পর্যবেক্ষণ
আবু জুবায়ের, কবি ও গবেষক
প্রকাশ : ১৯ অক্টোবর ২০২৫ ১১:৪২ এএম
কবিতা যখন কাগজে লেখা হয়, তখন তা হয় সাহিত্য। কিন্তু যখন কবিতা রাস্তায় নামে, তখন তা হয় রাজনীতি। শিল্প যখন ক্যানভাসে বন্দি থাকে, তখন সেটি রঙের খেলা; কিন্তু যখন সেটি রক্ত ও প্রতিবাদের ভাষা নেয়, তখন সেটি হয়ে ওঠে ইতিহাস। এই প্রশ্ন তাই আজও তীব্র হচ্ছে কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিকর্মীদের রাজনীতি কী? তারা কি কোনো দলের পতাকাবাহক হবেন, নাকি সময়ের অন্যায়, নিপীড়ন ও মিথ্যার বিরুদ্ধে বিবেকের কণ্ঠস্বর তুলে ধরবেন? রাজনীতি শব্দটির শাব্দিক অর্থ ‘রাষ্ট্র পরিচালনার কৌশল’, কিন্তু মানবিক অর্থে রাজনীতি মানে, ন্যায় ও অন্যায়ের ফারাক চেনা। একজন প্রকৃত শিল্পী সেই মানুষ, যিনি এই ফারাকটিকে বুঝে তাতে অবস্থান নেন।
রবীন্দ্রনাথ রাজনীতিকে দলীয়ভাবে দেখেননি। তিনি বলেছিলেন ‘রাজনীতি নয়, মানবনীতি চাই।’ তার ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসে তিনি দেখিয়েছেন, অন্ধ-রাজনীতি কীভাবে ভালোবাসা, সম্পর্ক ও সমাজকে গ্রাস করে ফেলে। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধেও ছিলেন, সেটাই তার নৈতিক রাজনীতি।
নজরুল ইসলাম তার প্রতিটি কবিতা ছিল রাজনৈতিক আগ্নেয়গিরিÑ‘আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দেব চিহ্ন।’ নজরুলের রাজনীতি ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষকে জাগানো, দলীয় পতাকা নয়Ñ বিবেকের পতাকা। বিশ্ব ইতিহাসে দেখা যায়, যখন শিল্পীরা নীরব ছিলেন, তখন অন্ধকার নেমেছে সমাজে, রাষ্ট্রে। নাৎসি জার্মানিতে কবি ও শিল্পীদের ভয় দেখানো হতো, হিটলারের বিরুদ্ধে কিছু বললেই কারাবাস। কিন্তু তখনই ব্রেখট লিখেছিলেন, ‘যে সময়ে কথা বলা বিপজ্জনক, তখন নীরবতাই অপরাধ।’
স্প্যানিশ কবি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা, একজন সমকামী, স্বাধীনচেতা কবি, যাকে ফ্রাঙ্কোর বাহিনী হত্যা করেছিল। তার অপরাধ তিনি সত্য বলেছিলেন। চিলির সংগীতশিল্পী ভিক্টর হারা পিনোচেটের সামরিক শাসনের সময় গিটার বাজাতে বাজাতে গুলিবিদ্ধ হন। কারণ তিনি শ্রমিকের গান গেয়েছিলেন। এই উদাহরণগুলো প্রমাণ করে, শিল্পীরা যখন রাষ্ট্রের অন্যায়ের মুখে নীরব থাকে, তখন স্বৈরশাসন শক্তিশালী হয়।
বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির ইতিহাস রাজনীতির ইতিহাসের সঙ্গে একসূত্রে গাঁথা। মুক্তিযুদ্ধের সময় কবিরা কেবল কবিতা লেখেননি, তারা অস্ত্রও ধরেছিলেন। চিত্রশিল্পীরা পোস্টার এঁকেছিলেনÑ ‘তোমার দেশ দখলে নিতে আসছে শত্রু।’ গান হয়ে উঠেছিল অস্ত্রের চেয়েও শক্তিশালী। জহির রায়হান লিখেছিলেন ‘হাজার বছর ধরে’, কিন্তু তার সিনেমা ‘স্টপ জেনোসাইড’ ছিল এক রাজনৈতিক চিৎকার। ১৯৬৭ সালে পাকিস্তান কাউন্সিলে পাকিস্তান দিবসে প্রথম বাংলাদেশের স্বাধীনতা দাবি করে ছড়াকার আবু সালেহ ছড়া পাঠ করেছিলেন, আমার মুখের খাবার যারা কারিং, আরতো আমি তাদের নেহি ছাড়িং, বুলেটগুলির ধারটা থারোই ধারিং, বাংলা থেকে তারিং এবং মারিং। কিংবা স্বাধীনতার পরে ধরা যাবে না ছোঁয়া যাবে না বলা যাবে না কথা, রক্ত দিয়ে পেলাম শালার মরার স্বাধীনতা।
কবি সুফিয়া কামাল ছিলেন না কোনো দলের রাজনীতিক, কিন্তু তার প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল প্রতিবাদী। ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানে তিনি নারীদের সঙ্গে রাস্তায় নেমেছিলেন, লাঠি ও গুলি উপেক্ষা করে।
আল মাহমুদ, শামসুর রাহমান, রফিক আজাদ, আবু সালেহ, রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ প্রমুখ তারা লিখেছেন যখন লিখতে ভয় ছিল, কিন্তু তারা নীরব হননি। শামসুর রাহমানের ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতাটি ছিল রাষ্ট্রের চোখে হুমকি, কিন্তু জাতির চোখে মুক্তির আলো।
আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় সংকট এখানেই কবিরা দলীয় হয়ে গেছেন। আজ অনেক কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক কোনো রাজনৈতিক দলের অনুষ্ঠানে দণ্ডায়মান, কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব। সরকারি অনুদান বা পুরস্কারের আশায় অনেকেই নিজের বিবেক বিক্রি করে দেন। এই প্রবণতা শুধু বাংলাদেশের নয়, পৃথিবীজুড়েই চলছে।
ভারতের কবি গুলজার একবার বলেছিলেন, ‘শিল্পীর ধর্ম সত্য বলা, শাসকের প্রশংসা নয়।’ কিন্তু আমরা এখন এমন একসময় পার করছি, যেখানে শিল্পকে ‘পলিসি’-র অংশ করা হচ্ছে। শাসকের মনোরঞ্জনে কবিতা লেখা হচ্ছে, গ্যালারিতে ‘গণহত্যা’কে বিমূর্ত শিল্প বলে বিক্রি করা হচ্ছে। এই অবস্থায়, সত্যিকারের শিল্পীর রাজনীতি হবে, শক্তির বিপরীতে দাঁড়ানোর সাহস।
আমাদের উপমহাদেশে শিল্প ও রাজনীতির সম্পর্ক গভীর। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেমন মানবতাকে রাজনীতির ওপরে স্থান দিয়েছিলেন, তেমনি মহাত্মা গান্ধী শিল্প ও সংস্কৃতিকে স্বাধীনতার হাতিয়ার বানিয়েছিলেন।
ফয়জ আহমেদ ফয়জের কবিতাÑ ‘বলো যে এই অন্ধকারের অন্ত আছে’Ñ এটি কেবল সাহিত্য নয়, ছিল পাকিস্তানি সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। শ্রীলঙ্কার আনন্দরাজা, পাকিস্তানের হাবীব জলিব, নেপালের মহেন্দ্র মল্ল তারা সবাই মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। তাদের রাজনীতি ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে নৈতিক প্রতিরোধ। পিকাসোর Guernica, যা স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের বেদনাকে ধারণ করে, হয়ে উঠেছিল যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের প্রতীক। আমেরিকান লেখক জেমস বল্ডউইন, একজন কৃষ্ণাঙ্গ বুদ্ধিজীবী বলেছিলেন, ‘যদি আমি সমাজে ন্যায়বিচার না দেখি, আমি সেটাকে ভালোবাসতে পারি না।’
তার লেখার মাধ্যমে তিনি বর্ণবাদ, নিপীড়ন ও শ্বেত শ্রেষ্ঠত্বের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। চিনুয়া আচেবে, নাজিব মাহফুজ, টনি মরিসন সবাই তাদের সাহিত্যকে রাজনীতির শক্তি বানিয়েছেন। শিল্প কখনও নিরপেক্ষ থাকে না। একজন সত্যিকারের শিল্পী হয় মানুষের পাশে, নয় দমনকারীর পাশে। নিরপেক্ষতার নামেও যে নীরবতা সেটি আসলে ক্ষমতার সেবা করার নামান্তর। বাংলাদেশে কবি বা শিল্পীর প্রতিবাদ করলে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়, আয়োজনে বাধা আসে, অনুদান বন্ধ হয়। কিন্তু ইতিহাস মনে রাখে না ভয় পাওয়া শিল্পীদের নাম; ইতিহাস মনে রাখে সেইসব মানুষকে, যারা অন্যায়ের মুখে ‘না’ বলেছিল।
যদি কবিরা কেবল অনুদানের জন্য লেখেন, যদি নাট্যকাররা কেবল পুরস্কারের জন্য মঞ্চ সাজান, যদি সংগীতশিল্পীরা কেবল রাজনৈতিক স্লোগান গেয়ে টেলিভিশনে ওঠেন, তবে আমরা আর শিল্পী নই, আমরা বিনোদনকর্মী।
প্রতিবাদ মানে কেবল স্লোগান নয়। প্রকৃত শিল্পী জানেন প্রতিবাদ তখনই টিকে থাকে, যখন সেটি নান্দনিক হয়, যখন তার সৌন্দর্যের ভেতর লুকিয়ে থাকে সত্যের আগুন। কবি শামসুর রাহমান ‘বন্দী শিবির থেকে’ কবিতায় যুদ্ধবন্দিদের যন্ত্রণা তুলে ধরেছিলেন, কিন্তু তাতে ঘৃণার চেয়ে বেশি ছিল মানবিক মমতা। ফয়জ আহমেদ ফয়জের ‘বল যে লাল রঙ আজও জীবিত’ কবিতায় রক্ত নয়, জাগরণের রঙ ছিল। এই নান্দনিকতা না থাকলে প্রতিবাদ টেকে না, শিল্প হয়ে যায় কেবল স্লোগানপত্র।
সত্যিকার শিল্পের শক্তি এখানেই, সে শাসককে আঘাত করে, কিন্তু সৌন্দর্যের ভেতর দিয়ে। পিকাসো ‘গুয়ের্নিকা’ এঁকে যুদ্ধবিরোধিতা করেছেন, কিন্তু তাতে কোনো রাজনৈতিক দল বা স্লোগান ছিল না; ছিল মানবতার আর্তনাদ। সালমান রুশদির ‘Midnight’s Children’ স্বাধীনতার রাজনৈতিক ইতিহাসকে রূপকের মধ্যে বুনে দিয়েছিল, যেখানে প্রতিটি চরিত্র ছিল সময়ের সাক্ষী।
বাংলাদেশে একই রকম কাজ করেছিলেন আহসান হাবীব, নির্মলেন্দু গুণ, রফিক আজাদ, আবু সালেহ প্রমুখ তারা সরাসরি রাজনৈতিক ভাষা নয়, রূপক, প্রতীক আর ব্যঙ্গের মধ্য দিয়ে কথা বলেছেন।
প্রতিবাদী শিল্প তাই কেবল ‘না’-এর ভাষা নয়, এটি ‘হ্যাঁ’-এর সম্ভাবনাও বহন করে, ন্যায়ের, প্রেমের, মানবতার পক্ষে এক অবিচল সৌন্দর্য।
