পর্যবেক্ষণ
সাঈদ বারী, কলাম লেখক ও প্রকাশক
প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০২৫ ১১:০২ এএম
বাংলাদেশ আজ এমন এক সংবেদনশীল রাজনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে, যেখানে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য জাতীয় নির্বাচন আয়োজন রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, রাজনৈতিক মেরুকরণ ও প্রশাসনের দলীয়করণÑ সব মিলিয়ে গণতন্ত্রের ভিত দুর্বল হয়ে পড়েছে। দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের অধীনে রাজনৈতিক সংঘাত, সহিংসতা ও অবিশ্বাসের পটভূমিতে এখন ক্ষমতায় এসেছে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তাদের হাতে মূল দায়িত্বÑ দেশে এমন একটি নির্বাচন আয়োজন করা। যা নিয়ে জনগণ, রাজনৈতিক দল ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে পূর্ণ আস্থা তৈরি হবে।
এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সেই আস্থাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া। ভোট যদি জনগণের কাছে আবার অর্থবহ হয়ে ওঠে, তবে রাজনীতি ফিরবে প্রতিযোগিতা ও অংশগ্রহণের পথে। কিন্তু যদি নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়ে আবারও সন্দেহ দেখা দেয়, তাহলে রাষ্ট্র আবারও স্থবিরতার পথে ফিরে যাবে। তাই এখন প্রয়োজন স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন, যার ফলাফল জনগণ মেনে নেবে এবং যা হবে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সূচনা বিন্দু।
একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের প্রথম শর্ত হলোÑ নির্বাচন কমিশনের পূর্ণ স্বাধীনতা। অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, কমিশন অনেক সময় সরকার বা প্রশাসনের প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কমিশনের ওপর কোনো দলীয় চাপ ছাড়াই কাজ করার সুযোগ তৈরি করেছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কমিশনকে তার সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হবে। ভোটার তালিকা সংশোধন, ভোটকেন্দ্র নির্ধারণ, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের নিয়োগÑ সবকিছুতেই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কমিশনকে জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়াতে হবে, যাতে ভোটারদের মধ্যে আস্থা তৈরি হয় যে তাদের ভোট সঠিকভাবে গণনা হবে।
নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার ওপরও। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান দায়িত্ব হলো, মাঠ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এমনভাবে পরিচালিত করা, যাতে কোনো দল বা প্রার্থীর প্রতি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ না ওঠে। অতীতে দেখা গেছে, স্থানীয় প্রশাসন অনেক সময় ক্ষমতাসীন দলের নির্দেশে কাজ করেছে, যা নির্বাচনের ফলাফলকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এবার সেই চক্র ভাঙতে হবে। জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার থেকে শুরু করে থানার কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও কঠোর পর্যবেক্ষণ থাকা দরকারÑ তারা যেন কেবল আইনের প্রয়োগ করেন, রাজনৈতিক প্রভাব নয়।
এখন সময় এসেছে নির্বাচনের প্রক্রিয়াকে প্রযুক্তির বদলে মানুষের বিশ্বাসের ওপর দাঁড় করানোর। ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন নিয়ে বছরের পর বছর বিতর্ক চলেছে। জনগণের বড় অংশ এখনও কাগজের ব্যালটে বেশি আস্থা রাখে। তাই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে এই নির্বাচনে আস্থা পুনর্গঠনের স্বার্থে ধাপে ধাপে ও সীমিতভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করাই যুক্তিযুক্ত হবে। প্রথমে প্রয়োজন ভোটার তালিকার নিখুঁত যাচাই, এরপর ব্যালট পেপারে স্বচ্ছ ভোটগ্রহণ এবং ফলাফল ঘোষণার প্রতিটি ধাপে পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
