স্বাস্থ্যসেবার চিত্র
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৯ অক্টোবর ২০২৫ ১১:৪৮ এএম
দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা এখন আর সত্যিকার অর্থে সেবা কিংবা মানবতার দৃষ্টান্ত নয়, যেন হয়ে উঠেছে টাকার কুমিরের রাজ্য। অসুস্থ মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে হাসপাতাল আর ক্লিনিকগুলো চালাচ্ছে গলাকাটা বাণিজ্য। জীবন বাঁচানোর বদলে চলছে নির্মম অর্থদৌরাত্ম্য। অপ্রয়োজনে রোগী ভর্তি করতে হয় এবং সেখানে আইসিইউতে সিট পেতে লাগে বাড়তি টাকা। ওষুধে অতিরিক্ত কমিশন, এমনকি অ্যাম্বুলেন্সেও ব্যবসার গন্ধ। সহজ করে বললে চিকিৎসা যেন আজ পেশা নয়, পরিণত হয়েছে নিছক অর্থ উপার্জনের ক্ষেত্রে।
পরিস্থিতি এমন যে, একজন রোগী যখন হাসপাতালে পৌঁছে, মুহূর্তেই সক্রিয় হয় দালাল চক্র আর সিন্ডিকেট। রোগীকে কোথায় ভর্তি করা হবে, কোন পরীক্ষা করাতে হবে, কোন ওষুধ নিতে হবেÑ সব জায়গাতেই লুকিয়ে থাকে বাণিজ্যের ফাঁদ। সরকারি হাসপাতালেও নানা অজুহাতে রোগীদের ক্লিনিকে পাঠানো হয়। আর সেখানে প্রতিটি নিঃশ্বাসের দাম ধরা হয় টাকায়। এক কথায়, দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাত আজ এক ভয়াবহ বাণিজ্যিক দানবে পরিণত হয়েছে। অসুস্থ মানুষকে ঘিরে শুরু হয়েছে এক নির্মম গলাকাটা প্রতিযোগিতা। সরকারি-বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই চলছে টাকা গেলার দাপট। হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ফার্মেসিÑ সব জায়গায় স্বাস্থ্যসেবার চেয়ে যেন লাভের অঙ্কটাই বড়। সবকিছুর সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয় গোপন মুনাফা।
সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো আইসিইউ বাণিজ্য। একটি আইসিইউ বেড পেতে এখন লাখ টাকার নিচে কিছুই চলে না। দিনে গড়ে তোলা হয় ৫০-৭০ হাজার টাকার বিল। অক্সিজেন ও মনিটরের নামে অতিরিক্ত চার্জ, অপ্রয়োজনীয় ওষুধ, আর ভুয়া সেবা দেখিয়ে চলে রোগীর স্বজনদের ওপর এক ধরনের শোষণ-নির্যাতন। অনেক সময় দেখা যায়, রোগী মারা গেলেও থামে না বিলÑ উল্টো হিসাবের খাতায় যোগ হয় নতুন অঙ্ক। যেন রোগীর মৃত্যুও এখানে ব্যবসার অংশ।
১৮ অক্টোবর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘রোগী ঘিরে গলাকাটা বাণিজ্য’ শীর্ষক প্রতিবেদনে রাজধানীর বেশ কয়েকটি হাসপাতালের সরেজমিন স্বাস্থ্যসেবার এই চিত্র উঠে এসেছে। ইউএনএফস’র হিসাব মতে, দেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি ৫৭ লাখ। সরকারি আইসিইউ আসন সংখ্যা ১ হাজার ৩৭২টি। অর্থাৎ প্রতি ১২ হাজার ৮০২ জনের জন্য বরাদ্দ রয়েছে মাত্র একটি সরকারি আইসিইউ আসন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্যানুসারে, দেশের ৪২ জেলার ৭৪টি সরকারি হাসপাতালে বর্তমানে মোট ১ হাজার ৩৭২টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে। এ ছাড়া এসব শয্যার মধ্যে ৭৫৮টি (৫৫ শতাংশ) ঢাকাভিত্তিক ২২টি সরকারি হাসপাতালে কেন্দ্রীভূত। ২০২০ সালে কোভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যানডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস (ইআরপিপি) প্রকল্পের অধীনে ৪৮ জেলায় সরকারি হাসপাতালে ১০ শয্যার আইসিইউ ইউনিট স্থাপন করা হয়। এ প্রকল্পের মাধ্যমে ২৩ জেলায় আইসিইউ সেবা চালু হয়েছিল। জনবল সংকটে কিছু জেলায় আইসিইউ সেবা বন্ধ হয়ে যায়।
পরিসংখ্যান আরও বলছে, দেশে এখনও ২২ জেলায় সরকারি কোনো আইসিইউ নেই। রোগীর অবস্থা মুমূর্ষু হয়ে পড়লে তাকে বাঁচিয়ে রাখার আশায় নিরুপায় স্বজনরা বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউর শরণাপন্ন হন। সীমিত শয্যা আর সীমাহীন চাহিদার ফাঁদে পড়ে সাধারণ মানুষ তখন বাধ্য হচ্ছেন বাড়তি বিল গুনতে। এমন প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের উচিত একটি ‘আইসিইউ রেগুলেশন নীতিমালা’ তৈরি করাÑ যেখানে হাসপাতালের শ্রেণি অনুযায়ী সর্বোচ্চ ভাড়া নির্ধারণ করা থাকবে। তার মানে সবচেয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো চিত্র রোগীকে আইসিইউতে রাখার বিষয়টি। নামিদামি বেসরকারি হাসপাতালগুলোর আইসিইউতে চিকিৎসা নিতে গেলে প্রতিদিন ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। মাঝারি মানের হাসপাতালগুলোতেও ব্যয় হচ্ছে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা। শিশুদের এনআইসিইউ বা পিসিইউতে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। এই আইসিইউ স্বল্পতার সুযোগটিই কাজে লাগাচ্ছে অসাধু চক্রটি।
বলা বাহুল্য, এই নিষ্ঠুর বাস্তবতায় স্বাস্থ্যসেবা এখন গরিবের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। যাদের হাতে টাকা আছে, তারাই বাঁচার চেষ্টা করছে, যারা অসহায় তারা নিঃশব্দে মৃত্যুর পথে হাঁটছে। আমরা মনে করি, এটা মানবতার পরাজয় এবং একটি রাষ্ট্রের জন্য দুর্ভাগ্যের। সরকারের উচিত এখনই স্বাস্থ্য খাতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির ব্যবস্থা করা। প্রতিটি সরকারি, বেসরকারি হাসপাতাল এবং ক্লিনিকগুলোতে ফি সেবার তালিকা ও খরচের কাঠামো প্রকাশ্য করা। অথচ চিকিৎসা কোনো ব্যবসা নয়, এটি মানবতার পবিত্র দায়িত্ব। এই পেশার সম্মান রক্ষা করতে হলে চিকিৎসকদের মধ্যেও ফিরিয়ে আনতে হবে নৈতিকতা ও সহানুভূতির বোধ। হাসপাতালগুলোতে দালালচক্র ও কমিশন বাণিজ্যের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চালাতে হবে।
অপ্রিয় হলেও সত্য যে, মানবতার প্রতীক স্বাস্থ্যসেবা। আজ অসৎ ব্যবসার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। আমরা মনে করি, এই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসতে হলে চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে মূল্যবোধের জাগরণ দরকার, যেখানে একজন রোগী কেবল আয়ের উৎস নয়, বরং একজন মানুষ, একটি জীবন, একটি আশার প্রতীক। আমরা চাই, চিকিৎসা হোক মানবতার, বাণিজ্যের নয়। যেখানে রোগীর কান্না টাকার শব্দে হারিয়ে যাবে না, চিকিৎসা সংশ্লিষ্টদের মমতা মিশে যাবে জীবনের গানে। আমরা আরও চাই, রোগীর চোখের জল যেন আর টাকায় মাপা না হয়, চিকিৎসকের বিবেকেই খুঁজে পাক জীবন ফেরানোর আশ্রয়।