বারবার উত্থাপিত হলেও এর সদুত্তর মেলে না। একজন প্রথম শ্রেণির মেধাবী শিক্ষার্থী যখন দেখে যে বেসরকারি বা অন্য কোনো সরকারি চাকরিতে তার চেয়ে কম মেধার ব্যক্তিও বেশি বেতন ও দ্রুত পদোন্নতির সুযোগ পাচ্ছে, তখন সে স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষকতা পেশায় আসতে নিরুৎসাহিত হয়। ফলস্বরূপ সেরা মেধা পাচার হয়ে যায় আমলাতন্ত্র, ব্যাংক বা বেসরকারি করপোরেট খাতে। এর ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো মেধা সংকটে ভোগে, যা সামগ্রিকভাবে শিক্ষার মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। দুর্বল মেধা দিয়ে উন্নত জাতি গঠন অসম্ভব।

বিশ্বের প্রায় সব উন্নত দেশেই শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র ও সম্মানজনক বেতন কাঠামো রয়েছে। এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার অনেক প্রতিবেশী দেশও শিক্ষকদের বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বহু দেশে শিক্ষকদের একটি বিশেষ ‘প্রফেশনাল গ্রেড’ দেওয়া হয়, যা অন্যান্য আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর চেয়ে আলাদা এবং উচ্চতর হয়। বাংলাদেশেও দীর্ঘদিন ধরে সব স্তরের শিক্ষকের জন্য একটি স্বতন্ত্র বেতন কমিশন ও কাঠামো দাবি রয়েছে। শিক্ষকদের চাকরিকে অন্যান্য সাধারণ প্রশাসনিক পদের সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়। এই কাঠামো শিক্ষকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ, যোগ্যতা ও জাতির উন্নয়নে তাদের ভূমিকার স্বীকৃতি দেবে। এটি কেবল তাদের আর্থিক সচ্ছলতা দেবে না, বরং পেশাটির প্রতি সম্মানবোধ ও আকর্ষণ ফিরিয়ে আনবে।

নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণের প্রক্রিয়া যেন আর দীর্ঘ না হয়, সেদিকে সরকারকে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। পাশাপাশি এই কাঠামো নির্ধারণের সময় বর্তমান মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার বাস্তব ব্যয়ের সঙ্গে যেন বেতনের সামঞ্জস্য রাখা হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু গতানুগতিক বেতন বৃদ্ধি নয়, বরং প্রকৃত বেতন বৃদ্ধির দিকে নজর দিতে হবে, যা মূল্যস্ফীতির প্রভাবকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। প্রয়োজনে একটি স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি চালু করা যেতে পারে, যা নির্দিষ্ট মূল্যস্ফীতির হারে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেতনের কিছু অংশ সমন্বয় করবে।

নতুন বেতন কাঠামো কেবল টাকার অঙ্ক হওয়া উচিত নয়, এটি হওয়া উচিত রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তার কর্মীদের প্রতি এক প্রকার কৃতজ্ঞতা ও স্বীকৃতির সনদ। বিশেষ করে শিক্ষকদের জন্য, এই কাঠামো যেন তাদের সামাজিক মর্যাদা ও পেশাগত প্রেরণা বৃদ্ধি করে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। উন্নত বেতনের সঙ্গে শিক্ষা খাতে বিশেষ প্রণোদনা, গবেষণা অনুদান এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও উচ্চশিক্ষার জন্য সুযোগ বাড়ানো উচিত।

সরকারি কর্মচারী ও শিক্ষকরা রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ও সামাজিক ব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ। তাদের জীবনধারণের মান উন্নত হলে সামগ্রিক কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি পাবে, দুর্নীতি কমবে এবং রাষ্ট্রের প্রতি তাদের আনুগত্য আরও জোরদার হবে। বহু প্রতীক্ষিত নতুন বেতন কাঠামো তাই কেবল একটি আর্থিক সংস্কার নয়, এটি একটি সামাজিক ন্যায্যতা ও মেধা বিকাশের কৌশলগত পদক্ষেপ। সরকার দ্রুত ও বিচক্ষণতার সঙ্গে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে এবং বিশেষ করে শিক্ষকদের জন্য সম্মানজনক একটি স্বতন্ত্র পথের সূচনা করবেÑ এই প্রত্যাশায় দিন গুনছেন দেশের কোটি কোটি মানুষ। জাতীয় উন্নয়নের স্বার্থেই শিক্ষকদের সম্মানজনক বেতনের দাবিকে আর উপেক্ষা করা উচিত নয়।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা