× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

নিরাপত্তাহীন শিল্প খাত

আর কত প্রাণ কাড়বে অবহেলার আগুন

সম্পাদকীয়

প্রকাশ : ১৬ অক্টোবর ২০২৫ ১১:৪১ এএম

আর কত প্রাণ কাড়বে অবহেলার আগুন

রাজধানীর মিরপুরের রূপনগরে একটি পোশাক কারখানা ও রাসায়নিকের গুদামে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মুহূর্তের মধ্যে নিভে গেল কয়েকটি তাজা প্রাণ। ভস্মীভূত হলো শ্রমিকদের স্বপ্ন। খোঁজ মিলছে না কারও কারওÑ দাবি পরিবারের। জানা গেছে, ১৪ অক্টোবর, মঙ্গলবার দুপুরে রূপনগরে একটি কেমিক্যাল গোডাউনে বিস্ফোরণে লাগা আগুন পাশের একটি বস্ত্র ওয়াশিং কারখানায় ছড়িয়ে পড়ে। এতে ১৬ জন কর্মী পুড়ে অঙ্গার হয়ে মারা যান। দগ্ধ আরও বেশ কয়েকজনকে বার্ন ইউনিটসহ বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আগুন নেভাতে ফায়ার সার্ভিসের ১২টি ইউনিট কাজ করে। আগুন লাগার কারণ এবং হতাহতের সংখ্যা নিয়ে তদন্ত চলছে।

এই দুর্ঘটনা কেবল একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ট্র্যাজেডি নয়, বরং আমাদের শিল্প নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভয়াবহ দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি। এতে দেশের শিল্প নিরাপত্তা, বিশেষ করে রাসায়নিক গুদাম এবং পোশাক কারখানার মতো ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে অগ্নিনির্বাপণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বকে আবারও সামনে এনেছে। এই ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা প্রাণপণ চেষ্টা করেও সবাইকে বাঁচাতে পারেননি। যাদের দেহ উদ্ধার হলো, তারা যেন আগুনে নয়, অবহেলায় পুড়ে গেছেন। আমরা বলতে চাই, বেদনাদায়ক ও হৃদয়বিদারক এই মৃত্যুর দায় কেবল আগুনের নয়, এটা আমাদের অবহেলা এবং দায়িত্বহীনতারও। অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ বিভিন্ন মহল। 

১৫ অক্টোবর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘ওয়াশিং প্ল্যান্টে আগুন : বহু প্রাণহানি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই ভয়াবহ চিত্র। তবে অগ্নিকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্য দিতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস। প্রাথমিক তদন্তে তারা বলছে, কারখানা ও গুদামে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না। এমনকি পোশাক কারখানার ছাদে যাওয়ার দরজায় দুটি তালা লাগানো ছিল। এত বেশি প্রাণহানির বিষয়ে সার্ভিসের ধারণা, কারখানার পাশে থাকা রাসায়নিকের গুদামে বিস্ফোরণের পর সেখান থেকে বিষাক্ত ধোঁয়া বা টক্সিক গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে, যা মূলত প্রাণঘাতী। 

উল্লেখ করা প্রয়োজন, দেশে কেমিক্যাল গোডাউনে আগুনের এমন ট্র্যাজেডির ঘটনা একটি-দুটি নয়, অনেক। ২০১০ সালে নিমতলীতে রাসায়নিক গুদাম থেকে ছড়িয়ে পড়া আগুনে পুড়ে মারা যায় ১২৪ জন। ২০১৯ সালে পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টায় কেমিক্যাল গোডাউনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৭১ জনের মৃত্যু হয়। সর্বশেষ মঙ্গলবার রাজধানীর মিরপুরে এই বিপর্যয়ের ঘটনা। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এত প্রাণহানির পরও এই বিপদের কবল থেকে মুক্তি মেলেনি রাজধানীবাসীর। ঘটনায় আবারও আলোচনায় এলো, জনবহুল এলাকায় অনিরাপদ ও অবৈধভাবে গড়ে তোলা কেমিক্যাল গোডাউনগুলো অপসারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সীমাহীন উদাসীনতার বিষয়টি। 

বাংলাদেশে তৈরি পোশাক ও ওয়াশিং শিল্প অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু এই শিল্পের অবকাঠামো ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখনও অনেক জায়গায় বেশ নাজুক। বহু কারখানায় অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই, জরুরি বহির্গমন পথ বন্ধ থাকে। বহু কারখানায় শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তা সরঞ্জামও থাকে না। রূপনগরের এই অগ্নিকাণ্ড সেই পুরনো ব্যর্থতার আরেকটি উদাহরণ। এভাবে প্রতিবছর অগ্নিকাণ্ডে অসংখ্য শ্রমিকের প্রাণহানি ঘটলেও এর পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় না।

বরাবরই দেখা গেছে, এ ধরনের দুর্ঘটনার পর সাধারণত তদন্ত কমিটি গঠন হয়, কিছু শোকবার্তা আসে, ক্ষতিপূরণের ঘোষণা দেওয়া হয় কিন্তু মূল কারণগুলো অনুদঘাটিতই থেকে যায়। শিল্প মন্ত্রণালয়, শ্রম অধিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিসের সমন্বিত তদারকি উপেক্ষিত থাকায় এসব দুর্ঘটনা প্রতিরোধ সম্ভব হচ্ছে না। অপরদিকে, মালিকপক্ষও অনেক সময় খরচ বাঁচাতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা অগ্রাহ্য করে। ফলে কর্মীদের জীবন ঝুঁকির মুখে থাকে প্রতিনিয়ত। সরকারের উচিতÑ এখনই শিল্প নিরাপত্তা সংক্রান্ত নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা। পাশাপাশি প্রতিটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত অগ্নিনিরাপত্তা মহড়া, অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রের পর্যাপ্ত সরঞ্জাম, জরুরি বের হওয়ার পথ এবং প্রশিক্ষিত নিরাপত্তাকর্মী থাকা বাধ্যতামূলক করা। একই সঙ্গে দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে, যেন কেউ আর এ ধরনের অবহেলার সাহস না পায়। আসলে প্রতিটি দুর্ঘটনার পরই তোলপাড় হয়, আমাদের আবেগ উথলে ওঠে। আমরা শোক জানাই, তদন্ত কমিটিও গঠন করি। কিন্তু তারপর? আবারও একই অবহেলা, একই অনিয়ম। তাই প্রশ্ন উঠছে, আর কত জীবন গেলে আমরা শিক্ষা নেব। আর কত প্রাণ কাড়বে অবহেলার আগুন।

এই আগুন আমাদের বিবেককে জাগিয়ে তুলুক। প্রতিটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা হোক বাধ্যতামূলক, কর্মজীবী মানুষের প্রাণ হোক সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। যারা দায়ী, তারা যত প্রভাবশালীই হোক তাদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। আমরা মনে করি, রূপনগরের সেই আগুন শুধু একটি কারখানা পোড়ায়নি, পুড়িয়েছে আমাদের মানবিকতার মুখ। এখন সময় এসেছে সেই অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরানোর, যাতে আর কাজ করতে আসা কোনো মানুষ তার কর্মস্থলে আগুনের ভেতরে আটকে না থাকে, আর কোনো মা সন্তানের লাশ খুঁজে না ফেরে। ভুলে গেলে চলবে না, ঘটনাটি নিরাপত্তাহীন শিল্প খাতের মর্মান্তিক চিত্র। এ ঘটনার গভীর তদন্ত, দায়ীদের বিচার এবং শিল্প খাতে নিরাপত্তা নিশ্চিত এখন সময়ের দাবি।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা