× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

দ্বিতীয় পর্ব

তারেক রহমান যেভাবে নির্বাসিত হয়েছিলেন

জিবলু রহমান, কলাম লেখক ও গবেষক

প্রকাশ : ১৫ অক্টোবর ২০২৫ ১১:২০ এএম

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২৫ ১১:৫২ এএম

তারেক রহমান যেভাবে নির্বাসিত হয়েছিলেন

তারেক রহমান ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের সোজাসাপটা বলে দিয়েছেন, ‘ তোমরা প্রথমে পড়ালেখা করবে এরপর রাজনীতি। রাজনীতি করবে দেশ ও দেশের মানুষের জন্য। ছাত্রদলের কোনো নেতা-কর্মী টেন্ডারবাজিতে জড়াতে পারবে না, সচিবালয়ে যেতে পারবে না, অস্ত্র হাতে নিতে পারবে না।’ছাত্রদলের নেতারা তা-ই শুনেছেন। তারা টেন্ডারবাজিতে জড়াননি। সচিবালয়ে যাননি। বিএনপি পাঁচ বছর ক্ষমতায় ছিল কিন্তু তারেক একবারের জন্যও সচিবালয়ে যাননি। সরকারি কোনো কাজে হস্তক্ষেপ করেননি। পাঁচটি বছর তিনি ব্যস্ত ছিলেন দল গোছানোর কাজে এবং জনসেবায়।

প্রচণ্ড শীতে তারেক রহমান ছুটে গেছেন শীতার্তদের মাঝে। তাদের হাতে তুলে দিয়েছেন শীতবস্ত্র। অর্থাভাবে যে মেধাবী ছাত্রটির লেখাপড়া মাঝপথে বন্ধ হয়ে গেছে তারেক রহমান সে ছাত্রটিকে খুঁজে বের করে তার পড়ালেখার ভার গ্রহণ করেছেন। শহীদ জিয়ার মতো নিজ হাতে খাল কেটেছেন। কৃষকদের উন্নত বীজ দিয়ে সাহায্য করেছেন এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন। দেশের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত ঘুরে ঘুরে দরিদ্রদের স্বাবলম্বী করতে তাদের মাঝে বিতরণ করেছেন হাঁস-মুরগি, ছাগল, গাছের চারা, শস্যবীজ ইত্যাদি। এসব করেছেন জিয়াউর রহমান ফাউণ্ডেশনের উদ্যোগে। পাশাপাশি তিনি দুর্নীতি, বাল্যবিবাহ, যৌতুক, সন্ত্রাস, মাদকাসক্তির বিরুদ্ধে সভা-সমাবেশ করে দলের নেতা-কর্মী ও জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেছেন।

কী অপরাধ তারেকের? তারেক এদেশ ও দেশের মানুষকে ভালোবাসেনÑ এটাই কি তার অপরাধ? তিনি বিএনপিকে একটি শক্তিশালী দলে পরিণত করেছেনÑ এটাই কি তার দোষ? ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছেন তিনি। অনেক রাজনৈতিক ঘটনাবলির প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে সঞ্চয় করেছেন অসামান্য অভিজ্ঞতা। 

২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপিকে ক্ষমতায় আনার পেছনের কারিগর তারেকÑ তাই কি এতসব ষড়যন্ত্র? ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে ক্ষমতায় গিয়ে আওয়ামী লীগ পরবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতা দখলের সব ধরনের আয়োজন পাকাপোক্ত করে রাখে। কিন্তু তারেকের পলিসির কাছে পরাস্ত হয় তারা। এর ফলে ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট দু-তৃতীয়াংশেরও বেশি আসনে বিজয়ী হয়। এরপর থেকে শুরু হয় তারেকের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণা। পরবর্তীতে তারেক দেশব্যাপী বিএনপি ও ছাত্রদলের তৃণমূল প্রতিনিধি সভার আয়োজনসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে বিএনপিকে অত্যন্ত শক্তিশালী দলে পরিণত করলে শুরু হয় নানামুখী চক্রান্ত। বিএনপির বিরোধী পক্ষ এবং কয়েকটি চিহ্নিত প্রিন্ট মিডিয়া তারেকের বিরুদ্ধে বিষোদগার শুরু করে। তারেক রহমান তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের ব্যাপারে তথ্য-প্রমাণ হাজির করার আহ্বান জানান। কেউ তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি। এরপরও মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে গেলে তিনি আইনের আশ্রয় নেন। বিষোদগারকারীদের নামে উকিল নোটিস পাঠান। এরপর কিছুদিন চুপ থাকলেও ২০০৮ সালের ফখরুদ্দীনের তত্ত্বাবধায়কের সময়ে মহলটি আবারও সোচ্চার হয়ে ওঠে। তারেকের বিরুদ্ধে সমান তালে চালানো হয় প্রোপাগান্ডা। এ মিথ্যা প্রচারণার কাছে সত্য চাপা পড়ে যায়। গোটা জাতিকে অবাক করে দিয়ে গ্রেপ্তার করা হয় তারেক রহমানকে। শহীদ জিয়ার আমানত তারেককে গ্রেপ্তারের ফলে গোটা জাতির হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে।

২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ দিনে দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকার সঙ্গে একান্ত কথাবার্তায় তারেক বলেন,‘দেশের মানুষের জন্য রাজনীতি করি। এজন্য যদি জেলখানায় যেতে হয়, যাব।’

তিনি তার বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ সম্পর্কে খোলাখুলি কথা বলেন। ‘আমি শহীদ জিয়াউর রহমানের ছেলে। যারা বিএনপি তথা জাতীয়তাবাদী শক্তির বিরোধী, তারাই ওইসব অপপ্রচার করে। আপনি মন্ত্রী-সচিব যে কাউকে জিজ্ঞাসা করুন আমি কাউকে কোনো কাজের জন্য টেলিফোন করেছি কি না? কেউ বলতে পারবে না আমি করেছি। আমার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ ষড়যন্ত্রমূলক।’

বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন,‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমরা সবাই। দেশের মানুষও তাই চায়। কিন্তু যেখানে কেবল বিএনপির ওপর দুর্নীতির ঢালাও অভিযোগ এনে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে তা কোনোভাবে এদেশের শান্তিকামী মানুষ মেনে নেবে না। কারণ বিএনপি দেশের মানুষের প্রাণের দল। এই দলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে ষড়যন্ত্র হয়েছে। কিন্তু জনগণ তার জবাব দিয়েছে।’ (সূত্র: দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকা ৯ মার্চ ২০০৭)

ফখরুদ্দীন সরকারের আমলে তারেককে অচল করার ষড়যন্ত্রের বড় দুটি কারণ হলো : ২০০১ সালের নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের পেছনে বড়ো হেতু ছিল তারেকের সুসংগঠিত ব্যবস্থাপনা, দক্ষ নির্বাচনী প্রচারণা। দ্বিতীয়, জাতীয়তাবাদী শক্তির ভবিষ্যৎ কান্ডারি হিসেবে তার গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নাতীত হয়ে উঠেছিল।

২০০৭ সালের ৭ মার্চ বাংলাদেশের উদীয়মান নেতা তারেক রহমানকে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, এরেস্ট ওয়ারেন্ট না থাকার পরও গভীর রাতে গ্রেপ্তার করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। তারেক রহমানকে তার ক্যান্টনমেন্টস্থ মঈনুল রোডের বাসা থেকে রাত সোয়া ১টায় আটক করা হয়। তারেক রহমানকে কাফরুল থানার ওসির নেতৃত্বে গ্রেপ্তার করা হলেও তাকে প্রথমে ক্যান্টনমেন্ট থানায় নিয়ে রাখা হয়। গ্রেপ্তারের সময় তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দেশের কোথাও কোনো মামলা কিংবা সাধারণ ডায়েরি বা অন্য কোনো অভিযোগও ছিল না। গ্রেপ্তারের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তারেক রহমানের বাসায় গেলে প্রথমে তিনি তাদের কাছ থেকে কিছুটা সময় নিয়ে ওজু সেরে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে মহান আল্লাহর দরবারে বিশেষ মোনাজাত করেন। যাওয়ার সময় তিনি অন্যান্য বইপুস্তকের সঙ্গে পবিত্র কুরআন শরিফও নেন।

গ্রেপ্তারের আগে তিনি প্রতিদিনের মতো এশার নামাজ শেষে পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত করছিলেন। পাশে ছিলেন স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও একমাত্র সন্তান জাইমা রহমান। পাশের রুমে ছিলেন মা খালেদা জিয়া। অন্য রুমে ছিলেন ছোট ভাই মরহুম আরাফাত রহমান, তার স্ত্রী ও সন্তান। পুলিশের দু কর্মকর্তা এসে তারেককে গ্রেপ্তারের কথা জানান। মা খালেদা জিয়া এবং স্ত্রী-কন্যা ও ভাই আরাফাতের কাছ থেকে পুলিশ নিয়ে যায় তারেক রহমানকে। হাসিমুখে তারেক গ্রেপ্তার বরণ করে নেন। এর আগে তিনি দুজন সিনিয়র সাংবাদিক ও দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলেন। তারেক তাদেরকে জানান যে, ‘রাজনীতি করা ছাড়া আমি কোনো অপরাধ করিনি। ইনশাআল্লাহ কেউ আমার ক্ষতি করতে পারবে না। আপনারা আমার জন্য দোয়া করবেন।’

ক্যান্টনমেন্ট থানা থেকে পরদিন ৮ মার্চ রাত ১০টায় তারেককে কড়া পুলিশ প্রহরায় র‌্যাবের জ্যাকেট ও হেলমেট পরিয়ে আদালতে হাজির করা হয়। গ্রেপ্তারের ১৬ ঘণ্টা পর গুলশান থানায় এক কোটি টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ এনে ব্যবসায়ী আমিন আহমেদ চৌধুরীর দায়ের করা ৩৪ (৪) নম্বর মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুরের আবেদন করে। গ্রেপ্তারের সময় তারেক শারীরিকভাবে সুস্থ ও সবল ছিলেন। গ্রেপ্তারের পর বিশেষ উদ্দেশ্যে দায়ের করা এ মামলায় রিমান্ড মঞ্জুর না করে তাকে মুক্তি দেওয়ার জন্য শত শত আইনজীবী জোরালো প্রার্থনা জানান। আইনজীবীদের আবেদন প্রত্যাখ্যান করে আদালত প্রথম দফায় ৪ দিনের পুলিশ রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড মঞ্জুরের পর তারেককে পুলিশের হেফাজতে না নিয়ে অজ্ঞাত স্থানে অজ্ঞাত লোকদের হেফাজতে নিয়ে চোখ বেঁধে বর্বরোচিত কায়দায় তাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। প্রথম দফা চারদিন রিমান্ড শেষে ১২ মার্চ তারেককে জেলহাজতে পাঠানো হয়। পর্যায়ক্রমে তারেকের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের পাশাপাশি ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে ডিটেনশনও দেওয়া হয়। পরে হাইকোর্ট এ ডিটেনশন আদেশ অবৈধ ঘোষণা করেন।

২০০৭ সালের ৮ মার্চ কাফরুল থানায় জরুরি বিধি ভঙ্গের অভিযোগ এনে মামলা করা হয়। মীর আকতার হোসেন লিমিটেডের এমডি মীর জাহির হোসেন ৫৩ লাখ টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের বিরুদ্ধে ধানমন্ডি থানায় একটি মামলা করেন। এ মামলার এজাহারে তারেকের নাম অন্তর্ভুক্ত না থাকলেও পরে তাকে এতে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। কাফরুল থানায় দ্রুত বিচার আইনের অধীনে ২০০৭-এর ১৭ এপ্রিল যে মামলাটি হয়, তাতে তারেককে ফাঁসাতে মরিয়া ফখরুদ্দীন সরকার দুদিনের ব্যবধানে দুবার আইনের সংশোধন করেছিল। কিন্তু হাইকোর্ট তা আমলে নেননি। পলাতক শেখ হাসিনা সরকার তাদের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়ের করা প্রায় দেড় হাজার মামলা তুলে নিয়েছিল। বিএনপি নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে মামলাগুলো একচোখা সরকারের দৃষ্টিতে পড়েনি। তারেকের বিরুদ্ধে স্থগিত একটি মামলা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছিলেন তৎকালীন আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম। আবার তা পুষিয়ে দিতে মানি লন্ডারিংয়ের একটি মামলায় তারেককে জড়ানো হয়। অথচ সেখানেও তিনি মূল আসামি নন।

২০০৭ সালের ৯ এপ্রিল শাহবাগ থানায় গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ ১৪ (৪) নম্বর মামলাটি দায়ের করা হয়। এ মামলায়ও তারেকের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল না। পরে এ মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ২০০৭ সালের ৩ জুন খালেদা জিয়া ও তারেকের বিরুদ্ধে জিয়াউর রহমান এতিমখানার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে তেজগাঁও থানায় মামলা দায়ের করা হয়। ২০০৭ সালের ৪ আগস্ট জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ২৬ লাখ টাকা আয়কর ফাঁকির অভিযোগ এনে তারেকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। 

২০০৭ সালের ১৯ নভেম্বর গুলশান থানায় মার্শাল ডিস্টিলারিজের এমডি হারুন ফেরদৌস বাদী হয়ে ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দিন আল মামুনসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে ৮১ লাখ টাকার চাঁদাবাজির অভিযোগ এনে ১০২ (৩) নম্বর মামলাটি দায়ের করেন। এ মামলার এজাহারে তারেকের নাম অন্তর্ভুক্ত না থাকলেও পরবর্তী সময়ে তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। একই দিনে তারেক রহমানকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করে এ মামলায় ২ দিনের রিমাণ্ডে নেওয়া হয়।

২০০৭ সালের ২৬ নভেম্বর এসিএল ও আরসিএলের প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর সৈয়দ আবু সাহেদ সোহেল গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের বিরুদ্ধে গুলশান থানায় ১৩ (৫) নম্বর মামলাটি দায়ের করেন। এ মামলার এজাহারে তারেক রহমানের নাম উল্লেখ না থাকলেও তাকে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হয়। একই দিনে তারেককে এ মামলায় ৩ দিনের রিমাণ্ডে নেওয়া হয়।

২০০৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর রিমাণ্ডে থাকাকালে তারেকের ওপর নানা রকমের দৈহিক নির্যাতন করা হয়। এর মধ্যে একটি ছিল অনেক ওপর থেকে বারবার ফেলে দেওয়া। অসহ্য যন্ত্রণায় তিনি কুঁকড়ে ওঠেন। কিন্তু নির্যাতনকারী অফিসারদের বিন্দুমাত্র মায়া-দয়া হয়নি। ওদের দায়িত্ব ছিল তারেককে কষ্ট দিয়ে মেরে ফেলা। তারপর থেকে দীর্ঘ সময় তারেক কারাগারে। কোনো ডাক্তার নেই। চিকিৎসা হয়নি। প্রতিটি দিন কেটেছে নারকীয় যন্ত্রণায়। একজন রাজনীতিকের বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে, গ্রেপ্তার চলতে পারে। কিন্তু নির্যাতন করার, শরীরের অঙ্গ বিকল করার, মানবাধিকার পদদলিত করার অধিকার সভ্যতার কোথায় আছে? 

