বাউবির ৩৩ বছর
ড. ইকবাল হুসাইন, অধ্যাপক (সমাজবিজ্ঞান), বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশ : ২১ অক্টোবর ২০২৫ ১১:৩৬ এএম
ছবি: সংগৃহীত
দূরশিক্ষণের সূচনা ১৮৪০’র দশকে, ইংল্যান্ডে। দূরশিক্ষণের প্রথম উদ্যোগ ছিল ডাকযোগে পোস্টকার্ড প্রেরণ করে আগ্রহীদেরকে ‘শর্টহ্যান্ড’ শেখানো। ১৮৪৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দূরশিক্ষণের লক্ষ্যে সোসাইটি টু স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্রিটেনে দূরশিক্ষণের কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৯৪ সালে। টেলিফোন আবিষ্কারের পর এটি দূরশিক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ বাহন হয়ে ওঠে। এভাবে দূরশিক্ষণ কার্যক্রম ক্রমশ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে এবং জনপ্রিয়তা লাভ করে। বাংলাদেশে দূরশিক্ষণের যাত্রা শুরু হয় ১৯৫৬ সালে। তৎকালীন শিক্ষা অধিদপ্তর ২০০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রেডিও রিসিভার বিতরণের মাধ্যমে দূরশিক্ষণ ব্যবস্থা চালু করে। ১৯৭৮ সালে চালু হয় স্কুল ব্রডকাসটিং প্রজেক্ট ( (এসবিপি)। দূরশিক্ষণ কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করতে ১৯৮৫ বাইড প্রতিষ্ঠিত হয়। বাইডের সাফল্যে ১৯৯২ সালের ২১ অক্টোবর জাতীয় সংসদে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (বাউবি) আইন পাস হয়। আজ বাউবির ৩৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী।
বাংলাদেশে উন্মুক্ত ও দূরশিক্ষণের প্রাতিষ্ঠানিক চর্চার পথিকৃৎ, বাউবির প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য ও প্রফেসর ইমেরিটাস ড. এম শমসের আলী বাউবি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। বাউবি প্রতিষ্ঠার একটি মূল্য লক্ষ্য ছিল, জীবনব্যাপী শিক্ষাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক পটভূমিতে প্রতিবছর লাখ লাখ শিক্ষার্থী মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থা থেকে ঝরে পড়ত। জীবনের কোনো একটি পর্যায়ে এদের অনেকেই আবার পড়ালেখা শুরু করতে চান। কিন্তু দীর্ঘ বিরতি, বয়স, পেশাগত ব্যস্ততা নানাবিধ কারণে তারা স্বাভাবিক শিক্ষাব্যবস্থায় ফিরতে পারেন না। আগ্রহী কিন্তু নিরুপায় এ জনগোষ্ঠীর উদ্দেশ্যেই বাউবির প্রতিষ্ঠা। তবে কেবল ঝরে পড়া, কর্মজীবী, প্রান্তিক বা অনগ্রসর শিক্ষার্থী নয়; নিয়মিত শিক্ষার্থী এবং উচ্চতর পেশাজীবীদের অনেকেই বাউবির বিভিন্ন প্রোগ্রামে ভর্তি হচ্ছেন। বাউবির পেশাজীবী শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে সাফল্য এবং উন্নতি লাভ করছেন। আবার কর্মপ্রত্যাশী শিক্ষার্থীরা নিজেদের যোগ্যতাকে উন্নীত করে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নতুন কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করছেন।
৩৩ বছরের পথপরিক্রমায় বাউবিতে ৩৫ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে এখানে এসএসসি থেকে পিএইচডি পর্যন্ত মোট ৬৭টি একাডেমিক প্রোগ্রাম চালু রয়েছে। বাউবির ২০২৩-২০২৪ সেশনে অধ্যয়ন করছেন ৩,৬৮,৩২৮ জন শিক্ষার্থী। ৬টি একাডেমিক স্কুল (অনুষদ), ১২টি প্রশাসনিক বিভাগ, ১২টি আঞ্চলিক কেন্দ্র, ৮০টি উপ-আঞ্চলিক কেন্দ্র এবং ১৫৪৭টি স্টাডি সেন্টারের মাধ্যমে বাউবি তার কর্মযজ্ঞ পরিচালনা করছে। বাউবিতে বর্তমানে ১৫৫ জন স্থায়ী (ফুলটাইম) শিক্ষক, ৬২১ জন কর্মকর্তা এবং ৬০৯ জন স্টাফ কর্মরত রয়েছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রোগ্রামে প্রায় ২৩ হাজার টিউটর/অ্যাডজাঙ্কট ফ্যাকাল্টি দায়িত্ব পালন করছেন।
বাউবি সাধারণ উন্মুক্ত ও দূরশিক্ষণ পদ্ধতিতে শিক্ষা প্রদান করে থাকে। এ পদ্ধতিতে প্রতিটি কোর্সের জন্য শিক্ষার্থীকে স্বশিক্ষণ পাঠসামগ্রী প্রদান করা হয়। প্রতিটি কোর্সে গড়ে ১৬ থেকে ২০টি টিউটোরিয়াল ক্লাস পরিচালনা করা হয়। স্টাডি সেন্টারের মাধ্যমে পরিচালিত প্রোগ্রামের ক্লাস নেওয়ার জন্য বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুযোগ্য শিক্ষকমণ্ডলীকে টিউটর হিসেবে নিয়োগ প্রদান করা হয়। শিখন প্রক্রিয়াকে সহজ ও ত্বরান্বিত করতে বাউবির নিজস্ব ই-বুক এবং অডিও-ভিডিও প্রোগ্রামগুলোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে বাউবির উচ্চশিক্ষা প্রোগ্রামগুলো প্রধানত সমন্বিত শিক্ষাপ্রণালি অনুসরণ করে। বিভিন্ন স্কুলের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত উচ্চতর প্রোগ্রামগুলোর একাডেমিক কার্যক্রমের সঙ্গে বাউবির স্থায়ী শিক্ষকমণ্ডলীর পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের স্বনামখ্যাত বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথিতযশা শিক্ষকমণ্ডলী সম্পৃক্ত রয়েছেন।
