ইমেইল থেকে
এস এম রায়হান মিয়া
প্রকাশ : ১৮ অক্টোবর ২০২৫ ০৯:১৭ এএম
মিরপুরের শিয়ালবাড়ীতে সংঘটিত ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি একটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার নগ্ন প্রতিচ্ছবি, প্রশাসনিক কাঠামোর জীর্ণতা ও সমাজের নৈতিক সংকটের এক কঠিন দলিল, যেখানে আগুনে পুড়ে মারা গেছে কেবল মানুষ নয়Ñ দগ্ধ হয়েছে মানবিকতা, নীতি, জবাবদিহিতা ও রাষ্ট্র নামের একটি কাঠামোর অদৃশ্য অথচ গভীর ব্যর্থতা। এই আগুনের ধোঁয়া শুধু ভবনের ভেতরে ছড়িয়ে পড়েনি, ছড়িয়ে পড়েছে আমাদের সমষ্টিগত বিবেকের ওপর, আমাদের রাষ্ট্রের মানচিত্রে এক কালো দাগ হয়ে, যেখানে শ্রমিকের প্রাণকে দেখা হয় পরিসংখ্যানের দৃষ্টিতে, যেখানে মৃত্যুর খবর শিরোনাম হয় কয়েকদিনের জন্য, তারপর মুছে যায় প্রশাসনিক কাগজের কোনায়।
এই অগ্নিকাণ্ডের পেছনে লুকিয়ে আছে বহু বছরের একটি পচে যাওয়া শাসন কাঠামো, যেখানে নিয়ম-কানুন আছে কাগজে, তদারকি আছে প্রতিবেদনে, আর দায়বদ্ধতা আছে কেবল ভাষণে, বাস্তবে যার অস্তিত্ব প্রায় শূন্যের কোঠায়। একটি চারতলা ভবন, যেখানে ছিল রাসায়নিক গুদাম, সেখানে শ্রমিকেরা দিনরাত কাজ করছিল অথচ ছিল না অগ্নিনিরাপত্তার ন্যূনতম কোনো ব্যবস্থা, ছাদের দরজায় ছিল তালা, বের হওয়ার পথ বন্ধ, ফায়ার এক্সিট ছিল কেবল কল্পনায়, আর অনুমোদনের কাগজ ছিল হয়তো কারও ড্রয়ারেÑ এই সবকিছু আসলে একটি সিস্টেমেটিক অবহেলার প্রতীক, যা একদিন না একদিন অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হবেই, এবং সেটাই হলো। এই রাষ্ট্রে প্রতিটি বড় দুর্ঘটনার পর এক অভিন্ন নাটক চলেÑ দুঃখ প্রকাশ, তদন্ত কমিটি, প্রশাসনিক সভা, প্রতিশ্রুতির ঝাঁপি, মিডিয়ার হেডলাইন, আর তারপর নীরবতা। কিন্তু আগুন কখনও নীরব হয় না; তার তাপ থেকে যায়, জ্বলতে থাকে অঘোষিত প্রশ্নের মতোÑ এই রাষ্ট্রের দায় কে নেবে? এই সমাজের বিবেক কে জাগাবে? এই প্রশাসনের তন্দ্রা কে ভাঙাবে?
রাষ্ট্র যে কেবল প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে উঠেছে, তা আর আড়াল করার কিছু নেই। আগুন লাগার পর ফায়ার সার্ভিস আসে, পুলিশ আসে, সেনাবাহিনী আসে, মন্ত্রী আসে, ক্যামেরা আসেÑ কিন্তু আগুন লাগার আগেই যে কেউ আসেনি সেটাই মূল সমস্যা। প্রতিরোধমূলক সংস্কৃতি এই রাষ্ট্রে নেই, আছে কেবল পরবর্তী ধাপের প্রতিক্রিয়া। যেন রাষ্ট্র কেবল মৃতদেহ দেখলে জেগে ওঠে, কিন্তু জীবিত মানুষ বাঁচানোর কোনো দায়িত্ব তার নেই। রাসায়নিক গুদাম যদি অনুমোদিত হতো, যদি শ্রমিকদের নিরাপত্তা প্রোটোকল থাকত, যদি ফায়ার এক্সিট খোলা থাকত, যদি ছাদের দরজায় তালা না থাকত, তাহলে হয়তো আজ এতগুলো প্রাণ হারাতে হতো না। কিন্তু ‘যদি’ শব্দটি বাংলাদেশের প্রশাসনিক বাস্তবতায় এক নিষ্ঠুর বিদ্রুপ পরিণত হয়েছে। কারণ এই ‘যদি’ শব্দের পেছনে লুকিয়ে আছে দুর্নীতি, ঘুষ, রাজনৈতিক ছত্রছায়া, ক্ষমতার দম্ভ এবং শ্রমিকের জীবনের অবমূল্যায়ন। এখানে শ্রমিককে দেখা হয় উৎপাদনের যন্ত্র হিসেবে, মানুষ হিসেবে নয়।
রাষ্ট্রের নৈতিক দায় এখানে নিছক একটি ধারণাগত বিষয় নয়Ñ এটি একটি বাস্তব দায়। রাষ্ট্র মানে কেবল সরকার নয়, রাষ্ট্র মানে প্রশাসনিক কাঠামো, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, স্থানীয় সরকার, তদারকি সংস্থা, নীতি নির্ধারণকারী প্রতিষ্ঠানÑ সবাই মিলে এক বৃহৎ দায়িত্বশীল সত্তা। কিন্তু এই সত্তা কার্যত নিষ্ক্রিয়, অকার্যকর, উদাসীন এবং প্রায়শই দুর্নীতিগ্রস্ত। এই অগ্নিকাণ্ডের পেছনে যে রাসায়নিক গুদাম ছিল তা অনুমোদনবিহীন, অথচ বছরের পর বছর চালু ছিলÑ এটা কি কেবল গুদাম মালিকের অপরাধ, নাকি প্রশাসনিক তদারকির চরম ব্যর্থতা? নিয়মিত পরিদর্শন কোথায় ছিল? স্থানীয় প্রশাসন কি ঘুমিয়ে ছিল? নাকি ঘুষের বিনিময়ে চোখ বন্ধ করে রেখেছিল? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কোনো তদন্ত কমিটি কখনও দেয় না, আর সেখানেই লুকিয়ে আছে রাষ্ট্রীয় উদাসীনতার কেন্দ্র।
শ্রমিক নিরাপত্তা এই দেশে কেবল কাগজে লেখা একটি শব্দবন্ধ। শ্রম আইন আছে, কিন্তু তার প্রয়োগ নেই। ফায়ার সেফটি প্রটোকল আছে, কিন্তু তা মানার সংস্কৃতি নেই। অধিকাংশ শিল্পকারখানায় জরুরি বহির্গমন পথ নেই, থাকলেও তালাবদ্ধ থাকে। শ্রমিকেরা জানে না কীভাবে বিপদে বাঁচতে হয়, কারণ তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় না। তারা জানে কেবল কীভাবে দ্রুত উৎপাদন বাড়াতে হয়।
এই দুর্ঘটনা একটি বড় সত্যকে সামনে নিয়ে এসেছেÑ এই রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো আসলে অদক্ষ এবং নৈতিকভাবে পঙ্গু। এখানে দুর্যোগ প্রতিরোধ নয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা হয়; এখানকার নীতি প্রণয়ন হয় শোকবার্তার পর, প্রতিরোধমূলক পরিকল্পনা নয়। আর জনগণÑ বিশেষ করে শ্রমজীবী জনগণÑ এখানে কেবল ভিকটিম, কখনও সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী নয়। রাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কেবল মৃত্যুর পরে শুরু হয়, জীবিত অবস্থায় নয়। অথচ একটি সভ্য রাষ্ট্রে শ্রমিকশ্রেণিই শিল্পায়নের ভিত্তি, অর্থনীতির প্রাণশক্তি। কিন্তু বাংলাদেশে এই শ্রেণিকে দেখা হয় তুচ্ছ চোখে, তাদের রক্ত ও ঘাম দিয়ে শিল্প-বাণিজ্যের চাকা ঘোরে, অথচ নিরাপত্তার ন্যূনতম নিশ্চয়তা দেওয়া হয় না।
এই আগুন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেÑ রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে এক ভয়াবহ বৈষম্য বিরাজ করছে। একদিকে ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর জন্য সুরক্ষা, প্রটোকল, জরুরি নির্গমন, অ্যালার্ম সিস্টেম, বহির্গমন পরিকল্পনা; অন্যদিকে শ্রমিকশ্রেণির জন্য তালাবদ্ধ ছাদ, রাসায়নিক ধোঁয়া, শ্বাসরোধ হয়ে মৃত্যু। এই বৈষম্য কেবল অর্থনৈতিক নয়, এটি নৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য। এটি এমন এক প্রকার শ্রেণিবৈষম্য যা রাষ্ট্রীয় নীতি দ্বারা পুষ্ট হয়, প্রশাসনিক নীরবতায় টিকে থাকে এবং জনগণের অসহায়ত্বে বৈধতা পায়। এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে কোনো শক্তিশালী সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে না ওঠা পর্যন্ত শিয়ালবাড়ীর মতো অগ্নিকাণ্ড আবার ঘটবেইÑ শুধু জায়গা আর তারিখ বদলাবে।
এই আগুন কেবল শ্রমিকের মৃত্যু নয়, এটি রাষ্ট্রের নৈতিক মৃত্যুঘণ্টা। আর এই মৃত্যুঘণ্টার শব্দ আমাদের সবার কানেই বাজছেÑ প্রশাসনের, রাজনীতির, সমাজের, নাগরিকের। এখন প্রশ্ন হলোÑ আমরা কি এই শব্দ শুনে জেগে উঠব, নাকি অভ্যস্ত হয়ে যাব এই শব্দে? রাষ্ট্রকে তার মৌলিক দায়িত্বে ফিরে যেতে হবে, কারণ শ্রমিকের জীবন কোনো তুচ্ছ পরিসংখ্যান নয়, এটি একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিশ্রুতি। আর এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা মানে কেবল অগ্নিকাণ্ড রোধ করা নয়, রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিকে পুনর্গঠন করা। শিয়ালবাড়ীর আগুন সেই আহ্বান আমাদের সামনে ছুড়ে দিয়েছেÑ এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা রাষ্ট্রের।
এস এম রায়হান মিয়া
সিনিয়র শিক্ষক ও কলাম লেখক, সদর, গাইবান্ধা