শাহজালালে ব্যাপক ক্ষতি
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২০ অক্টোবর ২০২৫ ১২:১৯ পিএম
আবারও আমাদেরকে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের বিভীষিকা প্রত্যক্ষ করতে হলো। যেখানে নিমতলী, চুড়িহাট্টা, চকবাজার, বঙ্গবাজার, বনানীর এফআর টাওয়ার, বেইলি রোডের রেস্টুরেন্ট, বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বিএম ডিপো, সচিবালয়ের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাগুলো বহন করছে এখনও দুঃসহ স্মৃতি। তার রেশ না মেলাতেই এবারে টঙ্গী ও মিরপুরের পর কেমিক্যালের লেলিহান আগুনে পুড়ল হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পুরাতন কার্গো ভিলেজ। ‘বিধ্বংসী আগুনে শাহজালালে ব্যাপক ক্ষতি’ শিরোনামে প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত শনিবার দুপুরে বিমানবন্দরের ৮ নম্বর গেটের একটি কুরিয়ার সার্ভিসের গোডাউন থেকে আগুনের সূত্রপাত। পরে তা আমদানিকৃত পাশের কেমিক্যাল শেডে ছড়িয়ে পড়ে। এতে মুহূর্তেই আগুনের তীব্রতা বেড়ে যায়।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ১৩টি স্টেশনের ৩৭টি ইউনিট পর্যায়ক্রমে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালায়। কিন্তু আগুনের তীব্রতা বেড়ে গেলে পরে নির্বাপণ কার্যক্রমে যোগ দেয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, নৌবাহিনী, পুলিশ ও আনসার সদস্যরা। প্রায় সাত ঘণ্টা পর কার্গো ভিলেজের আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এরপর উড়োজাহাজ ওঠানামা শুরু হয়।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মিডিয়া সেলের তথ্যানুযায়ী ২০২৩ সালে গড়ে প্রতিদিন ৭৭টি করে বছরে ২৭ হাজার ছোটবড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এই সংখ্যাটি ২০২৪ সালে ছিল ২৬ হাজার ৬৫৯টি। অর্থাৎ গত বছর দিনে গড়ে ৭৩টি আগুনের ঘটনা ঘটেছে। অন্য একটি পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১ সালের পর দেশে প্রতিবছর অগ্নিদুর্ঘটনা বেড়েছে তিন হাজারেরও বেশি।
এখন প্রশ্নÑ আগুন কেন লাগে? এর উত্তর অজানা নয়। ফায়ার সার্ভিস অধিদপ্তরের তথ্যে অগ্নিকাণ্ডের কারণের যে পরিসংখ্যান তাতে জানা যায়, গত বছরের ২৬ হাজার ৬৫৯টি আগুনের মধ্যে বৈদ্যুতিক গোলযোগে আগুনের সূত্রপাত ঘটেছে ৯ হাজার ৬৯টি। এ ছাড়া বিড়ি-সিগারেটের জ্বলন্ত টুকরা থেকে ৪ হাজার ১৩৯টি, চুলা থেকে ৩ হাজার ৫৬টি, উচ্ছৃঙ্খল জনতার লাগিয়ে দেওয়া ৭৮৯টি, ছোটদের আগুন নিয়ে খেলার কারণে ৭৫৯টি। এর পাশাপাশি উত্তপ্ত ছাই থেকে ৭৩৫টি, গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ থেকে ৭০৪টি, গ্যাসের লাইন লিকেজ থেকে ৪৬৫টি, গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে ৪৪টি, কয়েল থেকে ৪৫৫টি এবং আতশবাজি/ফানুস/পটকা পোড়ানো থেকে ৬৪টি আগুনের ঘটনা ঘটে। নাশকতা ও অন্তর্ঘাতমূলক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও ঘটে থাকে।
সম্প্রতি মিরপুর, টঙ্গী এবং শাহজালাল বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে লাগা এমন বিধ্বংসী আগুনের ভয়াবহতা আমাদের অসহায়ত্বের কথাই জানান দেয়। জানান দেয় দায়িত্বহীনতার কথাও। আমরা জানি, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা যেকোনো ভবনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যেকোনো ভবন, সেটি আবাসিক বা বাণিজ্যিক যাই হোকÑ নির্মাণের আগে যথাযথ বিল্ডিং কোড মেনে অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা থাকাও জরুরি। এ বিষয়ে ফায়ার সার্ভিস নোটিসও দেয়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই নোটিস বা ঘোষণার প্রতি থোড়াই কেয়ার করা হয়। তারই জ্বলন্ত উদাহরণ টঙ্গী, মিরপুরসহ অন্যান্য অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। আর বিমানবন্দরের আগুন, শুধু কার্গো ভিলেজই পুড়িয়ে দেয়নি, উস্কে দিয়েছে অনেক প্রশ্নও। কারণ আমরা জানি, বিমানবন্দর হলো কি পয়েন্ট ইনস্টলেশন (কেপিআই) এলাকা। এখানে রয়েছে নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা। আগুন লাগার স্বল্প সময়ের মধ্যে বিমানবন্দরের নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ সংস্থা ঘটনাস্থলে পৌঁছার কথা। তাহলে কি এ ক্ষেত্রে যথাসময়ে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা সক্রিয় হয়নি? আগুন এভাবে ছড়িয়ে পড়ার আগেই নিয়ন্ত্রণের জন্য যথাযথ ব্যবস্থায় কি ঘাটতি ছিল? অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, অগ্নিকাণ্ডের এই ঘটনাটি নাশকতা কি না সে বিষয়েও।
সম্প্রতি ঢাকা ও চট্টগ্রামে ধারাবাহিক যে কয়েকটি বড় অগ্নিকাণ্ড, তা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। শাহজালাল বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা ঘাটতির বড় ইঙ্গিত। আমরা মনে করি, সরকারের সর্বোচ্চ মহল থেকে বিয়ষটি যথাযথভাবে তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে। মনে রাখতে হবে, আগুনের শিখা নির্বাপিত হয়, কিন্তু সেই দগ্ধাবশেষের পাশে পড়ে থাকে একটি সত্যÑ ‘এই আগুনই শেষ নয়’। আমরা কেউ জানি না এই শহরের ভবিষ্যতে আরও অনেক আগুন, আরও অনেক ক্ষয়ক্ষতি লুকিয়ে আছে কিনা। আমরা সেই ক্ষয়ক্ষতিÑ আগুন আর দেখতে চাই না। আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে যাওয়া ধ্বংসস্তূপের ভেতরে থেকে স্বস্তি খুঁজতে চাই না।
কার্গো ভিলেজের আগুন ছড়িয়ে পড়া ও ধ্বংসলীলার বিভীষিকা অস্বাভাবিক। আগুন লাগার পেছনে কারণ অনুসন্ধানে ইতোপূর্বে যতবারই তদন্ত কমিটি হয়েছে, তাদের প্রতিবেদনে প্রথমেই উঠে এসেছে অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা অবজ্ঞা করার প্রবণতার বিষয়টি। নিয়ম না মানার যে প্রবণতা, তার প্রতিকার ও প্রতিবিধানের কথাও আমাদের আইন রয়েছে। আমরা মনে করি, আইন প্রয়োগ করার দায়িত্ব যাদের তারাও দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। শুধু নোটিস প্রদান করেই চোখ বন্ধ রাখতে পারেন না। সেইসঙ্গে বারবার সতর্ক করার পরও যারা সতর্ক হলো না এবং নোটিসকেই প্রকারান্তরে অস্বীকার করলো, তাদের বিরুদ্ধেও আইনানুযায়ী কড়া ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। যতদিন পর্যন্ত না আমরা আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে না পারব ততদিন পর্যন্ত বিপর্যয়ের আশঙ্কা নিয়েই আমাদের দিন যাপন করতে হবে। আমরা এই আশঙ্কার অবসান চাই।