× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

তৃতীয় পর্ব

তারেক রহমান যেভাবে নির্বাসিত হয়েছিলেন

জিবলু রহমান

প্রকাশ : ১৬ অক্টোবর ২০২৫ ১১:৫০ এএম

তারেক রহমান যেভাবে নির্বাসিত হয়েছিলেন

গ্রেপ্তারের আগে তিনি প্রতিদিনের মতো এশার নামাজ শেষে পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত করছিলেন। পাশে ছিলেন স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও একমাত্র সন্তান জাইমা রহমান। পাশের রুমে ছিলেন মা খালেদা জিয়া। অন্য রুমে ছিলেন ছোট ভাই মরহুম আরাফাত রহমান, তার স্ত্রী ও সন্তান। পুলিশের দু কর্মকর্তা এসে তারেককে গ্রেপ্তারের কথা জানান। মা খালেদা জিয়া এবং স্ত্রী-কন্যা ও ভাই আরাফাতের কাছ থেকে পুলিশ নিয়ে যায় তারেক রহমানকে। হাসিমুখে তারেক গ্রেপ্তার বরণ করে নেন। এর আগে তিনি দুজন সিনিয়র সাংবাদিক ও দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলেন। তারেক তাদেরকে জানান যে, ‘রাজনীতি করা ছাড়া আমি কোনো অপরাধ করিনি। ইনশাআল্লাহ কেউ আমার ক্ষতি করতে পারবে না। আপনারা আমার জন্য দোয়া করবেন।’

ক্যান্টনমেন্ট থানা থেকে পরদিন ৮ মার্চ রাত ১০টায় তারেককে কড়া পুলিশ প্রহরায় র‌্যাবের জ্যাকেট ও হেলমেট পরিয়ে আদালতে হাজির করা হয়। গ্রেপ্তারের ১৬ ঘণ্টা পর গুলশান থানায় এক কোটি টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ এনে ব্যবসায়ী আমিন আহমেদ চৌধুরীর দায়ের করা ৩৪ (৪) নম্বর মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুরের আবেদন করে। গ্রেপ্তারের সময় তারেক শারীরিকভাবে সুস্থ ও সবল ছিলেন। গ্রেপ্তারের পর বিশেষ উদ্দেশ্যে দায়ের করা এ মামলায় রিমান্ড মঞ্জুর না করে তাকে মুক্তি দেওয়ার জন্য শত শত আইনজীবী জোরালো প্রার্থনা জানান। আইনজীবীদের আবেদন প্রত্যাখ্যান করে আদালত প্রথম দফায় ৪ দিনের পুলিশ রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড মঞ্জুরের পর তারেককে পুলিশের হেফাজতে না নিয়ে অজ্ঞাত স্থানে অজ্ঞাত লোকদের হেফাজতে নিয়ে চোখ বেঁধে বর্বরোচিত কায়দায় তাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। প্রথম দফা চারদিন রিমান্ড শেষে ১২ মার্চ তারেককে জেলহাজতে পাঠানো হয়। পর্যায়ক্রমে তারেকের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের পাশাপাশি ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে ডিটেনশনও দেওয়া হয়। পরে হাইকোর্ট এ ডিটেনশন আদেশ অবৈধ ঘোষণা করেন।

২০০৭ সালের ৮ মার্চ কাফরুল থানায় জরুরি বিধি ভঙ্গের অভিযোগ এনে মামলা করা হয়। মীর আকতার হোসেন লিমিটেডের এমডি মীর জাহির হোসেন ৫৩ লাখ টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের বিরুদ্ধে ধানমন্ডি থানায় একটি মামলা করেন। এ মামলার এজাহারে তারেকের নাম অন্তর্ভুক্ত না থাকলেও পরে তাকে এতে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। কাফরুল থানায় দ্রুত বিচার আইনের অধীনে ২০০৭-এর ১৭ এপ্রিল যে মামলাটি হয়, তাতে তারেককে ফাঁসাতে মরিয়া ফখরুদ্দীন সরকার দুদিনের ব্যবধানে দুবার আইনের সংশোধন করেছিল। কিন্তু হাইকোর্ট তা আমলে নেননি। পলাতক শেখ হাসিনা সরকার তাদের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়ের করা প্রায় দেড় হাজার মামলা তুলে নিয়েছিল। বিএনপি নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে মামলাগুলো একচোখা সরকারের দৃষ্টিতে পড়েনি। তারেকের বিরুদ্ধে স্থগিত একটি মামলা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছিলেন তৎকালীন আইন প্রতিমন্ত্রী। আবার তা পুষিয়ে দিতে মানি লন্ডারিংয়ের একটি মামলায় তারেককে জড়ানো হয়। অথচ সেখানেও তিনি মূল আসামি নন।

২০০৭ সালের ৯ এপ্রিল শাহবাগ থানায় গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ ১৪ (৪) নম্বর মামলাটি দায়ের করা হয়। এ মামলায়ও তারেকের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল না। পরে এ মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ২০০৭ সালের ৩ জুন খালেদা জিয়া ও তারেকের বিরুদ্ধে জিয়াউর রহমান এতিমখানার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে তেজগাঁও থানায় মামলা দায়ের করা হয়। ২০০৭ সালের ৪ আগস্ট জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ২৬ লাখ টাকা আয়কর ফাঁকির অভিযোগ এনে তারেকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। 

২০০৭ সালের ১৯ নভেম্বর গুলশান থানায় মার্শাল ডিস্টিলারিজের এমডি হারুন ফেরদৌস বাদী হয়ে ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দিন আল মামুনসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে ৮১ লাখ টাকার চাঁদাবাজির অভিযোগ এনে ১০২ (৩) নম্বর মামলাটি দায়ের করেন। এ মামলার এজাহারে তারেকের নাম অন্তর্ভুক্ত না থাকলেও পরবর্তী সময়ে তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। একই দিনে তারেক রহমানকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করে এ মামলায় ২ দিনের রিমাণ্ডে নেওয়া হয়।

২০০৭ সালের ২৬ নভেম্বর এসিএল ও আরসিএলের প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর সৈয়দ আবু সাহেদ সোহেল গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের বিরুদ্ধে গুলশান থানায় ১৩ (৫) নম্বর মামলাটি দায়ের করেন। এ মামলার এজাহারে তারেক রহমানের নাম উল্লেখ না থাকলেও তাকে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হয়। একই দিনে তারেককে এ মামলায় ৩ দিনের রিমাণ্ডে নেওয়া হয়।

২০০৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর রিমাণ্ডে থাকাকালে তারেকের ওপর নানা রকমের দৈহিক নির্যাতন করা হয়। এর মধ্যে একটি ছিল অনেক ওপর থেকে বারবার ফেলে দেওয়া। অসহ্য যন্ত্রণায় তিনি কুঁকড়ে ওঠেন। কিন্তু নির্যাতনকারী অফিসারদের বিন্দুমাত্র মায়া-দয়া হয়নি। ওদের দায়িত্ব ছিল তারেককে কষ্ট দিয়ে মেরে ফেলা। তারপর থেকে দীর্ঘ সময় তারেক কারাগারে। কোনো ডাক্তার নেই। চিকিৎসা হয়নি। প্রতিটি দিন কেটেছে নারকীয় যন্ত্রণায়। একজন রাজনীতিকের বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে, গ্রেপ্তার চলতে পারে। কিন্তু নির্যাতন করার, শরীরের অঙ্গ বিকল করার, মানবাধিকার পদদলিত করার অধিকার সভ্যতার কোথায় আছে? 

২০০৮ সালের ১ জানুয়ারি দুর্নীতি দমন কমিশন তারেক ও তার স্ত্রী এবং শাশুড়ির বিরুদ্ধে সম্পদের হিসাব গোপন করার অভিযোগ এনে ৫২ (৯) নম্বর মামলাটি দায়ের করে। এক মাস বিরতির পর একই দিনে তারেককে আবারও আদালতে হাজির করে দুদকের দায়ের করা মামলায় ১ দিনের রিমাণ্ডে নেওয়া হয়। ২০০৮ সালের ৯ জানুয়ারি রেজা কনস্ট্রাকশনের এমডি খান আপ্তাবউদ্দিন আহমদ গিয়াস উদ্দিন আল মামুনসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে এক কোটি ৩২ লাখ টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করে। এ মামলায় তারেক রহমানের নাম অন্তর্ভুক্ত না থাকলেও পরে তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। 

৪ দফায় ১১ দিন রিমান্ড শেষে আবারও রিমাণ্ডে নেওয়ার আবেদন জানিয়ে পুলিশ তারেক রহমানকে ৯ জানুয়ারি ২০০৮ ঢাকার ১ নম্বর অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম এহসানুল হকের আদালতে হাজির করে। মেসার্স রেজা কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খান আপ্তাবউদ্দিন আহমদ ব্যবসায়ী গিয়াসউদ্দিন আল মামুনসহ ৭ জনকে আসামি করে ২০ লাখ টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করেন। এ মামলার এজাহারে তারেকের নাম নেই। পুলিশের বক্তব্য হচ্ছে প্রধান আসামি মামুন জিজ্ঞাসাবাদে চাঁদাবাজির টাকার কিছু অংশ তারেকের এপিএস অপুকে দিয়েছে বলে আদালতে বক্তব্য দিয়েছেন। অপু টাকা নিয়ে তারেককে দিয়েছেন কি না তা জানার জন্য তারেককে রিমাণ্ডে নেওয়া প্রয়োজন। 

এ মামলায় রিমাণ্ডে নেওয়ার আগে তারেক সরকারের হেফাজতে থেকে গুরুত্বর অসুস্থ হয়ে পড়েন। এর আগ পর্যন্ত আদালতে তিনি কোনো কথা বলেননি। ওইদিন আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বিচারকের অনুমতি নিয়ে তিনি তার ওপর অমানবিক নির্যাতনের বিবরণ তুলে ধরে বক্তব্য দেন। তিনি আদালতের কাছে তার জীবন ভিক্ষা চেয়ে বলেনÑ‘আবার রিমাণ্ডে নিলে আমি আর বাঁচব না। আমি রিমাণ্ডে শারীরিকভাবে এতটাই নির্যাতনের শিকার হয়েছি যে, এখন মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারছি না।’ 


জিবলু রহমান

কলাম লেখক ও গবেষক


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা