ভূমিকম্পের ঝুঁকি
ড. তানভীর মুশতাফী
প্রকাশ : ১৫ অক্টোবর ২০২৫ ১১:১৫ এএম
মার্চ ২০২৫। মিয়ানমারে ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে শতাধিক মানুষ মারা গেল, আর সেই কম্পন স্পষ্ট বোঝা গেল ঢাকাতেও। দেয়াল কাঁপল মাত্র কয়েক সেকেন্ড, অথচ আতঙ্ক চলে গেল না অনেকক্ষণ। কারণ সত্যি কথা হলো, বড় ভূমিকম্প এলে শহরের সামান্য অংশই হয়তো অটুট থাকবে। ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর একটি। প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষ, আর প্রতিদিনই উঠছে নতুন নতুন বহুতল। প্রশ্নটা সোজা : এসব ভবন কি সত্যিই ভূমিকম্প-সহনশীল? বুয়েট- জিকা-এর সমীক্ষায় বলা হয়েছিল, ৭ মাত্রার কম্পনে ঢাকায় প্রায় সত্তর হাজার ভবন ধসে পড়তে পারে, প্রাণহানি হতে পারে এক লাখেরও বেশি। পরিসংখ্যানটি পুরনো। কিন্তু বাস্তবতা বদলায়নি; বরং ঝুঁকিই বেড়েছে। সমস্যাটা সবাই জানে, তবু কার্যকর উদ্যোগ কম। রাজউক নকশা অনুমোদন দেয়। কিন্তু মাঠপর্যায়ের যাচাই নিয়মিত হয় না।
বিএনবিসি রাজউক ২০২০ অনুযায়ী মাটির পরীক্ষা, কাঠামোগত বিশদায়ন এবং নির্মাণমানের যে বাধ্যবাধকতা আছে, বাস্তবে বহু ক্ষেত্রে তা মানা হয় না। কেন হয় না? কারণ পুরো ব্যবস্থাই অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির জালে জড়ানো। নকশা যাচাই, নির্মাণ তদারকি আর অনুমোদনের দায়িত্বে যারা আছেন, তাদের কারও কারও কাছে ফাইল এগোয় বিনিময় মূল্যে। নাগরিকের নিরাপত্তা তখন কাগজপত্রের নাটকে ডুবে যায়।
আমরা কর দিই, বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানির বিল দিই। কিন্তু নিরাপত্তায় সেই অর্থের ছিটেফোঁটাও কি পৌঁছায়? দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দপ্তর প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা খরচ করে সচেতনতামূলক কর্মসূচি আর মহড়া প্রকল্পে; মাঠে তার প্রভাব প্রায় শূন্য। স্কুল, অফিস, হাসপাতাল কোথাও নিয়মিত ভূমিকম্প মহড়া নেই। কাগজে প্রতিবেদন আছে, বাস্তবে প্রস্তুতি নেই। ফায়ার সার্ভিসের সরঞ্জাম কম, আর যা আছে তার বেশিরভাগই জীর্ণ বা বিকল। তাই নথিতে প্রস্তুতি থাকলেও বাস্তবে দ্রুত সাড়া মেলে না।
সবচেয়ে কষ্টের কথা, পুরান ঢাকার ইটের পুরনো বাড়ির ঝুঁকি আমরা জানি। কিন্তু নতুন অনেক বহুতলও সমান, অনেক সময় আরও বেশি অনিরাপদ। কারণ সেখানে soft storey, অনিয়মিত কাঠামো, দুর্বল structural joint আর short column-এর মতো ত্রুটি রয়ে যায়। ফলে প্রথম ধাক্কাতেই ভাঙন ধরে; তবুও অনুমোদন ও দরপত্রের লোভে নির্মাণ-দৌড় থামে না।
তুরস্কে ২০২৩ সালের ভূমিকম্পে প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল, যার বেশিরভাগই নিম্নমানের নির্মাণের নিচে চাপা পড়ে। সেখানে ভবন বিধিমালা আমাদের চেয়ে শক্তিশালী ছিল। প্রশ্নটা হচ্ছে, আমরা আসলে কোথায় দাঁড়িয়ে আছি? আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ বলছে, দুর্যোগ প্রস্তুতির বরাদ্দের বড় অংশই শেষ হয় প্রশাসনিক ব্যয়ে, অফিস, কর্মশালা, সফর আর আনুষ্ঠানিকতায়। ফলে মাঠপর্যায়ে কাজের চেয়ে দেখানোই বেশি হয়।
সরকারি উদ্যোগ এখন অনেক সময় ফিতা কাটা আর ফটোসেশনে আটকে যায়। ভূমিকম্প সচেতনতা দিবস পালিত হয় ফুল আর ব্যানারে। কিন্তু ঢাকায় এখনও ওয়ার্ডভিত্তিক অপসারণ পরিকল্পনা, নিরাপদ খোলা মাঠ কম, চিহ্নিত করাও হয়নি যথাযথভাবে; জরুরি পথনির্দেশের সাইনেজ প্রায় নেই বললেই চলে। কোন ভবন কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, কোথায় আশ্রয় আছে, কীভাবে যোগাযোগ করবে মানুষ এসব কিছুই নেই, নাগরিকের জন্য খোলা তথ্যভান্ডারও নেই।
তাই প্রশ্নটা আবার তীব্র হয়ে ওঠে, আমরা কবে জাগব? কবে বলব, যথেষ্ট হয়েছে? ঢাকা শুধু কংক্রিটের জঙ্গল নয়; লাখো পরিবারের স্বপ্ন, স্মৃতি আর ভবিষ্যৎ। এই শহরের পতন মানে এক প্রজন্মের ক্ষয়। এখনই জবাবদিহি চাইতে হবে। প্রথমত, পুরনো ও অনিয়ন্ত্রিত ভবনগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে কাঠামোগত নিরীক্ষা (Structural Auditing) ও সংস্কার-শক্তকরণ (Retrofitting)-এর আওতায় আনতে হবে। ভারতে National Disaster Management Authority (NDMA) এ ধরনের কর্মসূচি চালু করেছে; রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার দিলে বাংলাদেশেও এটি বাস্তবায়ন সম্ভব। দ্বিতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও বাণিজ্যকেন্দ্রে নিয়মিত ভূমিকম্প মহড়া বাধ্যতামূলক করতে হবে। যেমন অগ্নি লাইসেন্স নবায়ন করা হয়, তেমনি কাঠামোগত নিরাপত্তা ছাড়পত্রও নির্দিষ্ট সময় অন্তর নবায়ন করতে হবে। তৃতীয়ত, প্রতিটি ওয়ার্ডে জরুরি উদ্ধারসামগ্রী, নিরাপদ খোলা মাঠ (সমাবেশস্থল), স্বেচ্ছাসেবক দল, প্রাথমিক চিকিৎসা সহায়তা ও দ্রুত যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ে একটি ক্ষেত্রভিত্তিক পরিকল্পনা করতে হবে। ঢাকায় স্কুল-মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করে আশ্রয়কেন্দ্র (Shelter Node) গড়ে তোলা যেতে পারে। চতুর্থত, যারা নকশা ও তদারকি করেন, সেই প্রকৌশলীদের দক্ষতাÑ হালনাগাদ ও লাইসেন্স নবায়ন নিয়মিত নিশ্চিত করতে হবে। পুনঃপ্রশিক্ষণ ছাড়া লাইসেন্স বাড়ানো যাবে না; গুরুতর ব্যত্যয়ে লাইসেন্স স্থগিত/বাতিলের সুস্পষ্ট বিধান থাকতে হবে।
ভূমিকম্প আগে সতর্ক করে না, ইতিহাস করে। ইতিহাস বারবার বলেছে, যে সমাজ আগে প্রস্তুতি নেয় না, বিপর্যয়ের পরে তারা শুধু কাঁদে। আমরা কি সেই পথেই হাঁটব, নাকি আজ থেকেই নিজের শহরকে বাঁচাতে দায় নেব? নাগরিক হিসেবে আমাদের অধিকার আছে নিরাপদ শহর দাবি করার। আজ যদি দাবিটা তুলি এবং কাজে নামি, তবেই বাঁচবে ঢাকা, বাঁচবে ভবিষ্যৎ।