দুর্ঘটনা নাকি নাশকতা
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২১ অক্টোবর ২০২৫ ১১:৪৬ এএম
প্রবা ফটো
দেশে যেভাবে একের পর এক নাশকতা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটছে তাতে সাধারণ মানুষের মনে গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা সৃষ্টি হয়েছে। এসব নাশকতার পেছনে কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব বা গোষ্ঠীগত সংঘাতই নয়, এর সঙ্গে বাইরের শক্তির সক্রিয় ভূমিকা এবং ষড়যন্ত্রের ছায়া দেখছেন দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। বিশেষ করে, গার্মেন্টস সেক্টরের আগুন কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়, বলছেন তারা। সর্বশেষ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গোশেডে আগুনে ভস্মীভূত পণ্যগুলোর মধ্যে বেশিরভাগই পোশাক শিল্পের কাঁচামাল হওয়ায় এমন সন্দেহ আরও জোরালো হয়েছে। কয়েকদিন আগে চট্টগ্রামে ইপিজেডে আগুনে একটি ভবন পুরো ধ্বংস হয়ে যায়। তার আগে মিরপুরে গার্মেন্টসের ওয়াশিং প্ল্যান্টে আগুনে প্রাণ হারান ১৬ শ্রমিক। ধারণা করা হচ্ছে, প্রশিক্ষিত কোনো ‘পেইড’ গুপ্তচর দিয়ে এসব ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। জানা গেছে, বিষয়গুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা।
২০ অক্টোবর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘নাশকতায় বাইরের হাত’ শীর্ষক প্রতিবেদনেও নাশকতার ‘মূল টার্গেট’ গার্মেন্টস সেক্টরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, চলতি বছরের শুরুতে বাংলাদেশের ওপর ২০ শতাংশ পাল্টা শুল্কারোপ করে মার্কিন প্রশাসন। গত ২ এপ্রিল বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের জন্য শুল্কহার হবে ৩৭ শতাংশ। পরে ৮ জুলাই তা কমিয়ে ৩৫ শতাংশ করা হয়। আর ৩১ জুলাই চূড়ান্তভাবে ২০ শতাংশ শুল্কহার নির্ধারণ করে দেয় যুক্তরাষ্ট্র। এতে বাংলাদেশের পোশাক বাজারে স্বস্তি ফিরে আসে। কিন্তু আমাদের প্রতিবেশী ভারতের ওপর শুল্কারোপ করা হয়েছে ৫০ শতাংশ। শুরুতে ২৫ শতাংশ শুল্কারোপ করলেও তা বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করা হয়, যা কার্যকর করা হয় চলতি বছরের ২৭ আগস্ট। এতে বাংলাদেশের সঙ্গে পোশাক রপ্তানিতে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে তারা। মূলত তারপর থেকেই বাংলাদেশের পোশাক শিল্প নিয়ে নতুন করে নানামুখী ষড়যন্ত্র শুরু হয়। পোশাক খাতকে অস্থিতিশীল করতে প্রথমে শ্রমিকদের ব্যবহার করলেও সেখানে সফল হতে না পেরে চক্রটি ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে। এই ধারাবাহিক আগুন ওই চক্রান্তের অংশ হতে পারে।
জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ধারাবাহিক এসব অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে স্বরাষ্ট্র সচিবকে প্রধান করে ১২ সদস্যের কোর কমিটি গঠন করেছে সরকার। পুলিশের আইজি বাহারুল আলম বলেছেন, ধারাবাহিক এই অগ্নিকাণ্ডগুলো আমাদের কাছে স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। প্রতিটি ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, প্রতিটি ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ উদঘাটিত করা হোক। আমরা মনে করি, দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করা, অর্থনীতি দুর্বল করা এবং প্রশাসনিক কাঠামোকে বিপর্যস্ত করার মাধ্যমে একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করাই এসব নাশকতার মূল লক্ষ্য হতে পারে।
দেশে চলমান নাশকতা ও সহিংস কর্মকাণ্ডের পেছনে গণঅভ্যুত্থানে পরাজিত ফ্যাসিস্ট সরকারের ইন্ধন রয়েছেÑ এমন অভিযোগও শোনা যাচ্ছে। বলা হচ্ছে, ক্ষমতা হারানোর পরও তাদের একটি অংশ নেপথ্যে থেকে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে। তারা চায় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়ুক, যাতে অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের আস্থা হারায় এবং প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। গোয়েন্দা অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কিছু সাবেক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ও অর্থনৈতিকভাবে সুবিধাভোগী গোষ্ঠী গোপনে অর্থায়ন করছে নানা নিষিদ্ধ সংগঠনকে, যারা দেশের উন্নয়ন ব্যাহত করতে চায়। নাশকতা, অগ্নিসংযোগ, গুজব ও আতঙ্ক ছড়ানো তাদের পরিকল্পিত কৌশলের অংশ।
এ কথা সত্য যে, নানা প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ আজ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস, রপ্তানি ও অবকাঠামো উন্নয়নে সাফল্য দেখিয়েছে, যা আঞ্চলিক রাজনীতিতে একটি স্থিতিশীল ও প্রভাবশালী অবস্থান তুলে ধরেছে। বাংলাদেশের এই অগ্রগতি আন্তর্জাতিক কিছু স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর চোখে ঈর্ষার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই গোষ্ঠীটি চায় না বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করুক। তাই তারা কখনও মানবাধিকার ইস্যু, কখনও নির্বাচনী প্রক্রিয়া, আবার কখনও ভিন্ন ভিন্ন আন্দোলনের নামে অস্থিতিশীলতা উস্কে দিতে চেষ্টা করে। এসব নাশকতার পেছনে তহবিল ও প্রশিক্ষণের বিষয়ে বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে উঠে এসেছে। দেখা গেছে, কিছু বিদেশি সংস্থা ও ব্যক্তি গোপনে অর্থ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে স্বার্থসংশ্লিষ্ট কিছু গোষ্ঠীকে। এদের লক্ষ্য হলো, জনমনে বিভক্তি তৈরি করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা নষ্ট করা। এ অবস্থায় সরকারের পাশাপাশি নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও সচেতন জনগণকে সতর্ক থাকতে হবে।
ভুলে গেলে চলবে না, আমাদের দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জিত হয়েছে দীর্ঘ সংগ্রাম আর আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে। বিজয়ী জাতি কখনও পরাভব মানে না। তাই যেকোনো বিদেশি প্রভাব বা গোপন তৎপরতার বিরুদ্ধে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ থাকি, তবে বাইরের কোনো ষড়যন্ত্রই এই দেশকে নতজানু করতে পারবে না। এই ক্ষেত্রে সরকারকে যেমন কঠোর হতে হবে, তেমনি জনগণকেও বুঝতে হবে নাশকতা রাজনৈতিক সমাধান নয়, এটি রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধ। আমরা মনে করি, পরাজিত শক্তির এই ইন্ধন ও ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করতে জাতীয় ঐক্যই হতে পারে সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
সরকার স্বরাষ্ট্র সচিবকে প্রধান করে যে কোর কমিটি গঠন করেছে, তাকে আমরা সাধুবাদ জানাই। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, প্রতিবারই অগ্নিকাণ্ডের পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এরপর এক সময় সবকিছুই হারিয়ে যায়। আমরা চাই, এবার প্রতিটি ঘটনার পেছনের কারণ খুঁজে বের করে একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হোক। যাতে এসব নাশকতা নিয়ে জনমনে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, সেটি দ্রুত নিরসন হয়। আমরা প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চাই।