গাজা
ওমর ফারুক, গণমাধ্যমকর্মী
প্রকাশ : ১৭ অক্টোবর ২০২৫ ১২:৩৯ পিএম
গাজা উপত্যকার ধ্বংসস্তূপে ধীরে ধীরে ফিরে আসছে জীবনের চিহ্ন। দীর্ঘদিনের নারকীয় হত্যাযজ্ঞের পর অবশেষে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে এবং ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার ও বন্দিবিনিময়ের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। তবে যুদ্ধ থেমে গেলেই যে শান্তি নিশ্চিত হবে, তা বলা যাচ্ছে না। কারণ এখন মঞ্চে উঠে এসেছে একটি জটিল, নতুন রাজনৈতিক প্রশ্ন :
‘যুদ্ধবিরতির পর গাজা কে চালাবে?’ এই প্রশ্নের উত্তর এখনও অস্পষ্ট। বরং বিষয়টি আরও জটিল হয়ে উঠেছে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের আলোকে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি উপস্থাপন করেছেন একটি ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনা, যা গাজার ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থার জন্য এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। ট্রাম্পের প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় গাজা পরিচালনার জন্য একটি দ্বি-স্তরীয় শাসন কাঠামো প্রস্তাব করা হয়েছে। নিচের স্তরে থাকবে একটি প্রশাসনিক কমিটি, যা গাজার দৈনন্দিন প্রশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুনর্গঠন পরিচালনা করবে। ওপরের স্তরে থাকবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের একটি ‘বোর্ড অব পিস’, যা গাজার অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও নীতিনির্ধারণে সিদ্ধান্ত নেবে এবং প্রশাসনিক কমিটিকে তদারকি করবে।
এই বোর্ডের নেতৃত্বে থাকতে পারেন ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে ও সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার। পরিকল্পনায় ‘আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী’ (আইএসএফ) গঠনের কথাও আছে, যা গাজার নিরাপত্তা রক্ষা, হামাসের অস্ত্র ধ্বংস এবং নতুন ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনী গঠনের দায়িত্ব পালন করবে। পরিকল্পনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, হামাসকে কোনোভাবেই সরাসরি বা পরোক্ষভাবে শাসনে অংশ নিতে দেওয়া হবে না। গাজার পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন রাস্তাঘাট, হাসপাতাল, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ পুনর্স্থাপন এই পরিকল্পনার মূল অঙ্গ।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভবিষ্যতে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ কিছু নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে গাজার শাসন তাদের হাতে স্থানান্তর হতে পারে। তবে এটি কীভাবে হবে, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট সময়সীমা বা কাঠামো দেওয়া হয়নি। আরও অস্পষ্ট রয়েছে কিছু মূল প্রশ্ন : কীভাবে বাহিনী প্রেরণ হবে, আন্তর্জাতিক মনিটরিং ব্যবস্থা কী হবে, আর গাজার পুনর্গঠনে অর্থ আসবে কোথা থেকে এসব বিষয়ে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা এখনও প্রকাশ পায়নি।
গাজার শাসনকে সম্পূর্ণভাবে ফিলিস্তিনিদের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে দাবি করেছে হামাস, ইসলামিক জিহাদ ও পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অব প্যালেস্টাইন। তাদের বক্তব্য, বিদেশি তত্ত্বাবধান বা ‘বোর্ড অব পিস’Ñ ধাঁচের কোনো শাসন কাঠামো তারা মেনে নেবে না।
অন্যদিকে ইসরায়েল এখনও ট্রাম্পের পরিকল্পনায় আনুষ্ঠানিক সমর্থন জানায়নি, তবে ‘আলোচনায় অংশ নেওয়ার’ ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। তাদের শর্ত হামাসকে পুরোপুরি নিরস্ত্রীকরণ করতে হবে এবং ভবিষ্যতে তারা কোনোভাবেই রাজনৈতিক ক্ষমতায় ফিরতে পারবে না। মিসর, কাতার ও সৌদি আরব গাজার পুনর্গঠনে অর্থনৈতিক সহায়তার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। কিন্তু সরাসরি বিদেশি শাসন বা বোর্ড-নিয়ন্ত্রিত প্রশাসনের পক্ষে নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, হামাস পরিকল্পনাটি প্রত্যাখ্যান করলে বা ইসরায়েল শর্ত মানতে না চাইলে যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্বই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ পরিকল্পনাটিকে ‘বাজারে থাকা সর্বোচ্চ বিকল্প’ বলে আখ্যা দিয়েছেন, যদিও তিনি বলেছেন, এতে ‘প্যালেস্টিনি রাষ্ট্র’ বিষয়টি যথেষ্ট অস্পষ্টভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।
সোমবার মিসরের শর্ম এল-শেইখে অনুষ্ঠিত হয় গাজা শান্তি শীর্ষ সম্মেলন। এতে অংশ নেন ট্রাম্প, মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি, টনি ব্লেয়ার ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক নেতা।
এখানেই ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ মডেল নিয়ে মূল আলোচনা হয়। গাজা এখন এক সংকটময় মোড়ে দাঁড়িয়ে, একদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের ঘরে ফেরা, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা নিয়ে তীব্র আন্তর্জাতিক দরকষাকষি। ফিলিস্তিনিরা চান তাদের নিজস্ব শাসন কিন্তু অনেক দেশ গাজার স্থিতিশীলতার জন্য আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানের পক্ষে। এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির সংঘর্ষই নির্ধারণ করবে : গাজা কি সত্যিই শান্তির পথে ফিরবে, নাকি আবারও অজানা এক অনিশ্চয়তার দিকে যাবে?
৭ অক্টোবর ২০২৩ হামাস ও অন্যান্য ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বড় আকারের হামলা চালায়। এর জবাবে ইসরায়েল গাজায় ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে, যা প্রায় দুই বছর ধরে চলে। হা্জার হাজার নাগরিক নিহত হয়, অবকাঠামো ধ্বংস হয়, হাসপাতাল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, মিসর ও কাতার বারবার যুদ্ধবিরতির চেষ্টা করলেও তা সফল হয়নি।
২০২৪ সালের মার্চে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের রেজল্যুশন ২৭২৮ গৃহীত হয়, যেখানে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানানো হয়। এরপর ২০২৪ সালের জুনে রেজল্যুশন ২৭৩৫ পাস হয়, যা বন্দিবিনিময় ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতির জন্য কাঠামো নির্ধারণ করে।
যুদ্ধবিরতির পর হামাস গাজার বিভিন্ন অংশে সশস্ত্র যোদ্ধা ও পুলিশ মোতায়েন করছে আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার নামে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন, একটি সীমিত সময়ের জন্য হামাসকে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে গাজার অভ্যন্তরে আবারও দেখা দিয়েছে সংঘর্ষ। বিশেষ করে ডঘমুশ ক্ল্যাঁ-এর সঙ্গে হামাসের লড়াইয়ে একাধিক ব্যক্তি নিহত হয়েছে। হামাস বলছে, এই ক্ল্যাঁ ইসরায়েলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিল এবং গাজার স্থিতিশীলতা ব্যাহত করছিল।
গাজার অবকাঠামো ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত-বাড়িঘর, হাসপাতাল, সড়ক, বিদ্যুৎ ও পানীয় জলের লাইন প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সাহায্য ও অর্থায়ন ছাড়া পুনর্গঠন সম্ভব নয়। জাতিসংঘ জানায়, তারা আগামী ৬০ দিনের মধ্যে গাজায় বিপুল পরিমাণ খাদ্য, চিকিৎসা ও নগদ সহায়তা পৌঁছানোর পরিকল্পনা করেছে। তবুও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, পুনর্নির্মাণের অর্থায়ন, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা সবই এখনও অনিশ্চিত।
যুদ্ধবিরতি কতটা স্থায়ী হবে? হামাস নিরস্ত্রীকরণ সম্ভব কি? আন্তর্জাতিক বোর্ড গঠনে জাতিসংঘ বা বড় শক্তিগুলোর ভূমিকা কী হবে? গাজার পুনর্গঠন ও অর্থায়নে কে নেতৃত্ব দেবে? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্Ñ গাজা কে চালাবে এখন?