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বাউবি প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা কার্যক্রমের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিকাশে বাউবির এ প্রক্রিয়া আরও বেগবান এবং যুগোপযোগী হয়েছে। ফলে করোনাকালেও বাউবির শিক্ষাকার্যক্রম খুব বেশি ব্যাহত হয়নি।
বাউবির শিক্ষার্থীরা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিদগ্ধ বুদ্ধিজীবী, চৌকস গবেষক, তুখোড় আমলা হিসেবে নিজেদেরকে গড়ে তুলবেনÑ এমনটি সাধারণত ভাবা হয় না। বাউবি নিজেও সে কৃতিত্ব দাবি করে না। তবে বাউবির নিয়মিত শিক্ষার্থীদের অনেকেই বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি এবং বিসিএসসহ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে যোগদান করছেন। সামরিক-বেসামরিক আমলা, ব্যাংকার, বাণিজ্যিক ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ অনেক পেশাজীবী বাউবির বিবিএ, এমবিএ, সিমবা, সিমপা, প্রফেশনাল মাস্টার্স (এমডিএস, এমডিএম, এমসিসিজে ইত্যাদি) প্রোগ্রামগুলোতে ভর্তি হচ্ছেন।
যাদের শিক্ষাজীবন মাঝপথে থেমে গিয়েছিল, কিংবা যারা উচ্চশিক্ষা গ্রহণে সক্ষম হননি তাদের অনেকে বাউবির তিন বছর মেয়াদি স্নাতক (পাস) এবং চার বছর মেয়াদি স্নাতক (অনার্স) প্রোগ্রামের মাধ্যমে আবার শিক্ষাজীবনে প্রত্যাবর্তন করছেন। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষক, সৈনিক, পুলিশ, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত কর্মীসহ হাজার হাজার কর্মজীবী তাদের যোগ্যতা ও দক্ষতার উন্নয়ন ঘটাতে প্রতিবছর বাউবির বিভিন্ন প্রোগ্রামে ভর্তি হন। কর্মজীবনে প্রবেশে অপেক্ষমাণ তরুণ-তরুণীরাও নিজেদেরকে যোগ্যতর করে তুলতে বাউবির উন্মুক্ত ও দূরশিক্ষণকে বেছে নেন। এদেরকে আলোকিত জীবনের স্বপ্ন দেখানোর মধ্য দিয়ে বাউবি দেশের শিক্ষা বিস্তার, মানবসম্পদ উন্নয়ন, বেকারত্ব দূরীকরণ, সর্বোপরি দারিদ্র্য বিমোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
তবে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব এবং শ্রমবাজারে নতুন নতুন দক্ষতার চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বাউবিকে কর্মমুখী, যুগোপযোগী, লক্ষ্যভিত্তিক মানসম্মত শিক্ষা কার্যক্রমে গুরুত্ব প্রদান করতে হবে। গতানুগতিক শিক্ষার পরিবর্তে দক্ষতাভিত্তিক কোর্স-কারিকুলাম প্রণয়ন করা জরুরি। দেশি-বিদেশি শ্রমবাজারের চাহিদা বিবেচনায় রেখে মূলধারার প্রোগ্রামের পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়নমূলক বিভিন্ন কোর্স যেমন পোশাকশিল্প, যোগাযোগ প্রযুক্তি; আরবি, ইংরেজি, ফরাসি, কোরিয়ান ভাষা; গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা, কেয়ারগিভার, নার্সিং, ট্যুরিজম ও হসপিটালিটি ইত্যাদি চালু করা প্রয়োজন। বাউবির শিক্ষার মান নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তোলেন। অনেক স্টাডি সেন্টারে অনুষ্ঠিত ক্লাস-পরীক্ষাগুলোতে কার্যকর মনিটরিংয়ের ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রোগ্রামগুলোর শিক্ষার্থীদের হাতে যথাসময়ে পাঠসামগ্রী পৌঁছানোও জরুরি।
বিশ্বের মূলধারার অনেক বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় তাদের সরাসরি পাঠদানের পাশাপাশি ই-লার্নিং/অনলাইন শিক্ষাকার্যক্রমকে ক্রমশ শক্তিশালী করছে। করোনা-উত্তর পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থা এ প্রক্রিয়াকে আরও অনিবার্য করে তুলছে। বাউবিও তার একাডেমিক প্রোগ্রামগুলোতে দূরশিক্ষণ এবং সরাসরি পাঠদানের পাশাপাশি ই-লার্নিং বা অনলাইন শিক্ষাকার্যক্রমকে জোরদার করতে পারে। গবেষণা ও প্রকাশনার মাধ্যমেও প্রতিষ্ঠানটি জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে আরও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।