কালীপূজা
স্বামী অবিচলানন্দ
প্রকাশ : ২০ অক্টোবর ২০২৫ ১১:২৯ এএম
যিনি ব্রহ্ম, তিনি শক্তি ও মহামায়া। তার কৃপা পেতে হলে আদ্যাশক্তিরূপিণী তাকে প্রসন্ন করতে হবে। জগৎকে মুগ্ধ করে সৃষ্টি, স্থিতি, প্রলয় করছেন। তিনি অজ্ঞান করে রেখে দিয়েছেন। মহামায়া দ্বার ছেড়ে দিলে অন্দরে যাওয়া যায়। সে আদ্যাশক্তির ভেতর বিদ্যা ও অবিদ্যা দুই-ই আছে, অবিদ্যা মুগ্ধ করে; বিদ্যা যা থেকে ভক্তি, দয়া, জ্ঞান, প্রেম-ঈশ্বরের পথে লয়ে যায়। সে আদ্যাশক্তিকে প্রসন্ন করতে হবে। তাই শক্তির পূজা। ব্রহ্ম আর শক্তি অভেদ। যে যুগে আমরা বাস করছি, দুর্ভাগ্যবশত তা স্বার্থপরতা, হিংসা, মিথ্যাচরণ ও সংঘর্ষে আন্দোলিত। সুস্থ চিন্তাশীল, হৃদয়বান মানুষ সন্ত্রস্ত, সংক্ষুব্ধ। এমতাবস্থায় ঘন মেঘের আঁধার ভেদ করে শারদ-সূর্যের মতোই সংশয়দীর্ণ হৃদয়ে দিব্যোজ্জ্বল আত্মপ্রকাশ করছেন জগন্মাতা মহাশক্তি দেবী কালী। তার আগমনী বার্তা নিনাদিত হতেছে অনল অনিলে চির নভোনীলে…।
হিন্দুরা জলকে মহাপবিত্রা মনে করেন, তাই জলে প্রতিমা বিসর্জন দেন। এই জল ছাড়া জীবজগতের এক মুহূর্তও চলে না। পূজারিতে প্রধানতÑ প্রদীপ, অর্ঘসহ জলপূর্ণ শঙ্খ, বস্ত্র, পুষ্প ও চামর দিয়ে আরতি হয়। যে অনাহত ধ্বনিরূপ ঘণ্টা বাজানো হয় তাহা নাদ বা শব্দ ব্রহ্মের প্রতীক। পূজায় যে হোম বিধি রয়েছে তা হচ্ছে আমাদের পূজারূপ কর্ম ব্রহ্মরূপ অগ্নিতে আহুতি প্রদান। শান্তিপাঠ ও শান্তিজল গ্রহণে যে মন্ত্র তাতে সমগ্র বিশ্ববাসী, জড়, জীব, উদ্ভিদ, প্রাণী সবার জন্য শান্তি কামনা করা হয়। সবাইকে আলিঙ্গনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শেষ হয়। সার্বজনীনতা পূজার একটি বিশেষ দিক। কারণ যিনি শুধু পূজকের আসনে বসে মায়ের অর্চনা করেন তিনিই পূজারি নন। সামগ্রিক অর্থে যিনি মায়ের ভোগ রান্না করেন, যারা পূজাঙ্গন পরিষ্কার রাখেন সবাই তারই সন্তান, সবাই তার পূজারি। সবাই কোনো না কোনোভাবে তার পূজার পূর্ণতা সাধনে সচেষ্ট থাকেন।
সার্বজনীনতার অঙ্গ হিসেবে কুমোর তার জানা বিদ্যা দিয়ে সুন্দর মূর্তি গড়ে দেয়। ঢাকি তার সুমধুর ঢাকের বাদ্যে আবালবৃদ্ধবনিতা সবাইকে মোহিত করেন। তাঁতি তার নিজ তাঁতে সুন্দর কাপড় বুনে সবার জন্য। সঙ্গে ভাবের আদান-প্রদানও হয়। হিন্দুর পূজা পদ্ধতি মূলত ব্রহ্মসাধনেরই একটি সহজতর প্রক্রিয়া বিশেষ। স্বতঃ বিক্ষিপ্ত মনকে একটি ক্রিয়া অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে এক কেন্দ্রিক করার সুচতুর কৌশল ভিন্ন অন্য কিছুই নয়। শাস্ত্রে আছেÑ ‘দেবো ভূত্বা দেবং যজেৎ’-দেবতা পদবাচ্য হয়ে দেবতার পূজা করতে হয়। পূজা পদ্ধতির ক্রমিক অনুশীলন সাধককে সামান্যতর থেকে তাকে দেবত্বের তরে উন্নীত করে। মনকে সাময়িক বিষয় উপকরণের ওপর থেকে সরিয়ে নিয়ে বিষয় বিশেষে নিবদ্ধ করে। মনের এই নির্মল বা শুদ্ধতরে পরমাত্মার প্রতিবিম্ভ পড়ে। শাস্ত্র বলেছেনÑ সেই সদ্বস্তু শুদ্ধমনের গোচর, সেই শুদ্ধমন, শুদ্ধবুদ্ধি, শুদ্ধ-আত্মা একই। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, উপাসনা একটি স্বতন্ত্র দর্শন। আমাদের অনুভূত বিবিধ ধারণার মধ্যে শক্তির স্থান সর্বপ্রথম। প্রতি পদক্ষেপে ইহা অনুভূত হয়। অন্তরে অনুভূত শক্তি-আত্মা এবং বাইরে অনুভূত শক্তি-প্রকৃতি।
এই দুয়ের সংগ্রামই মানুষের জীবন। আমরা যা কিছু জানি বা অনুভব করি, তা এ দুই শক্তির সংযুক্ত ফল। মানুষ দেখিয়াছিল, ভালো এবং মন্দ উভয়ের ওপর সূর্যের আলো সমভাবে পড়ছে। ঈশ্বর সম্বন্ধে এ এক নতুন ধারণাÑ এক সার্বভৌম শক্তি সবকিছুর পশ্চাতে। বেদান্ত অনুসারে পরম সত্য নির্গুণ এবং নাম ও রূপের অতীত। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মতে, সেই পরম সত্যই আবার দেব-দেবীর রূপ ধারণ করেন। অধ্যাত্ম ইতিহাসে এ রকম শত শত উদাহরণ পাওয়া যায়। পরম সত্যের আরাধনা অন্তত প্রাচীন। দেবী-মাতৃকাকে ভিন্ন ভিন্ন রূপে আরাধনা করা হয়।
স্বামী বিবেকানন্দের মতে, উপাসনা অর্থাৎ তার কাছে প্রতিনিয়ত অকুণ্ঠ শরণাগতিই আমাদের শান্তি দিতে পারে তাহার জন্যই তাহাকে ভালোবাসো, ভয়ে নয় বা কিছু পাইবার আশায় নয়।
তাহাকে ভালোবাসো, কারণ তুমি সন্তান। ভালোয় মন্দে-সর্বত্র তাহাকে সমভাবে দেখ। যখন আমরা তাহাকে এইরূপে অনুভব করি, তখনি আমাদের মনে আসে সমত্ব ও চিরশান্তি। যতদিন এই অনুভুতি না হয়, ততদিন দুঃখ আমাদের অনুসরণ করিবে। তার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করে পড়ে থাকতে হবে। তিনি তো আর জাগতিক নন? তিনি অন্তর্যামী। সাধকের প্রথম জীবন কর্মচঞ্চল।
কর্মের মধ্যে তাহার জ্ঞানের উন্মেষ হয়ে থাকে পরবর্তী অবস্থায়। কিন্তু যেখানে সাধক পদে পদে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে থাকে, ইস্টলাভে বিফল মনোরথ হয়ে যান এবং হতাশ প্রাণে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন, ফলে উন্নততর ভূমি পেতে প্রার্থনা জানিয়ে থাকে তাকে অতি কাতরে। জাগতিকভাবে, যখন সন্তান খেলনা নিয়ে ভুলে থাকে, তখন মা কাছে আসেন না। যখন আর খেলনা ভালো লাগে না, তখনি কান্নাকাটি শুরু হয়ে যায় এবং মা সমস্ত কাজ ফেলে এসে কোলে নেন। তেমনি যখন আমরা এ বিশ্বজগতে সবকিছু নিয়ে মেতে থাকি, তখন মায়ের দেখা পাই না। নিষ্কামভাবে সবকিছু করতে পারলে মায়ের দেখা পাওয়া যায়।
‘যখন যেভাবে মাগো রাখিবে আমারে,
সেই সে মঙ্গল যদি না ভুলি তোমারে।’