সুষ্ঠু নির্বাচনের আরেকটি মৌলিক শর্ত হলো, সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ। অতীতে অনেক নির্বাচনে দেখা গেছে, বিরোধী দলের প্রার্থীরা প্রচারণায় বাধার মুখে পড়েছেন, গ্রেপ্তার হয়েছেন, এমনকি নির্বাচনী এলাকায় প্রবেশেও বাধা দেওয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিতÑ সব দলের জন্য সমান রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা। কোনো দল, মত বা প্রার্থীর প্রতি প্রশাসনিক বা আইনগত বৈষম্য যেন না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। প্রার্থীদের নিরাপত্তা, সভা-সমাবেশের স্বাধীনতা এবং প্রচারণার সুযোগ দিতে হবে। গণতন্ত্র তখনই টিকে থাকে, যখন ভোটের লড়াই হয় নীতি, পরিকল্পনা ও জনগণের আস্থার ভিত্তিতে, ভয় বা দমননীতির ভিত্তিতে নয়।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এই প্রক্রিয়ার একটি অপরিহার্য স্তম্ভ। সঠিক ও নিরপেক্ষ সংবাদপ্রবাহ না থাকলে জনগণ সত্য জানতে পারে না, আর সত্য না জানলে তারা সচেতন সিদ্ধান্তও নিতে পারে না। অতীতের নানা বিধিনিষেধ ও আইন বিশেষ করে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকে সীমিত করেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উচিত সংবাদমাধ্যমকে মুক্ত ও দায়িত্বশীলভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া। নির্বাচন কমিশনের অধীনে একটি স্বাধীন তথ্যকেন্দ্র গঠন করা যেতে পারে, যেখানে গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ ও পর্যবেক্ষকরা তথ্য যাচাই করে জনগণকে জানাতে পারবেন।
নির্বাচনে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের ভূমিকা এবারও গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কমনওয়েলথ ও ওআইসির পর্যবেক্ষক দল ইতোমধ্যেই আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তাদের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা বিশ্বদরবারে তুলে ধরবে। তবে পর্যবেক্ষক দলের উপস্থিতি যেন কেবল আনুষ্ঠানিক না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। তাদের কাজের স্বাধীনতা, তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ এবং নিরাপত্তা প্রদান জরুরি। একই সঙ্গে, নির্বাচনকালীন সহিংসতা প্রতিরোধে সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে একটি আচরণবিধি কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আরেকটি বড় দায়িত্ব হলো জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার। একাধিক বিতর্কিত নির্বাচনের কারণে ভোটারদের একাংশ মনে করে, তাদের ভোটের কোনো মূল্য নেই। এই অবিশ্বাস দূর করতে হবে বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমে। প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং দ্রুত ফলাফল ঘোষণার স্বচ্ছ প্রক্রিয়া জনগণের মধ্যে সেই বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে পারে। ভোটের দিনটি যেন উৎসবে পরিণত হয়, ভয়ভীতির প্রতীক না হয়Ñ এটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে কেবল ভোট সম্পন্ন করলেই গণতন্ত্রের পুনর্জন্ম ঘটে না। নির্বাচনের পর কীভাবে রাজনৈতিক দলগুলো আচরণ করবে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিজয়ী দল যদি ক্ষমতার সবকিছু নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করে ফেলে, অথবা পরাজিত দল যদি সংসদ বর্জন করে রাস্তায় নেমে যায় তাহলে রাষ্ট্র আবারও অচলাবস্থায় ফিরে যাবে। তাই নির্বাচনের পরই রাজনৈতিক সংলাপ, সহাবস্থান ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। সংসদকে কার্যকর করতে হবে, বিরোধী দলের অধিকার রক্ষা করতে হবে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সফলতা নির্ভর করবে তাদের নিরপেক্ষতা ও নীতিনিষ্ঠার ওপর। যদি তারা সত্যিই দলনিরপেক্ষ থেকে সব দলের আস্থা অর্জন করতে পারে, তবে এটি হবে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের নতুন সূচনা। কিন্তু যদি এই সরকারও কোনোভাবে প্রভাবিত হয় বা নির্দিষ্ট পক্ষের স্বার্থে কাজ করে, তবে জনগণের শেষ ভরসাটুকুও ভেঙে পড়বে।
বাংলাদেশের গণতন্ত্র এখন এক সন্ধিক্ষণে। বহু বছরের রাজনৈতিক অবিশ্বাস ও সংঘাতের পর এই অন্তর্বর্তীকালীন সময়ই হতে পারে পুনর্গঠনের সুযোগ। একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন রাষ্ট্রকে স্থিতিশীলতার পথে নিয়ে যাবে, আর ব্যর্থতা ঠেলে দেবে নতুন অনিশ্চয়তায়। তাই এখনই সময় রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে গণতন্ত্রের স্বার্থে ঐকমত্যে পৌঁছানোর। নির্বাচন কোনো দলের জয়লাভের মঞ্চ নয়, এটি জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রতীকÑ এই উপলব্ধিই হতে হবে আগামীর পথনির্দেশ।
গণতন্ত্র কেবল ভোটের মাধ্যমে টিকে থাকে নাÑ এটি টিকে থাকে বিশ্বাস, অংশগ্রহণ ও ন্যায়বোধের ওপর। সেই বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা আজ সবচেয়ে জরুরি। যদি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই কাজটি করতে পারে, তাহলে হয়তো দীর্ঘদিনের দমন ও অবিশ্বাসের পর বাংলাদেশ আবারও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে।