আগুন
ড. তানভীর মুশতাফী
প্রকাশ : ২০ অক্টোবর ২০২৫ ১১:৩২ এএম
গত কয়েক দিনে দেশে বেশ কয়েকটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। গত শনিবার দুপুরে আগুন লাগে ঢাকার হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে। চট্টগ্রাম ইপিজেডে একটি তোয়ালে কারখানায় আগুন, এর আগে রাজধানীর মিরপুরে শিয়ালবাড়ির ৩ নম্বর রোডে অবস্থিত আলম ট্রেডার্স নামের এক রাসায়নিক গুদামে আগুন লাগে। এই আগুন বিস্ফোরিত হয়ে বিপরীত পাশের চারতলা ভবনে ছড়িয়ে পড়ে। পরে চারতলা ভবনের দোতলা ও তিনতলার বিভিন্ন স্থান থেকে ১৬টি লাশ উদ্ধার করা হয়।
আগুনের সঙ্গে আমরা সবাই পরিচিত। তারপরও বারবার কেন এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে। এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আমাদের করণীয়, দুর্ঘটনা পরবর্তীতে উদ্ধার তৎপরতাসহ নানা বিষয়ে জিজ্ঞাসা রয়েছে। অতীতে যেসব অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটেছে, প্রাণহানিসহ বিপুল ক্ষতি স্বীকার করতে হয়েছে, সেসব ঘটনার প্রেক্ষিতে আমরা কি ধরনের শিক্ষা গ্রহণ করেছি? রাজধানীর বেইলি রোডের যে বহুতল ভবনে আগুনের ঘটনা, যে দুর্ঘটনায় মর্মান্তিকভাবে পুড়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন প্রায় পঞ্চাশ জন মানুষ, পরবর্তীতে জানা যায়, সেখানে কোনো ফায়ার এক্সিটই ছিল না। সরকার সব ভবনে অগ্নি নির্বাপক যন্ত্র স্থাপন এবং অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বারবার নির্দেশনা দিলেও তা যে যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না, সে বিষয়টি আলাদা করে বলার প্রয়োজন পড়ে না।
সাধারণত দেখা যায়, আগুন লাগলে মানুষ নিচে নামে না। ধোঁয়া উঠতে থাকলে সবাই সিঁড়ি ধরে ওপরে ছুটে যায়, কারণ ছাদটাই তখন শেষ আশ্রয় মনে হয়। মিরপুর শিয়ালবাড়ীর সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডে সেই আশ্রয়টিও বন্ধ ছিল। উদ্ধারকর্মীরা বলছেন, ছাদের দরজা তালাবদ্ধ থাকায় অনেকে বেরোতে পারেননি; অধিকাংশ মৃত্যুই হয়েছে বিষাক্ত গ্যাসে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে। পাশের রাসায়নিক গুদামের মজুদ প্লাস্টিক ও অন্যান্য প্রতিক্রিয়াশীল উপাদান ধোঁয়াকে আরও প্রাণঘাতী করেছে।
এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। আমাদের শহুরে ব্যবস্থার পুরনো অসুখের নতুন লক্ষণ। ২০২৪ সালে দেশে ২৬,৬৫৯টি অগ্নিকাণ্ড নথিভুক্ত হয়েছে; যাতে মারা গেছেন ১৪০ জন, আহত হয়েছেন ৩৪১ জন। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৭৩টি করে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। এই সংখ্যা আতঙ্ক ছড়ানোর জন্য নয়; বরং মনে করিয়ে দেয়, নগরজীবনে ফায়ার সেফটি কোনো আলাদা ‘সেক্টর’ নয়, এটি বসবাস ও কর্মসংস্থানের মৌলিক অবকাঠামো। গার্মেন্টস আমাদের অর্থনীতির মেরুদণ্ড; প্রায় চার মিলিয়ন মানুষের কর্মসংস্থান, বছরে চল্লিশ বিলিয়ন ডলারের বেশি রপ্তানি। তবু বড় ব্র্যান্ডেড কারখানার বাইরে ছোট-মাঝারি ইউনিট, সাবকন্ট্রাক্টেড ফ্লোর, আবাসিক-বাণিজ্যিক মিশ্র ভবনে লুকানো ওয়ার্কশপ আর রাসায়নিক মজুদের জটিলতা নজরদারির ফাঁক রেখে দেয়। মিরপুরের ঘটনায় যেমন দেখা গেলÑ কারখানা লাগোয়া কেমিক্যাল ডিপো, দীর্ঘসময় ধোঁয়া, আশপাশের কর্মীদের অসুস্থতা, আর সেই কুখ্যাত তালাবদ্ধ ছাদ।
তাহলে দরজায় তালা পড়ে কেন? কারণটা সহজ। ভাড়াবাড়িতে কারখানা চললে মালিকেরা চুরি আর অনুপ্রবেশের ভয় পান, তাই ছাদের দরজা তালাবদ্ধ রাখেন। কিন্তু ফায়ার সেফটির নিয়ম বলছে, জরুরি নির্গমন পথ ভেতর থেকে এক টানে খোলা যেতে হবে। প্রযুক্তিগত সমাধান হাতের কাছেই আছেÑ প্যানিক বার বা ম্যাগলক আউটপুট, যেটা ভেতর থেকে চাপ দিলেই খোলে, বাইরে থেকে নিয়ন্ত্রিত থাকে। অসুবিধা প্রযুক্তিতে নয়, সিদ্ধান্তে। সিদ্ধান্তে ব্যর্থতার ফল আমরা মিরপুরেই দেখেছি। নীতিগত সমাধান তাই ‘আরও আইন’ নয়, বরং আইনগুলোর প্রয়োগ শক্ত করা। ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন হবে কেবল তখন, যখন সংশ্লিষ্ট ভবনের ফায়ার ক্লিয়ারেন্স ডিজিটালি ভেরিফায়েড। ইনস্যুরেন্স প্রিমিয়ামকে কমপ্লায়েন্সের সঙ্গে বেঁধে দিন। রুফ এক্সিট খোলা, নিয়মিত ড্রিল, অ্যালার্ম ও লাইটিং কার্যকর থাকলে প্রিমিয়াম কম হবে; না থাকলে বেশি। আর সবচেয়ে বেশি দরকার স্বচ্ছতাÑ শহরের জন্য একটি পাবলিক ড্যাশবোর্ড, যেখানে ভবনভিত্তিক কমপ্লায়েন্স দেখা যাবেÑ কতগুলো এক্সিট, সাইনেজ আছে কি না, শেষ মহড়া কবে হয়েছে। এতে নাগরিক চাপ তৈরি হবে, অজুহাত কমবে।
রাসায়নিক মজুদের ক্ষেত্রে মূল কারণ আরও জটিল। পুরান ঢাকায় দুই হাজারের বেশি গুদামের কথা বিভিন্ন রিপোর্টে এসেছেÑ বৈধ লাইসেন্সধারীর অনুপাত প্রায় এক-তৃতীয়াংশের ঘরে। ধরুন এই প্রবণতা শহরজুড়েই সত্যি; তাহলে অনিরাপদ, ছোট অথচ উচ্চঝুঁকির মজুদ খুঁজে পাওয়া কঠিন কিছু নয়। সমাধানটা সরলরৈখিক নয়। দরকার লিস্টেড সাপ্লাই চেইন, পৃথক ফায়ার রেটেড এনক্লোজার, বাধ্যতামূলক ভেন্টিলেশন ও ডিটেকশন, আর আবাসিক ও মিশ্র ব্লকে কী কী রাখা যাবে না, তার সুস্পষ্ট তালিকা। মিরপুরের ঘটনার পর সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে দ্রুত রিলোকেশনের কথা আবারও উঠেছেÑ এবার যেন তা ঘোষণায় আটকে না থেকে বাস্তবায়নে যায়। এখানে সংবাদমাধ্যম ও নাগরিকের চাহিদাও স্পষ্ট হওয়া দরকার। প্রাথমিক তদন্তে যে তিনটি তথ্য জরুরিÑ রুফ ডোর আনলক ছিল কি না, ফায়ার ক্লিয়ারেন্স ছিল কি না, ঠিক কোন ধরনের রাসায়নিক মজুদ ছিলÑ এসব দ্রুত প্রকাশ পেলে জবাবদিহিতা বাড়বে। মিরপুরের কভারেজে আমরা দেখেছি, ‘ছাদে তালা’ আর ‘টক্সিক গ্যাস’ বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছেÑ এটিই নীতিগত আলোচনার প্রারম্ভিক শর্ত। প্রতিবারের মতো না হয়ে, যদি এই তিন প্রশ্নে দৃশ্যমান জনচাপ থাকে, আচরণ বদলানো সম্ভব।
সবশেষে, ফায়ার সেফটি বিলাসিতা নয়, অপরিহার্যতা। এটি শ্রমিকের জীবন, বিনিয়োগের ধারাবাহিকতা, বিদেশি ক্রেতার আস্থা আর শহরের নৈতিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে জড়িত। রুফ এক্সিটকে ভেতর থেকে খোলা রাখার সিদ্ধান্ত, সিঁড়িঘরে স্টোরেজ না রাখার শৃঙ্খলা, মাসিক মহড়াÑ এসবের কোনোটিই অতিরিক্ত ব্যয়বহুল নয়। কঠিন হচ্ছে সমন্বয়Ñ ফায়ার সার্ভিস, সিটি করপোরেশন, শিল্পমালিক, বীমা, ব্যাংক সবাইকে এক প্লাটফর্মে আনা। বিল্ডিং কোড আমাদের পথ দেখিয়ে রেখেছেÑ দরকার কেবল সেই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার সাহস, জরুরি সময়ে এটা ভেতর থেকে এক টানে খুলবে। এক মুহূর্ত ভেবে দেখুন, ধোঁয়ায় ভরা সিঁড়িঘরে কেউ যদি কাঁপা হাতে হ্যান্ডেলে চাপ দেয় এবং দরজাটা সত্যিই খুলে যায়, তাহলে বেঁচে যায় শুধু একজন নয়, বেঁচে যায় একটা শহরের বিবেক। মিরপুর আমাদের মনে করিয়ে দিল, নিরাপত্তা কাগজে লেখা যায়, কিন্তু বাঁচার পথ থাকে সিঁড়িঘরে, সেই দরজার হ্যান্ডেলেই।