আজ আমরা এমন এক যুগে আছি, যেখানে প্রতিবাদের ভাষা আর কলমে সীমাবদ্ধ নয়। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব সবই এখন নতুন মঞ্চ। কিন্তু প্রশ্ন হলো এই প্লাটফর্মগুলো কি নতুন মুক্তির ক্ষেত্র, না নতুন দমনযন্ত্র হয়ে উঠতে পারে? যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখাই কঠিন, সেখানে শিল্পীর ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ।
ডিজিটাল যুগে শিল্পীর রাজনীতি হলো মিথ্যা তথ্য, ঘৃণার প্রচার ও প্রোপাগান্ডার বিরুদ্ধে সত্যকে রক্ষা করা। যখন রাষ্ট্র মিথ্যাকে সত্য বানায়, তখন শিল্পীই হতে পারে সত্যের রক্ষাকবচ। তবে দুঃখজনক হলো, অনেক তরুণ শিল্পী এখন আত্মপ্রচারে মগ্ন। ভিউ, লাইক, শেয়ার, পুরস্কার এই সংখ্যার রাজনীতি তাদের কবিতার চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে।
ইউক্রেনের যুদ্ধ, গাজায় গণহত্যা বা বাংলাদেশের নিপীড়িত জনগণের আর্তনাদ এসব বিষয়ে যিনি নীরব থাকেন, তার শিল্প নিঃস্বার্থ নয়, আত্মমুগ্ধ। ডিজিটাল যুগে শিল্পীর কলম, ক্যামেরা বা সুর সবই রাজনৈতিক অস্ত্র। কিন্তু সেটি ব্যবহার করতে হলে আগে বিবেক জাগাতে হবে।
আজকের তরুণ কবি, শিল্পী, সাহিত্যিকদের জন্য এটি এক কঠিন সময়। চারদিকে অর্থের রাজনীতি, মতের দমন আর স্বাধীনতার সংকোচন। কিন্তু ইতিহাসে প্রতিটি স্বর্ণযুগের জন্ম হয়েছে প্রতিরোধের যুগে। নজরুল এসেছিলেন ঔপনিবেশিক নিপীড়নের সময়, তবু তিনি গান গেয়েছিলেন,
‘গাহি সাম্যের গান, মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই।’
তরুণদের মনে রাখতে হবে প্রকৃত রাজনীতি মানে ক্ষমতা নয়, দায়িত্ব। তাদের রাজনীতি হতে হবে প্রশ্ন করা, বিশ্লেষণ করা, মানবিক হওয়া। একজন তরুণ শিল্পী যখন সত্য আঁকেন, তখন সে শুধু ছবি আঁকেন না, ভবিষ্যতের মানচিত্র আঁকেন। বাংলাদেশে, ভারতে, পাকিস্তানে, নেপালে এই উপমহাদেশে তরুণ প্রজন্ম যদি দলীয় রঙে নিজেকে রাঙায়, তবে শিল্প মারা যাবে। কিন্তু তারা যদি রাস্তায় নামা মানুষের কণ্ঠ, শ্রমিকের মুখ, নারীর চোখ, নদীর জল, শিশুর কান্না এসব ধারণ করে তবে তাদের শিল্পই হবে আগামী দিনের রাজনীতি।
কবি বা শিল্পীর রাজনীতি দলীয় হতে পারে না, কারণ দল ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু শিল্প চিরস্থায়ী। রাজনীতি যদি ক্ষমতা চায়, তবে শিল্প চায় ন্যায়। একজন কবি কখনও সংসদে যান না, কিন্তু তার কবিতা সংসদে পৌঁছে যায়, নীতিনির্ধারকদের বিবেক নাড়া দেয়।
………
রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘শাসন নয়, সৃষ্টিই মানুষকে মুক্তি দেয়।’ আজ যখন পৃথিবী ভরে গেছে ঘৃণা, যুদ্ধ, দমন ও বিভাজনেÑ তখন কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিকর্মীÑ তারাই মানবতার শেষ আশ্রয়। তারা যদি দলীয় পতাকা ত্যাগ করে মানবতার পতাকা হাতে নেন, তাহলে হয়তো পৃথিবীটা একটু বদলাবে।