২০০৮ সালের ১ জানুয়ারি দুর্নীতি দমন কমিশন তারেক ও তার স্ত্রী এবং শাশুড়ির বিরুদ্ধে সম্পদের হিসাব গোপন করার অভিযোগ এনে ৫২ (৯) নম্বর মামলাটি দায়ের করে। এক মাস বিরতির পর একই দিনে তারেককে আবারও আদালতে হাজির করে দুদকের দায়ের করা মামলায় ১ দিনের রিমাণ্ডে নেওয়া হয়। ২০০৮ সালের ৯ জানুয়ারি রেজা কনস্ট্রাকশনের এমডি খান আপ্তাবউদ্দিন আহমদ গিয়াস উদ্দিন আল মামুনসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে এক কোটি ৩২ লাখ টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করে। এ মামলায় তারেক রহমানের নাম অন্তর্ভুক্ত না থাকলেও পরে তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। 

৪ দফায় ১১ দিন রিমান্ড শেষে আবারও রিমাণ্ডে নেওয়ার আবেদন জানিয়ে পুলিশ তারেক রহমানকে ৯ জানুয়ারি ২০০৮ ঢাকার ১ নম্বর অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম এহসানুল হকের আদালতে হাজির করে। মেসার্স রেজা কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খান আপ্তাবউদ্দিন আহমদ ব্যবসায়ী গিয়াসউদ্দিন আল মামুনসহ ৭ জনকে আসামি করে ২০ লাখ টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করেন। এ মামলার এজাহারে তারেকের নাম নেই। পুলিশের বক্তব্য হচ্ছে প্রধান আসামি মামুন জিজ্ঞাসাবাদে চাঁদাবাজির টাকার কিছু অংশ তারেকের এপিএস অপুকে দিয়েছে বলে আদালতে বক্তব্য দিয়েছেন। অপু টাকা নিয়ে তারেককে দিয়েছেন কি না তা জানার জন্য তারেককে রিমাণ্ডে নেওয়া প্রয়োজন। 

এ মামলায় রিমাণ্ডে নেওয়ার আগে তারেক সরকারের হেফাজতে থেকে গুরুত্বর অসুস্থ হয়ে পড়েন। এর আগ পর্যন্ত আদালতে তিনি কোনো কথা বলেননি। ওইদিন আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বিচারকের অনুমতি নিয়ে তিনি তার ওপর অমানবিক নির্যাতনের বিবরণ তুলে ধরে বক্তব্য দেন। তিনি আদালতের কাছে তার জীবন ভিক্ষা চেয়ে বলেনÑ‘আবার রিমাণ্ডে নিলে আমি আর বাঁচব না। আমি রিমাণ্ডে শারীরিকভাবে এতটাই নির্যাতনের শিকার হয়েছি যে, এখন মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারছি না।’ 

আদালতে তারেক বলেনÑ‘২৪ ঘণ্টা মোটা কাপড় দিয়ে চোখ বেঁধে নির্জন স্থানে নিয়ে নির্যাতন করা হচ্ছে। সরকারের নিষ্ঠুর নির্যাতনের হাত থেকে একমাত্র আদালতই আমার জীবন বাঁচাতে পারেন। কেননা আদালতই হচ্ছে মানুষের আশা-ভরসার শেষ আশ্রয়স্থল। একটি মানুষ বেঁচে থাকলেই শুধু তার বিচার সম্ভব।’

তিনি আদালতের কাছে প্রশ্ন রেখে বলেনÑ‘নির্যাতন করে তিলে তিলে আমাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিলে আদালত কার বিচার করবেন?’

সেদিনের বক্তব্যে শুধু আইনজীবীরাই নন, গোটা আদালতে উপস্থিত সকলে বিচলিত হয়ে পড়েন। তারেকের আইনজীবীরা আদালতকে বলেনÑ‘রিমাণ্ডে জিজ্ঞাসাবাদের নামে তারেকের ওপর অমানবিক ও নিষ্ঠুর নির্যাতন চালানো হয়। তার মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হয়েছে। চোখ বেঁধে তাকে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে ক্রসফায়ারে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়েছে।’

শুনানির পর আদালত পুলিশের আবেদন গ্রহণ করে ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তবে জিজ্ঞাসাবাদের সময় সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেন। 

বসুন্ধরা গ্রুপের পরিচালক সাব্বির হত্যা মামলা ধামাচাপা দিতে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ এনে রমনা থানায় সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। এ মামলায় তারেককে সহযোগী আসামি করা হয়। 

১৮ জানুয়ারি ২০০৮ তারেক রহমানের নানি তৈয়বা মজুমদার ইন্তেকাল করেন। নানিকে শেষবারের মতো দেখার জন্য তারেককে পরদিন দুপুর ১২টায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। শাহবাগ থানায় নিয়ে ৪ ঘণ্টা বসিয়ে রেখে বিকাল ৪টায় ক্যান্টনমেন্টের মইনুল রোডের বাসায় নানির মৃতদেহের কাছে তাকে নেওয়া হয়। নিজের ভগ্ন শরীর নিয়ে প্রিয় নানিকে দেখে সেদিন তারেক রহমান অনেক কাঁদলেন। কাঁদালেন উপস্থিত সবাইকে। ওইদিন জিয়া পরিবারের কারাবন্দি অপর দুই সদস্য খালেদা জিয়া ও কোকোকেও প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়। কিন্তু সরকার তাদের কাউকেই পরস্পরের সঙ্গে দেখা করতে দেয়নি।

সরকারের হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদের নামে নির্যাতন এবং সঠিক চিকিৎসা না পাওয়ায় তারেকের শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকলে ৩১ জানুয়ারি তাকে পিজি হাসপাতালের প্রিজন সেলে নিয়ে ভর্তি করা হয়। সেখানে অ্যাম্বুলেন্সে করে বিশেষ আদালতে তাকে নেওয়া হয়। আদালতে হুইল চেয়ারে তিন মিনিট বসিয়ে রাখার পর তার মেরুদণ্ডের ব্যথা শুরু হয়। তার সঙ্গে থাকা পিজি হাসপাতালের চিকিৎসকদের সুপারিশে তাকে আবারও অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে ফিরিয়ে আনা হয়। আদালতে চিকিৎসকের দেওয়া মেডিকেল রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, তারেকের স্পেশালাইজড অর্থোপেডিক ট্রিটমেন্ট প্রয়োজন। তার মেরুদণ্ডের কয়েকটি হাড় ভেঙে গেছে। কয়েকটি হাড় বেঁকে গেছে। ফলে তাকে বেশিক্ষণ বসিয়ে রাখা মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। পরবর্তীতে তারেকের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে পর্যায়ক্রমে তিনটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়। প্রতিটি বোর্ডই দ্রুত উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে অর্থোপেডিক, পিজিওথেরাপি, কার্ডিওলজি ও রেডিওগ্রাফির সুবিধা সংবলিত যে কোনো হাসপাতালে ভর্তি করার পরামর্শ দেয়। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় বিএসএমএমইউ হাসপাতাল তারেক রহমানকে ৩১ জানুয়ারি ২০০৮ ভর্তি করা হয়। 

গ্রেপ্তারের পর দিনকাল প্রকাশনা লিমিটেডের নিয়মিত বার্ষিক প্রতিবেদন দাখিল না করায় রেজিস্ট্রার ও জয়েন্ট স্টক কোম্পানির পক্ষ থেকে একটি মামলা দায়ের করা হয়। এতে তারেক ছাড়াও খালেদা জিয়া, বিএনপির সাবেক মহাসচিব আব্দুস সালাম তালুকদার, সাবেক স্পিকার শেখ রাজ্জাক আলীসহ কোম্পানির ১৩ পরিচালককে আসামি করা হয়। এই মামলাটি খারিজ করে দেন হাইকোর্ট। ২২ মার্চ ২০০৮ হাইকোর্ট বিভাগ মামলাটি খারিজ করে দিনকাল প্রকাশনা লিমিটেডের পক্ষ থেকে ৬ লাখ টাকা অনুদানের নির্দেশ দেন। এর মধ্যে ৫ লাখ টাকা প্রধান উপদেষ্টার ত্রাণ তহবিলে এবং বাকি ১ লাখ টাকা সুপ্রিম কোর্ট কর্মচারী কল্যাণ ট্রাষ্টে দিতে বলা হয়।

সংসদ ভবনের বিশেষ আদালত-৩-এর বিচারক শাহেদ নুরুদ্দিনের আদালতে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দায়ের করা বসুন্ধরা গ্রুপের পরিচালক সাব্বির হত্যা ধামাচাপা দেওয়া মামলার শুনানিকালে তারেক কয়েকবার অসুস্থ হয়ে পড়েন। মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে যাওয়ায় তাকে হুইল চেয়ারেও বসিয়ে রাখা যাচ্ছিল না। এ মামলায় তারেকে ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতির প্রার্থনা জানিয়ে ২৫ জুন ২০০৮ আইনজীবীরা আদালতে আবেদন করেন। আবেদনে তারা বলেনÑ‘অত্র আদালত ইতঃপূর্বে শেখ হাসিনাকে চিকিৎসার জন্য চলমান মামলায় ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন। মোট ৫টি মামলায় শেখ হাসিনাকে ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন আদালত। তারেক এখন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। মেডিকেল বোর্ড তাকেও উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশ পাঠানার পরামর্শ দিয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪০/এ ধারায় আদালতের এ এখতিয়ার রয়েছে।’

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা এ আবেদনের ব্যাপারে বিরোধিতা করায় শেষ পর্যন্ত ৬ জুলাই ২০০৮ এ বিষয়ে আদালত সিদ্ধান্ত দেন। আদালত তার শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে ব্যক্তিগত হাজির থেকে তাকে অব্যাহতি দেন। শেখ হাসিনাকে বিদেশে পাঠাতে রাতের আঁধারে আদালত বসিয়ে টেলিফোনে বিচারককে বাসা থেকে ডেকে সরকারি আইনজীবীরা তার অব্যাহতির ব্যবস্থা করেন। কিন্তু তারেক রহমানের বিষয়ে সরকারি আইনজীবীদের ভূমিকায় বিস্ময় প্রকাশ করেন তার আইনজীবীরা। ৬ জুলাই ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে তাকে অব্যাহতি দিলেও তাকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানো হয়নি। শেষ পর্যন্ত আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে উচ্চ আদালত থেকে জামিন লাভের মাধ্যমে মুক্ত হন তারেক।

কারাবন্দি তারেক তার বিরুদ্ধে সাজানো ঘুষ গ্রহণ মামলা থেকে নিজেকে অব্যাহতি এবং জামিন চেয়ে ২ জুন ২০০৮ হাইকোর্টে রিট আবেদনটি দায়ের করেন। ৭ আগস্ট ২০০৮ বিচারপতি শরীফ উদ্দিন চাকলাদার ও বিচারপতি মো. ইমদাদুল হক আজাদ সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ একই বিষয়ে একাধিক মামলা চলতে পারে কি না তা হাইকোর্ট স্পষ্ট নয় বলে আদালত তারেকের ৫৬১ ধারায় দায়ের করা অব্যাহতি আবেদন সরাসরি আপিল করার সুযোগ দিতে সংবিধানের ১০৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সার্টিফিকেট দেওয়ার কথা বলেন। এ প্রসঙ্গে আদালত অভিমত প্রকাশ করেনÑ‘সাধারণত, হাইকোর্ট সার্টিফিকেট ইস্যু করলে আবেদনকারী এর প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট আপিল বিভাগের স্থগিতাদেশ চাইতে পারেন।’

আদালত একই সঙ্গে নিম্ন আদালতে মামলাটির বিচার কার্যক্রম ১২ আগস্ট ২০০৮ পর্যন্ত স্থগিত ঘোষণা করেন। এর আগে আদালতের কার্যক্রম শুরুর পর আদালত দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কৌঁসুলিকে তারেকের চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি উপস্থাপন করতে বলেন। ৪ আগস্ট আদালত এ নথি তলব করেছিলেন। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সরকার পক্ষ তারেকের মেডিকেল রিপোর্ট উপস্থাপন না করায় আদালত অসন্তোষ প্রকাশ করেন। পরে তারেকের আইনজীবীরা তার মেডিকেল রিপোর্ট আদালতে উপস্থাপন করেন। এ পর্যায়ে আদালত শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল জলিল, মোহাম্মদ নাসিম ও মানবাধিকার নেত্রী সিগমা হুদার জামিন লাভের বিষয় উল্লেখ করে বলেনÑ‘মেডিকেল বোর্ডের সুপারিশ অনুযায়ী কাউকে চিকিৎসার জন্য সাময়িক মুক্তি দিয়ে বিদেশে পাঠানো হচ্ছে। কেউ জামিন পাচ্ছেন। মেডিকেল বোর্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী তারেক গুরুতর অসুস্থ। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকেও বিদেশে পাঠাবার সুপারিশ করা হয়েছে। কাজেই জীবন রক্ষার্থেই তারেককে অন্যদের মতো সাময়িক মুক্তি দিয়ে চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠাতে সরকারকে পরামর্শ দেওয়া হলো।’

এ সময় আদালত বলেনÑ‘সরকার এ পরামর্শ মানবে কি না জানি না। তবে সভ্য সমাজে হাইকোর্টের পরামর্শকে আদেশ হিসেবে গণ্য করে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।’

২৭ আগস্ট ২০০৮ সাব্বির হত্যা মামলা ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় আপিল বিভাগ তারেককে জামিন মঞ্জুর করেন। এ জামিনের পর তারেকের মুক্তি পাওয়া প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায়। তবে ২৮ আগস্ট তারেককে হাইকোর্ট বিভাগের মঞ্জুর করা ৬টি জামিনের বিরুদ্ধে সরকার ও দুর্নীতি দমন কমিশন আপিল করে। তাদের আপিলে হাইকোর্ট বিভাগের দেওয়া জামিন আদেশ স্থগিত করার আবেদন জানানো হয়। ১ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগের অবকাশকালীন চেম্বার জজের আদালতে সরকার ও দুদকের আপিল একসঙ্গে শুনানি করা হয়। শুনানি শেষে আপিল বিভাগের চেম্বার জজের আদালত সরকার ও দুদকের আবেদন খারিজ করে দেন। এই খারিজ আদেশের পর তারেকের জামিনে মুক্তি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়। ১ সেপ্টেম্বর ২০০৮ বেলা সাড়ে ১১টায় এ আদেশের পর মুক্তি পেতে প্রতীক্ষা করতে হয় ৩ সেপ্টেম্বর বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত।

বন্দি থাকা অবস্থায়ও তারেক সরকারের বিমাতাসুলভ আচারণের শিকারে পরিণত হন। ৫টি মেডিকেল বোর্ড উন্নত চিকিৎসার জন্য শেখ হাসিনা, আব্দুল জলিল ও মোহাম্মদ নাসিমের মতো তারেকেও বিদেশে পাঠানোর সুপারিশ করে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও দেশবাসীর দাবি উপেক্ষা করে সরকার তারেকের চিকিৎসার বিষয়ে নীরব থাকে। তারেকের ওপর সরকারের নিষ্ঠুর আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। চারদলীয় জোট তারেকের জীবন রক্ষার্থে তাকে মুক্তি দিয়ে চিকিৎসার জন্য দ্রুত বিদেশ পাঠানোর দাবি করে আসতে থাকে। একই সঙ্গে আইনজীবীরা তারেকের মুক্তি নিশ্চিত করতে আদালতে আইনি লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন। অবশেষে আইনি লড়াইয়ে জয়লাভের মাধ্যমেই মুক্তি পান তারেক।

দীর্ঘ আইনী লড়াই শেষেও দুদিন প্রতীক্ষার পর অবশেষে মুক্তি পান তারেক। নানা অনিশ্চয়তা ও প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে ৩ সেপ্টেম্বর ২০০৮ বিকাল ৪টা ৩৫ মিনিটে তিনি মুক্তি পান। বেলা সোয়া ৩টা পর্যন্ত দৈনিক দিনকাল সংক্রান্ত মামলার বিষয়টি নিয়ে মুক্তি পাওয়া অনিশ্চয়তার ধূম্রজালে আটকে ছিল। এ নিয়ে তারেকের আইনজীবী ও কারা কর্তৃপক্ষের মধ্যে দীর্ঘ ৩ ঘণ্টা আইনগত ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা হয়। কারা অধিদপ্তরে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তারেকের পক্ষে তার আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিমুল বিশ্বাস, ব্যারিস্টার নওশাদ জামির, ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন অসীম ও ব্যারিস্টার কায়সার কামাল উপস্থিত ছিলেন। অপরদিকে ডিআইজি প্রিজন, জেল সুপার, সিনিয়র জেল সুপার ও কারা কর্তৃপক্ষের একজন আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন। কারা কর্তৃপক্ষের কাছে দিনকাল প্রকাশনা লিমিটেডের মামলায় তারেকের জেল ওয়ারেন্ট দেখানো হয়েছিল। অপরদিকে দিনকাল প্রকাশনা লিমিটেড বিলুপ্ত ঘোষণা করে হাইকোর্ট বিভাগের দেওয়া রায়ের ফলে মামলাটি বিলুপ্ত হয়ে যায়। এ মামলায় জামিনের বিষয়ে কোনো আদেশ না থাকায় বিভ্রান্তিতে পড়েছিল কারা কর্তৃপক্ষ। এ নিয়ে কারা কর্তৃপক্ষ প্রশ্ন উত্থাপন করলে তারেকের মুক্তি পাওয়া নিয়ে সাময়িক অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। এ সময় চার আইনজীবী ছুটে যান কারা অধিদপ্তরে। সেখানে দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে বেলা সাড়ে ৩টা পর্যন্ত একটানা বৈঠক হয়। বৈঠকে আইনগত ব্যাখ্যা পেশ করেন তারেকের আইনজীবীরা। তারা কারা কর্তৃপক্ষের কাছে হাইকোর্ট বিভাগের মামলাটি নিষ্পত্তির আদেশ পেশ করেন এবং ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেন। এ সময় হাইকোর্টের আদেশ অনুযায়ী দিনকাল প্রকাশনার পক্ষ থেকে ৫ লাখ টাকা প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে এবং ১ লাখ টাকা সুপ্রিম কোর্ট কর্মচারী কল্যাণ ট্রাষ্টে জমা দেওয়ার কাগজপত্র পেশ করা হয়।

দীর্ঘদিনেও বিষয়টি কারা কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন হয়নি। এ নিয়ে বিভ্রান্তিতে ছিলেন কারা কর্মকর্তারা। বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ার পর তারেকের মুক্তি দেওয়া হয়। তৎকালীন ডিআইজি প্রিজন শামসুল হায়দার সিদ্দিকী ও সিনিয়র জেল সুপার তৌহিদুল ইসলাম হাসপাতালে এসে তার মুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেন। প্রত্যাহার করে নেওয়া হয় জেল কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা কর্মীদের। ডিআইজি প্রিজন শামসুল হায়দার সিদ্দিকী বিকালে তারেকের মুক্তি নিশ্চিত করে পিজি হাসপাতালের সামনে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেনÑ‘দিনকাল প্রকাশনা লিঃ মামলা নিয়ে সন্দেহ দূর করার পর তারেকের মুক্তি দেওয়া হয়েছে।’

তারেক রহমান মুক্তÑ এ ঘোষণা দেওয়ার পর ডিআইজি প্রিজন মেজর শামসুল হায়দার সিদ্দিকীকে আবেগে মাল্যভূষিত করেন বিএনপি নেতা-কর্মীরা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের ডি ব্লকের ইউনিভার্সিটি কার্ডিয়াক সেন্টারের চারতলায় অবস্থানরত তারেকের কক্ষ থেকে কারাবন্দি প্রত্যাহার করে নিচে আসার পর এ ঘটনা ঘটে। এ সময় তিনি তারেক রহমানকে উদ্ধৃত করে দলের নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে করে বলেনÑ‘তিনি আপনাদের তার জন্য দোয়া করতে বলেছেন। মিছিল-মিটিং না করার জন্য বলেছেন।’

মুক্তি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় ছিলেন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা। এ নিয়ে তারেকের আইনজীবীদের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আইনি লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে। চিকিৎসাধীন তারেক মুক্তি পর্যন্ত পিজি হাসপাতালের ডি ব্লকের একটি কেবিন ছিলেন। মুক্তি পাওয়ার পরও তারেক হাসপাতালেই ছিলেন। 

তারেক মুক্তি পাবেনÑ এ খবরে সকাল থেকে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা পিজি হাসপাতালের সামনে এসে ভিড় করেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নেতা-কর্মীদের উপস্থিতিও বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে পিজি হাসপাতাল চত্বর লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। তারা তারেক ও খালেদা জিয়ার পক্ষে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। একপর্যায়ে স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। বিকালে তারেকের মুক্তি নিশ্চিত হওয়ার পর নেতা-কর্মীরাও মোনাজাত করে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেন। মুক্তির পর বিকালে বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেন, স্থায়ী কমিটির সদস্য চৌধুরী তানভীর আহমেদ সিদ্দিকী, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হান্নান শাহ ও যুগ্ম মহাসচিব গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, বিএনপির দপ্তর সম্পাদক রিজভী আহমদসহ কয়েকজন সিনিয়র নেতা তারেকের সঙ্গে হাসপাতালে কেবিনে দেখা করেন। তারা তাকে ফুলের তোড়া দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। বাইরে এসে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘তারেক রহমান অসুস্থ। দেখা করেছি। তিনি আমাদের সালাম দিয়েছেন। দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন ও দোয়া করতে বলেছেন। দেশবাসীকে তিনি তার মা খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য দোয়া করার অনুরোধ জানিয়েছেন।’

তারেকের মুক্তির পর তার আইনজীবীরা আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জানিয়ে বলেন, ‘আইনের শাসনের বিজয় হয়েছে। আইন নিজস্ব গতিতে চললে খালেদা জিয়াও আল্লাহর রহমতে আইনি লড়াইয়ে বিজয়ী হয়ে বের হয়ে আসবেন।’

মুক্তি নিশ্চিত হওয়ার পর তারেক হাসপাতালের বিছানায় শোয়া অবস্থায়ই আল্লাহর দরবারে শোকরানা আদায় করেন। শোকরানা নামাজ শেষ করে মোবাইলে কথা বলেন স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানের সঙ্গে। সোয়া ৫টায় ফুলের তোড়া হাতে নিয়ে তারেকের স্ত্রী ডা. সৈয়দা জুবাইদা রহমান, তার বড় বোন সৈয়দা শাহিনা খানম ও তার স্বামী হাসপাতালে তারেকের কক্ষে প্রবেশ করেন। তারাও আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেন এবং শান্তির প্রতীক একজোড়া কবুতর হাসপাতাল কেবিনের জানালা দিয়ে উড়িয়ে দেন। এ সময় ডা. জুবাইদা ও তারেককে বেশ উৎফুল্ল দেখাচ্ছিল। তারেক তাদের সহযোগিতা নিয়ে বিছানায় শোয়া অবস্থা থেকে একটু উঠে হাসপাতাল কেবিনের জানালা দিয়ে উপস্থিত নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে হাত উঁচু করেন। তবে তিনি হাত নাড়াতে পারছিলেন না। শুধু হাতটি একটু উঁচু করে বের করেছিলেন। উঠে বসতে না পারায় নেতা-কর্মীদের চেহারাও দেখাতে সক্ষম হননি। তারেক রহমান অসহ্য যন্ত্রণায় কাঁদতে কাঁদতে স্ট্রেচারে গিয়ে লন্ডনের প্লেনে উঠেছিলেন ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা