× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

শেষ পর্ব

তারেক রহমান যেভাবে নির্বাসিত হয়েছিলেন

জিবলু রহমান

প্রকাশ : ১৮ অক্টোবর ২০২৫ ০৯:৩১ এএম

তারেক রহমান যেভাবে নির্বাসিত হয়েছিলেন

শেষ পর্যন্ত আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে উচ্চ আদালত থেকে জামিন লাভের মাধ্যমে মুক্ত হন তারেক। কারাবন্দি তারেক তার বিরুদ্ধে সাজানো ঘুষ গ্রহণ মামলা থেকে নিজেকে অব্যাহতি এবং জামিন চেয়ে ২ জুন ২০০৮ হাইকোর্টে রিট আবেদনটি দায়ের করেন। ৭ আগস্ট ২০০৮ বিচারপতি শরীফ উদ্দিন চাকলাদার ও বিচারপতি মো. ইমদাদুল হক আজাদ সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ একই বিষয়ে একাধিক মামলা চলতে পারে কি না তা হাইকোর্ট স্পষ্ট নয় বলে আদালত তারেকের ৫৬১ ধারায় দায়ের করা অব্যাহতি আবেদন সরাসরি আপিল করার সুযোগ দিতে সংবিধানের ১০৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সার্টিফিকেট দেওয়ার কথা বলেন। এ প্রসঙ্গে আদালত অভিমত প্রকাশ করেনÑ‘সাধারণত, হাইকোর্ট সার্টিফিকেট ইস্যু করলে আবেদনকারী এর প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট আপিল বিভাগের স্থগিতাদেশ চাইতে পারেন।’

আদালত একই সঙ্গে নিম্ন আদালতে মামলাটির বিচার কার্যক্রম ১২ আগস্ট ২০০৮ পর্যন্ত স্থগিত ঘোষণা করেন। এর আগে আদালতের কার্যক্রম শুরুর পর আদালত দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কৌঁসুলিকে তারেকের চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি উপস্থাপন করতে বলেন। ৪ আগস্ট আদালত এ নথি তলব করেছিলেন। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সরকার পক্ষ তারেকের মেডিকেল রিপোর্ট উপস্থাপন না করায় আদালত অসন্তোষ প্রকাশ করেন। পরে তারেকের আইনজীবীরা তার মেডিকেল রিপোর্ট আদালতে উপস্থাপন করেন। 

২৭ আগস্ট ২০০৮ সাব্বির হত্যা মামলা ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় আপিল বিভাগ তারেককে জামিন মঞ্জুর করেন। এ জামিনের পর তারেকের মুক্তি পাওয়া প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায়। তবে ২৮ আগস্ট তারেককে হাইকোর্ট বিভাগের মঞ্জুর করা ৬টি জামিনের বিরুদ্ধে সরকার ও দুর্নীতি দমন কমিশন আপিল করে। তাদের আপিলে হাইকোর্ট বিভাগের দেওয়া জামিন আদেশ স্থগিত করার আবেদন জানানো হয়। ১ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগের অবকাশকালীন চেম্বার জজের আদালতে সরকার ও দুদকের আপিল একসঙ্গে শুনানি করা হয়। শুনানি শেষে আপিল বিভাগের চেম্বার জজের আদালত সরকার ও দুদকের আবেদন খারিজ করে দেন। এই খারিজ আদেশের পর তারেকের জামিনে মুক্তি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়। ১ সেপ্টেম্বর ২০০৮ বেলা সাড়ে ১১টায় এ আদেশের পর মুক্তি পেতে প্রতীক্ষা করতে হয় ৩ সেপ্টেম্বর বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত।

দীর্ঘ আইনী লড়াই শেষেও দুদিন প্রতীক্ষার পর অবশেষে মুক্তি পান তারেক। নানা অনিশ্চয়তা ও প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে ৩ সেপ্টেম্বর ২০০৮ বিকাল ৪টা ৩৫ মিনিটে তিনি মুক্তি পান। বেলা সোয়া ৩টা পর্যন্ত দৈনিক দিনকাল সংক্রান্ত মামলার বিষয়টি নিয়ে মুক্তি পাওয়া অনিশ্চয়তার ধূম্রজালে আটকে ছিল। এ নিয়ে তারেকের আইনজীবী ও কারা কর্তৃপক্ষের মধ্যে দীর্ঘ ৩ ঘণ্টা আইনগত ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা হয়। কারা অধিদপ্তরে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তারেকের পক্ষে তার আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিমুল বিশ্বাস, ব্যারিস্টার নওশাদ জামির, ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন অসীম ও ব্যারিস্টার কায়সার কামাল উপস্থিত ছিলেন। অপরদিকে ডিআইজি প্রিজন, জেল সুপার, সিনিয়র জেল সুপার ও কারা কর্তৃপক্ষের একজন আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন। কারা কর্তৃপক্ষের কাছে দিনকাল প্রকাশনা লিমিটেডের মামলায় তারেকের জেল ওয়ারেন্ট দেখানো হয়েছিল। অপরদিকে দিনকাল প্রকাশনা লিমিটেড বিলুপ্ত ঘোষণা করে হাইকোর্ট বিভাগের দেওয়া রায়ের ফলে মামলাটি বিলুপ্ত হয়ে যায়। এ মামলায় জামিনের বিষয়ে কোনো আদেশ না থাকায় বিভ্রান্তিতে পড়েছিল কারা কর্তৃপক্ষ। এ নিয়ে কারা কর্তৃপক্ষ প্রশ্ন উত্থাপন করলে তারেকের মুক্তি পাওয়া নিয়ে সাময়িক অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। এ সময় চার আইনজীবী ছুটে যান কারা অধিদপ্তরে। সেখানে দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে বেলা সাড়ে ৩টা পর্যন্ত একটানা বৈঠক হয়। বৈঠকে আইনগত ব্যাখ্যা পেশ করেন তারেকের আইনজীবীরা। 

দীর্ঘদিনেও বিষয়টি কারা কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন হয়নি। এ নিয়ে বিভ্রান্তিতে ছিলেন কারা কর্মকর্তারা। বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ার পর তারেকের মুক্তি দেওয়া হয়। তৎকালীন ডিআইজি প্রিজন শামসুল হায়দার সিদ্দিকী ও সিনিয়র জেল সুপার তৌহিদুল ইসলাম হাসপাতালে এসে তার মুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেন। প্রত্যাহার করে নেওয়া হয় জেল কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা কর্মীদের। ডিআইজি প্রিজন শামসুল হায়দার সিদ্দিকী বিকালে তারেকের মুক্তি নিশ্চিত করে পিজি হাসপাতালের সামনে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেনÑ‘দিনকাল প্রকাশনা লিঃ মামলা নিয়ে সন্দেহ দূর করার পর তারেকের মুক্তি দেওয়া হয়েছে।’

তারেক রহমান মুক্তÑ এ ঘোষণা দেওয়ার পর ডিআইজি প্রিজন মেজর শামসুল হায়দার সিদ্দিকীকে আবেগে মাল্যভূষিত করেন বিএনপি নেতা-কর্মীরা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের ডি ব্লকের ইউনিভার্সিটি কার্ডিয়াক সেন্টারের চারতলায় অবস্থানরত তারেকের কক্ষ থেকে কারাবন্দি প্রত্যাহার করে নিচে আসার পর এ ঘটনা ঘটে। এ সময় তিনি তারেক রহমানকে উদ্ধৃত করে দলের নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে করে বলেনÑ‘তিনি আপনাদের তার জন্য দোয়া করতে বলেছেন। মিছিল-মিটিং না করার জন্য বলেছেন।’

মুক্তি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় ছিলেন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা। এ নিয়ে তারেকের আইনজীবীদের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আইনি লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে। চিকিৎসাধীন তারেক মুক্তি পর্যন্ত পিজি হাসপাতালের ডি ব্লকের একটি কেবিন ছিলেন। মুক্তি পাওয়ার পরও তারেক হাসপাতালেই ছিলেন। 

তারেক মুক্তি পাবেনÑ এ খবরে সকাল থেকে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা পিজি হাসপাতালের সামনে এসে ভিড় করেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নেতা-কর্মীদের উপস্থিতিও বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে পিজি হাসপাতাল চত্বর লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। তারা তারেক ও খালেদা জিয়ার পক্ষে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। একপর্যায়ে স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। বিকালে তারেকের মুক্তি নিশ্চিত হওয়ার পর নেতা-কর্মীরাও মোনাজাত করে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেন। মুক্তির পর বিকালে বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেন, স্থায়ী কমিটির সদস্য চৌধুরী তানভীর আহমেদ সিদ্দিকী, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হান্নান শাহ ও যুগ্ম মহাসচিব গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, বিএনপির দপ্তর সম্পাদক রিজভী আহমদসহ কয়েকজন সিনিয়র নেতা তারেকের সঙ্গে হাসপাতালে কেবিনে দেখা করেন। 

মুক্তি নিশ্চিত হওয়ার পর তারেক হাসপাতালের বিছানায় শোয়া অবস্থায়ই আল্লাহর দরবারে শোকরানা আদায় করেন। শোকরানা নামাজ শেষ করে মোবাইলে কথা বলেন স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানের সঙ্গে। সোয়া ৫টায় ফুলের তোড়া হাতে নিয়ে তারেকের স্ত্রী ডা. সৈয়দা জুবাইদা রহমান, তার বড় বোন সৈয়দা শাহিনা খানম ও তার স্বামী হাসপাতালে তারেকের কক্ষে প্রবেশ করেন। তারাও আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেন এবং শান্তির প্রতীক একজোড়া কবুতর হাসপাতাল কেবিনের জানালা দিয়ে উড়িয়ে দেন। তারেক তাদের সহযোগিতা নিয়ে বিছানায় শোয়া অবস্থা থেকে একটু উঠে হাসপাতাল কেবিনের জানালা দিয়ে উপস্থিত নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে হাত উঁচু করেন। তবে তিনি হাত নাড়াতে পারছিলেন না। শুধু হাতটি একটু উঁচু করে বের করেছিলেন। উঠে বসতে না পারায় নেতা-কর্মীদের চেহারাও দেখাতে সক্ষম হননি। তারেক রহমান অসহ্য যন্ত্রণায় কাঁদতে কাঁদতে স্ট্রেচারে গিয়ে লন্ডনের প্লেনে উঠেছিলেন ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর।


জিবলু রহমান

কলাম লেখক ও গবেষক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা