শিক্ষক আন্দোলন
ড. আলা উদ্দিন
প্রকাশ : ১৬ অক্টোবর ২০২৫ ১১:৪৫ এএম
বাংলাদেশে শিক্ষকের পেশা আজ এক অনিশ্চিত পথের প্রতীক। রাস্তায় সমাবেশ, ন্যূনতম বেতন, বাড়িভাড়া বা অন্যান্য যৌক্তিক দাবিতে আন্দোলন করা শিক্ষকদের জন্য নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। শহীদ মিনার থেকে শাহবাগ পর্যন্ত, ঝড়বৃষ্টি বা তীব্র শীত উপেক্ষা করেও শিক্ষকরা ঘুরেফিরে একই দাবির পালে রঙ তুলতে চানÑ ন্যূনতম মানবিক অধিকার এবং প্রাপ্য মর্যাদা। কিন্তু সরকারি দপ্তর কিংবা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় অনেক সময় এই আন্দোলনের প্রতি সাড়া দেয় না। শিক্ষকের দাবি শুনতে বা সমাধান করতে গিয়ে পুলিশ সচরাচর সাউন্ড গ্রেনেড, হাতকড়া ও গ্রেপ্তারের মতো কড়া পদক্ষেপে নামেন। বহু ক্ষেত্রেই সমাবেশ পণ্ড হয়ে যায়। এই চিত্র দেশজুড়ে মাসে মাসে বা বছরে বছরে পুনরাবৃত্তি পায়।
শিক্ষকরা সমাজের প্রাণকেন্দ্র। শিক্ষা যেন রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ, কিন্তু বাস্তবে শিক্ষকের মর্যাদা ও নিরাপত্তা রাষ্ট্রের নজরে প্রায়ই অদৃশ্য। আন্দোলনের জন্য রাস্তায় নামলেই যেন অপরাধী হিসেবে গণ্য করা হয়। অতীতে কথা বলার অধিকার ব্যবহার করায় অনেক শিক্ষার্থী লাঞ্ছিত হয়েছেন, চাকরিচ্যুত হয়েছেন, নির্যাতিত হয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে এমন ঘটনা আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছেÑ অনেক শিক্ষক জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য হয়েছেন, আবার অনেককে মারধরও করা হয়েছে। সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হলো, এসব ঘটনার সাক্ষী হয়ে শিক্ষার্থীরাও অনেক সময় এতে অংশগ্রহণ করেছেন, যা সমাজের শিষ্টাচার ও শিক্ষার নৈতিক দিককে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
শিক্ষকের পেশায় ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা থাকতেই পারে। কেউ হয়তো দায়িত্বে অবহেলা করেন, কেউ হয়তো যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ করতে পারছেন না। কিন্তু মূল সমস্যা হলোÑ বেতন, সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তার এমন অপ্রতুলতা, যা স্বাভাবিক জীবনের অধিকার হিসেবেই গণ্য করা হয়। বর্তমান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রাপ্ত সুযোগ যেন ভিক্ষার সংস্করণ। ফলে যোগ্য ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও এই পেশাকে অগ্রাধিকার দেন না। রাজনৈতিক সংযোগ বা আর্থিক লেনদেনের অভাবে অনেকেই যোগ্য শিক্ষক হওয়ার সুযোগ হারান।
শিক্ষকের প্রাপ্য মর্যাদা, বেতন, গবেষণা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার অভাব শিক্ষার সার্বিক মানকে হুমকির মুখে ফেলে। সরকারের দৃষ্টি প্রায়শই অবকাঠামোগত উন্নয়ন (রাস্তা, ভবন), বিদেশভ্রমণ, উৎসব বা রাজনৈতিক কাজে সীমাবদ্ধ থাকে; শিক্ষক ও শিক্ষা বিভাগের বিষয়গুলো নিত্যনৈমিত্তিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার তালিকায় ন্যূনতম স্থান পায়। ফলে শিক্ষার মেরুদণ্ড দুর্বল হয় এবং জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকারে প্রবাহিত হয়। পুলিশ, আমলা বা সামরিক বাহিনীর সামাজিক ও আর্থিক গুরুত্ব তুলনামূলকভাবে বেশি থাকলেও শিক্ষকের অবস্থা সেই তুলনায় অবহেলিত। জাতির ভাগ্যও তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিবর্তিত হয় না।
শিক্ষক যেন দেশের মেরুদণ্ড। মেরুদণ্ডকে শক্তিশালী না করে দুর্বল বা ভাঙা অবস্থায় রাখা মানে জাতির ভিত্তি দুর্বল করা। জাতির প্রতিটি সন্তান শিক্ষকের হাতে শিক্ষার আলো পায়, কিন্তু যখন শিক্ষকই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন, তখন জাতির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। সরকার ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিক্ষকদের দাবিকে উপেক্ষা করা বা সমাবেশে পুলিশি হস্তক্ষেপ তা প্রমাণ করে। এটি শুধু শিক্ষকের মর্যাদা নয়, পুরো জাতির নৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তিকেও আঘাত হানছে।
অবচেতন সমাজের জন্য এই বাস্তবতা অনেক সময় স্বাভাবিক মনে হয়। শিক্ষকবৃন্দের আন্দোলনকে অনেকে রাজনৈতিক বা অপ্রয়োজনীয় হিসেবে দেখেন, অথচ বাস্তব চিত্র তা নয়। একটি দেশের শিক্ষকের ন্যূনতম প্রাপ্যতা নিশ্চিত না করলে শিক্ষার মান, ছাত্রছাত্রীদের শিখন পরিবেশ, গবেষণার গুণগতমান এবং সমাজে নৈতিকতা ও জবাবদিহিতার স্তরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটি একটি যৌক্তিক দাবি নয়, মানবিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব।
শিক্ষকের ওপর যে ধরনের পুলিশের হস্তক্ষেপ হয়, তা শুধু চলমান সমস্যার প্রতিফলন নয়, বরং রাষ্ট্রের দৃষ্টি ও নীতি-দ্বন্দ্বেরও প্রতিফলন। সমাবেশে পুলিশি হস্তক্ষেপ, সাউন্ড গ্রেনেড, হাতকড়াÑ এই সবকিছু দেখিয়ে দেয়, রাষ্ট্র শিক্ষকের দাবিকে অপরাধের সঙ্গে তুলনা করতে প্রস্তুত। এটি শিক্ষার প্রতি রাষ্ট্রের অপ্রতুল মনোযোগ এবং নৈতিক দায়বদ্ধতার অভাবের ফল।
অভিজ্ঞ শিক্ষক ও বিশ্লেষকরা বলছেন, শিক্ষক আন্দোলন শুধু অর্থনৈতিক দাবি নয়; এটি শিক্ষাব্যবস্থার সার্বিক অবস্থা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পর্ক এবং সমাজের শিক্ষার মূল্যমানের প্রতিবিম্ব। শিক্ষক যেকোনো সমাজের নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামোর ভিত্তি, তার অবহেলা ভবিষ্যতে দেশের মানবসম্পদকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
শিক্ষক আন্দোলনের পেছনের যৌক্তিকতার এক গুরুত্বপূর্ণ দিক হলোÑ শিক্ষার উন্নয়ন এবং মানসম্মত শিক্ষার নিশ্চয়তা। ন্যূনতম বেতন, উপযুক্ত সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তা ছাড়া শিক্ষকের মনোবল নষ্ট হয়, শিক্ষার্থীর শিক্ষা পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিক্ষক যাতে কেবল বিদ্যাকে প্রাধান্য দিতে পারেন এবং সমাজের নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়নে অবদান রাখতে পারেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
রাজনৈতিক প্রভাব ও আর্থিক সুবিধার অভাবে যোগ্য শিক্ষক পদে আসতে পারছে নাÑ এই সত্য শিক্ষক পেশার দুর্বলতার অন্যতম কারণ। সমাজে শিক্ষকের মর্যাদা বৃদ্ধি না হলে মেধাবী তরুণ প্রজন্ম শিক্ষকের দিকে ঝুঁকবে না। ফলে শিক্ষার মান স্থিতিশীল থাকবে না, সমাজের জ্ঞানভিত্তিক কাঠামো দুর্বল হবে।
শিক্ষকের মর্যাদা ও ন্যূনতম প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের প্রাথমিক দায়িত্ব। এটি শুধু শিক্ষকের অধিকার নয়, জাতিরও অধিকার। একটি জাতি যদি তার শিক্ষকের নিরাপত্তা, বেতন ও মর্যাদাকে হেনস্থা করে দেখায়, তাহলে জাতির মেরুদণ্ড দুর্বল হবে। দুর্বল মেরুদণ্ডের ওপর সমৃদ্ধ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
সমাবেশে পুলিশি হস্তক্ষেপ শিক্ষকদের নৈতিক ও সামাজিক মর্যাদাকে হ্রাস করে। এটি শিক্ষার্থীদের জন্যও ভয়ংকর বার্তা দেয়Ñ শিক্ষকবৃন্দের নিরাপত্তা এবং দাবির স্বীকৃতি রাষ্ট্রের কাছে কম গুরুত্বপূর্ণ। এই পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীরাও দ্বিধাগ্রস্ত হয়। শিক্ষক আন্দোলনের প্রতি সমাজের সমর্থন, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি না থাকলে শিক্ষার মান ও শিক্ষকের মর্যাদা উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
শিক্ষক আন্দোলন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিক্ষার মেরুদণ্ড শক্ত না হলে জাতির ভবিষ্যৎ স্থিতিশীল হবে না। শিক্ষক আন্দোলনের মাধ্যমে শুধু অর্থনৈতিক দাবি নয়, শিক্ষার মর্যাদা, নৈতিক উন্নয়ন, গবেষণা ও ছাত্র-ছাত্রীর সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি করা হয়। রাষ্ট্র যদি শিক্ষকের দাবিকে অপরাধের সঙ্গে তুলনা করে, তবে শিক্ষার গুণগত মানের অবনতি অনিবার্য।
শিক্ষক আন্দোলন ও পুলিশি হস্তক্ষেপের এই পুনরাবৃত্তি একটি গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকেত দেয়। রাষ্ট্র শিক্ষকের ন্যূনতম অধিকার, বেতন ও নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেয়নি। শিক্ষার প্রতি রাষ্ট্রের এই অগ্রাহ্য মনোভাব জাতির মেরুদণ্ড দুর্বল করেছে। শিক্ষক আন্দোলন শুধু ন্যায্য দাবি নয়, এটি দেশের জ্ঞান, নৈতিকতা ও সাংস্কৃতিক মানের প্রতিফলন।
যখন শিক্ষকরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে ন্যূনতম অধিকার দাবি করেন, তারা কেবল নিজেদের জন্য নয়, দেশের ভবিষ্যতের জন্য লড়াই করেন। রাষ্ট্র যদি এই আন্দোলনকে অপরাধের মতো মোকাবিলা করে, তবে শিক্ষার মূল্য, শিক্ষার্থীর অধিকার এবং জাতির মানসিক ও নৈতিক ভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিক্ষকের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব।
অতএব, শিক্ষকের হাতকড়া এবং সমাবেশে পুলিশের হস্তক্ষেপ যেন বাংলাদেশের শিক্ষার গভীর সংকটের প্রতিফলন। শিক্ষকের মর্যাদা ও ন্যূনতম অধিকার নিশ্চিত না করলে জাতির মেরুদণ্ড দুর্বল থাকবে। শিক্ষা বিভাগের প্রতি সরকারের মনোযোগ বাড়ানো, শিক্ষকের সম্মানজনক বেতন (স্বতন্ত্র হলে সবচেয়ে ভালো) ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক চাপের বাইরে শিক্ষাকে সুনিশ্চিত করা ছাড়া দেশের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। এটি শুধু শিক্ষকের সমস্যা নয়, এটি জাতির শিক্ষা, নৈতিকতা এবং উন্নয়ন সংক্রান্ত গুরুতর সংকট।
শিক্ষকের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং সমাবেশে হামলার শাস্তি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। শিক্ষকের দাবি স্বীকৃতি পেলে শিক্ষার মান বৃদ্ধি পাবে, শিক্ষার্থীর শিক্ষা পরিবেশ উন্নত হবে এবং সমাজের নৈতিক কাঠামো শক্তিশালী হবে। শিক্ষার মেরুদণ্ডকে শক্তিশালী না করলে জাতির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত এবং দুর্বল থেকে যাবে।
শিক্ষকের প্রতি সামাজিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সম্মান নিশ্চিত করা, সম্মানজনক বেতন ও সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা এবং শিক্ষার মান বাড়ানোর পদক্ষেপ অবিলম্বে নেওয়া ছাড়া বাংলাদেশের শিক্ষার উন্নতি সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের উচিত শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষা করা, যাতে শিক্ষার মাধ্যমে জাতির মেরুদণ্ড শক্তিশালী হয় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সুস্থ ও সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠে।
ড. আলা উদ্দিন
অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়