× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পর্যবেক্ষণ

সত্য কথা কেউ শুনতে চায় না

মহিউদ্দিন খান মোহন, সাংবাদিক ও কলাম লেখক

প্রকাশ : ২০ অক্টোবর ২০২৫ ১১:৫১ এএম

সত্য কথা কেউ শুনতে চায় না

প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও নাট্যকার হ‍ুমায়ূন আহমেদের ধারাবাহিক নাটকের একটি সিকোয়েন্সÑ ভগ্নিপতি আবুল হায়াত ও শ্যালক আলী যাকের খেতে বসেছেন। শ্যালক দিনদুনিয়ার কোনো খবর রাখেন না দেখে আবুল হায়াত বললেন, ‘তুমি বোধহয় খবরের কাগজ পড়ো না’। আলী যাকেরের স্পষ্ট জবাবÑ ‘না পড়ি না। খবরের কাগজ হচ্ছে অলস লোকের বিলাস আর রিটায়ার্ড লোকের আশ্রয়। দিন নেই রাত নেই, সামনে দুটি পাতা খুলে বসে থাকো, আর কোথায় চুরি হচ্ছে, কোথায় খুন, কোথায় রাহাজানি, কোন মেয়ের দুই মাথাওয়ালা বাচ্চা হলো, কোন জামাই পালিয়েছে শাশুড়ির হাত ধরে, এইসব খবর..’। এটুকু বলার পরেই বোন আলেয়া ফেরদৌসি তার ভাইকে ‘আর কোনো কথা শুনতে চাই না’ বলে থামিয়ে দেন। বোনের কথায় রেগে গিয়ে আলী যাকের বললেন, ‘অল রাইট, নো প্রবলেম। এই আমি চুপ করলাম। সত্যিকথা কেউ শুনতে চায় না। সত্যিকথা বললেই চুপ করো, চুপ করো, যত্তসব।’ বলেই উত্তেজিত আলী যাকেরের প্রস্থান। 

সাহিত্যিক হ‍ুমায়ূন আহমেদ তার গল্প, উপন্যাস, নাটক ও চলচ্চিত্রে পাত্র-পাত্রীদের মুখ দিয়ে কখনও সিরিয়াস সংলাপ, কখনও কৌতুকের মাধ্যমে অনেক নির্মম সত্যি বের করেছেন। বহুব্রীহি নাটকের এই সিকোয়েন্সটিও অনুরূপ। তবে একজন সংবাদপত্রকর্মী হিসেবে খবরের কাগজ ‘অলস লোকের বিলাস আর রিটায়ার্ড লোকের আশ্রয়’ কথাটির সঙ্গে পুরোপুরি একমত হতে পারছি না। এটা ঠিক, ব্যস্ত জীবনে অনেকে সংবাদপত্র পাঠে মনোযোগ দিতে পারেন না। অনেকে প্রয়োজনই বোধ করেন না। আর এখন এই তথ্যপ্রযুক্তির যুগে মুদ্রিত সংবাদপত্রকে কেউ কেউ পরিত্যাজ্য মনে করেন। তাদের কথা হলো, হাতের মুঠোয় থাকা সেলফোনের বাটন টিপলেই যেখানে বিশ্বের কোথায় কী হচ্ছে নিমিষেই গোচরে আসে, তখন কী দরকার পয়সা খরচ করে হাতের বোঝা বাড়িয়ে? অথচ নিরেট সত্যি হলোÑ যারা বলেন, মোবইল ফোনে খবর দেখি, তারাও তা দেখেন না। আসলে বেশিরভাগ মানুষ জাতীয় বা আন্তর্জাতিক সিরিয়াস কোনো খবর তার হাতের ফোনসেটে দেখেন না। ইউটিউব আর রিলস নামের কনটেন্টে রসালো কোনো বিষয় পেলে মজে যান। আর ইদানীং কিছু প্রবাসী ইউটিউবারের তথাকাথিত রাজনৈতিক বিশ্লেষণ দেখে ‘আহ্! যা বললেন উনি!’ বলে ঢেকুর তোলেন। আসলে সময়টাই এরকম। নিজেকে ছাড়া চিন্তা করার সময় নেই কারও। তাই জাতীয় বা আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ খবরের কোনো খবরই কেউ রাখেন না।

তারপরও মুদ্রিত সংবাদপত্রের গুরুত্ব এতটুকু কমেনি। যদি কমত, তাহলে প্রতিদিন সংবাদপত্র অফিসগুলোতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের শয়ে শয়ে সংবাদ-বিজ্ঞপ্তি আসত না। পত্রিকায় একটি সংবাদ প্রকাশের জন্য মানুষের আকুতির কথা কি অস্বীকার করা যাবে? এখনও সামাজিক নানা সমস্যার কথা মানুষ পত্রিকার পাতায় তুলে ধরতে যতটা আগ্রহী, অন্য কোনো মাধ্যমে ততটা উৎসাহী নয়। অবশ্য টিভি চ্যানেলের সংবাদ অনেকে এখনও দেখে থাকেন। সে ক্ষেত্রে বেসরকারি টিভি চ্যানেলেই মানুষের আস্থা বেশি। বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের সঙ্গে সরকারি মালিকানাধীন বিটিভি কুলিয়ে উঠতে পারছে না। অথচ একসময় আমাদের দেশে বিটিভিই ছিল একমাত্র ভরসা। ভালো হোক, মন্দ হোক বিটিভির ৮টার খবর সবাই দেখত। এখন সরকারি এই টেলিভিশনটির প্রচারিত খবর তেমন কেউ দেখে বলে মনে হয় না। রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যম হিসেবে বিটিভি তার জন-আস্থার জায়গাটি খুইয়েছে বহু আগেই। স্বৈরশাসক এরশাদের সময় বিটিভি আখ্যা পেয়েছিল ‘সাহেব বিবি গোলামের বাক্স’ হিসেবে। সে আখ্যা এখনও অক্ষুণ্ন আছেÑ নামকরণের ভিন্নতায়। 

‘গণমাধ্যমগুলো সত্য তুলে ধরে না’Ñ এমন একটি সাধারণ অভিযোগ প্রতিনিয়ত উচ্চারিত হতে শোনা যায়। অভিযোগটি সর্বাংশে সত্য বা মিথ্যা কোনোটাই নয়। সংবাদমাধ্যম সত্য তুলে ধরে না বলা হলেও যতটুকু সত্য মানুষ জানতে পারে, তা কিন্তু সংবাদমাধ্যমের কল্যাণেই। সাম্প্রতিক সময়ে অবশ্য সামাজিক মাধ্যম বলে একটি কথা চালু হয়েছে। ফেসবুক, ইউটিউব ইত্যাদি এ মাধ্যমের অন্তর্গত। সামাজিক মাধ্যমে অনেক সময় অনেক সত্যিকথা তুলে ধরা হয়। তবে বিধিবদ্ধ সম্পাদনার অভাবে অনেক সময় অতিরঞ্জিত খবর ছড়িয়ে সমাজে অস্থিরতাও সৃষ্টি করে থাকে। তবে কোনো কোনো ঘটনায় সংবাদমাধ্যমের চেয়ে সামাজিক মাধ্যম এগিয়ে। এমনও দেখা গেছে, সামাজিক মাধ্যম থেকে তথ্যসূত্র পেয়ে গণমাধ্যমগুলো তা বিস্তারিত প্রকাশ করেছে। সুতরাং সত্য তুলে ধরার ক্ষেত্রে সামাজিক মাধ্যমের গুরুত্ব ফেলে দেওয়ার মতো নয়। 

গণমাধ্যমে সত্য তুলে ধরার ঝক্কি অনেক। সরকারের রোষানলে পড়ার ভয়ে অনেকেই সত্যকে চেপে যান। সেই কবে থেকে সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য স্লোগান দেওয়া হচ্ছেÑ আজ অবধি তা আসেনি। বরং উত্তরোত্তর আইন ও কালাকানুনের বেড়াজাল সৃষ্টি করে সত্য প্রকাশে বাধার দেয়াল সৃষ্টি করা হয়েছে। সাংবাদিকরা যাতে সত্য তুলে ধরতে না পারেন, তা নিশ্চিত করতে পাকিস্তানের স্বৈরশাসক ফিল্ড মার্শাল মোহাম্মদ আইয়ুব খান ১৯৬৩ সালে জারি করেছিলেন ‘প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশনস অ্যাক্ট’। এ আইনটির উদ্দেশ্য ছিল আইয়ুবের অগণতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে সংবাদপত্রগুলো যাতে জনমত সৃষ্টি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা। অর্থাৎ সংবাদপত্রগুলো যাতে সত্য প্রকাশ করতে না পারে। এ আইনের মাধ্যমে আইয়ুব সরকার সংবাদপত্রের প্রকাশনা ও ডিক্লারেশন বাতিলের ক্ষমতাও লাভ করেছিল। সে সময় এটাকে ‘কালো অইন’ হিসেবে আখ্যায়িত করে পুরো পাকিস্তানের সাংবাদিক সমাজ এবং রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিবাদে ফেটে পড়েছিল। যদিও তাতে কর্ণপাত করেননি স্বৈরশাসক। ওই সময় কালো এ আইনটির প্রতিবাদে যেসব রাজনৈতিক দল সোচ্চার হয়েছিল, সেগুলোর মধ্যে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ছিল অন্যতম। তারা সরকারের স্বৈরনীতির নিন্দা জানিয়ে এর প্রত্যাহার দাবি করেছিল। 

কিন্তু দৃশ্যপট ঘুরে গেল মাত্র দশ বছর পরেই। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার জারি করে ‘দ্য প্রিন্টিং প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স (ডিক্লারেশন অ্যান্ড রেজিস্ট্রেশন) অ্যাক্ট’। এক দশক আগে পাকিস্তান সরকারের সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণে আইন জারির বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ আওয়ামী লীগ স্বাধীন বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন হওয়ার দেড় বছরের মাথায় হাত বাড়ায় সংবাদপত্রের স্বাধীনতার দিকেই। আরও অবাক কাণ্ড হলো, শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার প্রণীত আইনটি ছিল আইয়ুব সরকারের আইনেরই ধারাবাহিকতা। কথায় আছেÑ ‘যে যায় লঙ্কা, সেই হয় রাবণ’। এ যেন তারই বাস্তব রূপ। সরকারে যাওয়ার আগে যে আইনকে সত্য প্রকাশে বাধা দানের উদ্দেশ্যে স্বৈরশাসকের কালো আইন বলে আখ্যায়িত করেছিল আওয়ামী লীগ, সরকারে গিয়ে তারা সে আইনকে অধিকতর কঠোর করে জারি করে। আসলে সত্যকে সব সরকারই ভয় পায়। আর ভয় পায় বলেই সত্য যাতে প্রকাশ না পায়, সে চেষ্টায় মনোযোগী হয় তারা। 

স্বাধীনতার পর গত চুয়ান্ন বছরে দেশে রাজনৈতিক নির্যাতনের পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমের ওপর শাসকগোষ্ঠীর নির্যাতনও চলেছে সমান হারে। এর মধ্যে গণহারে সংবাদপত্র নিষিদ্ধ করা থেকে শুরু করে সাংবাদিকদের জেলে পোরা পর্যন্ত সবই হয়েছে। ক্ষমতাসীনরা প্রতিদ্বন্দ্বী দলকে যতটা না ভয় পায়, তার চেয়ে শতগুণ বেশি ভয় পায় সংবাদ মাধ্যমকে। আর সেজন্যই মতপ্রকাশের এ মাধ্যমকে দলনের মওকা তারা খুঁজতে থাকে অষ্টপ্রহর। কিন্তু কেন এ ভয়? কারণ একটাইÑ বস্তুনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যম সব সময় সত্য প্রকাশে তৎপর থাকে। আর সত্য প্রকাশিত হলেই ক্ষমতাসীনদের বিপদ। সুতরাং, টিপে ধরো সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠনালি, স্তব্ধ করে দাও কথা বলার শক্তিকে। বাংলাদেশে গণমাধ্যমের জন্য সবচেয়ে ‘অভিনব’ সময় ছিল শেখ হাসিনার পনেরো বছর। অভিনব বলছি এজন্য যে, ওই সময়ে একদিকে গণমাধ্যমকে কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে, অন্যদিকে কিছু গণমাধ্যম সরকার ও সরকারপ্রধানের তুষ্টি অর্জনের জন্য তৈলমর্দনে ব্যস্ত থেকেছে। সত্য প্রকাশে ইচ্ছুক গণমাধ্যম সরকারের দমনীতির ভয়ে চুপসে থেকেছে। আরেক দল হাত কচলে সরকারের চাটুকারিতা করতে গিয়ে সত্যকে হত্যা করেছে। 

আসলে সত্য সব সময় বলাও যায় না। বললে বিপদকে নিজের কাছে দাওয়াত দিয়ে আনা হয়। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর আমরা ধরে নিয়েছি, দেশে সত্য উচ্চারণে আর কোনো বাধা থাকবে না। বাস্তব কি তা বলে? এমন কিছু সত্য আছে, যেগুলো প্রকাশ করা নিজের এবং প্রতিষ্ঠানের জন্য ঝুঁকিকে আমন্ত্রণ জানানো। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছিলেন, ‘আপনারা মন খুলে সমালোচনা করুন’। কিন্তু আমরা কি মন খুলে সমালোচনা করতে পারছি? আগে সমালোচনা করলে শেখ হাসিনার ঠ্যাঙাড়ে বাহিনীর দলনের শিকার হতে হতো, আর এখন মব বাহিনীর রোষের কবলে পড়তে হয়। 

প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক ডা. লুৎফর রহমান তার ‘মিথ্যাচার’ প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘যে জাতির লক্ষ্য ‘সত্য’ নয়, সে জাতির কোনো সাধনাই সফল হবে না। সে জাতির জীবন অন্ধকারÑ জাতির উন্নতির জন্য তারা বৃথাই শরীরের রক্ত ক্ষয় করে। সত্যই শক্তি। ইহা সকল কল্যাণের মূল।’ ডা. লুৎফর রহমান সত্যকেই শক্তি এবং সব কল্যাণের মূল বললেও সত্যকেই মানুষ সবচেয়ে বেশি ভয় পায়। তাই সত্য শুনলে অনেকে কানে আঙুল দেয়। বহুব্রীহি নাটকে আলী যাকেরের মুখ নিঃসৃত সংলাপই বোধহয় সঠিক, ‘সত্যিকথা কেউ শুনতে চায় না।’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা