বাজার পরিস্থিতি
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৫ অক্টোবর ২০২৫ ১১:০৭ এএম
আবারও সয়াবিন ও পাম তেলের দাম বেড়েছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টা বলেছেন, তারা দাম বাড়াননি। উৎপাদক, আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরাই দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। এই এখতিয়ার তাদের নেই। এ কথা সত্য হলে মনে হয় তারা স্বাধীন হয়ে গেছে। কর্তৃপক্ষ বা সরকারের অনুমোদনেরও কোনো ধার ধারছে না তারা। অথবা সরকার পারছে না তাদের ওপর কর্তৃত্ব আরোপ করতে। তাই কোনোভাবেই যেন পণ্যটির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা যাচ্ছে না। ইতোমধ্যে সরকার নির্ধারিত নতুন মূল্য কার্যকরও হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়বেÑ এটা স্পষ্ট। লক্ষণীয় বিষয়, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম নিম্নমুখী থাকলেও বাংলাদেশে দফায় দফায় বাড়ছে। অভিযোগ রয়েছে, সিন্ডিকেটের হস্তক্ষেপে বারবার বাড়ানো হচ্ছে এই ভোগ্যপণ্যটির দাম। বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে যে পরিমাণ সয়াবিন তেল আমদানি হয়েছে তা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় বেশি। তাই স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে দাম বাড়ার বিষয়টির যৌক্তিকতা নিয়ে।
নতুন দাম অনুযায়ী প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১৮৯ টাকা থেকে বেড়ে ১৯৫ টাকা, খোলা সয়াবিনের দাম ৩ টাকা বাড়িয়ে ১৭৭ টাকা এবং পাম তেলের দাম ১৩ টাকা বাড়িয়ে ১৬৩ টাকা করা হয়েছে। এ ছাড়া ৫ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৯৪৫ টাকা। এভাবে মূল্য বৃদ্ধি কেবল বাজারের ভারসাম্য নষ্ট করছে না, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনে গভীর সংকট সৃষ্টি করছে। ১৩ অক্টোবর সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবুর রহমানের সভাপতিত্বে ভোজ্য তেল ব্যবসায়ীদের এক বৈঠকে সিদ্ধান্তটি হয়েছে বলে জানানো হয় এবং সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সয়াবিন ও পাম তেলের নতুন দাম ঘোষণা করে বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন।
দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়ে উপদেষ্টার বক্তব্য এবং ব্যবসায়ীদের সিদ্ধান্ত এক রহস্যের জালে আবদ্ধ। গুরুত্বপূর্ণ এই মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা এবং সচিবের মধ্যতার সমন্বয়হীনতা যেন ভোক্তা হয়রানির আরেকটা উপলক্ষ হয়ে দাঁড়াল। শিগগির এর সমাধান জরুরি বলে আমরা মনে করি। উল্লেখ করা প্রয়োজন, গত আগস্টেও ভোজ্য তেলের দাম নির্ধারণ নিয়ে সরকার ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে টানাপড়েন তৈরি হয়। প্রতি লিটার সয়াবিন তেলে ব্যবসায়ীরা ১০ টাকা দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করেন। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় তাদের মাত্র এক টাকা বাড়ানোর অনুমতি দিয়েছিল। এতে ব্যবসায়ীরা ক্ষুব্ধ হন। প্রায় ২ মাস পর নতুন করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ানোর এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। উল্লেখ্য, গত রোজার আগে সরবরাহ সংকটের অজুহাতে খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ১৬-১৭ টাকা বাড়িয়েছিলেন ব্যবসায়ীরা। তখন বোতলের তেলও নির্ধারিত দামে পাওয়া যায়নি।
ভোজ্য তেল মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অন্যতম। প্রতিটি পরিবারে প্রতিদিনের রান্নাবান্নায় এটি অপরিহার্য উপকরণ। ভোজ্য তেল হচ্ছে চাল, ডাল, আটার মতোই অপরিহার্য খাদ্যপণ্য। আমরা মনে করি, এ ধরনের পণ্যকে ব্যবসায়ের হাতিয়ার করা সমীচীন নয়। কারণ এসব পণ্যে দামের সামান্য পরিবর্তনও সাধারণ মানুষের ব্যয়ভারকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। যতদূর জানা যায়, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্য তেলের দাম স্থিতিশীল আছে। কিন্তু দেশীয় বাজারে তার উল্টোচিত্র। ব্যবসায়ী মহলের একাংশ দাবি করছে, ডলার সংকট, আমদানির খরচ বৃদ্ধি এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে দাম বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু ভোক্তা পর্যায়ে সেই যুক্তি গ্রহণযোগ্য মনে হচ্ছে না। কারণ সরকার ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর মধ্যে স্বচ্ছ সমন্বয়ের অভাব বারবার চোখে পড়ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা এবং সিন্ডিকেটের প্রভাবই মূল কারণ। অতীতেও দেখা গেছে, প্রভাবশালী আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ী একজোট হয়ে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে। সরকারের বাজার তদারকি ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় তারা দাম বাড়িয়ে মুনাফা লুটে নিচ্ছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য নেতিবাচক।
এটা মানতেই হবে, ভোজ্য তেলের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। তাই বাজারে ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে সরকার, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা সবার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এই পরিস্থিতিতে সর্বাগ্রে প্রয়োজন সরকার, মন্ত্রণালয় এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে ভোজ্য তেলের দাম বৃদ্ধি নিয়ে যে মতভিন্নতা স্পষ্ট হয়েছে- তার অবসান। দ্বিতীয়ত, সরকারের উচিত বাজারে সরবরাহ পর্যাপ্ত রাখার জন্য আমদানি নীতিতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং শুল্ক কমানো। তৃতীয়ত, ভোজ্য তেল উৎপাদনকারী ও আমদানিকারকদের মজুদ কার্যক্রমে কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে, যাতে কৃত্রিম সংকট তৈরি না হয়। ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট ভাঙতে প্রতিযোগিতামূলক বাজারব্যবস্থা তৈরি জরুরি। এ ক্ষেত্রে টিসিবির মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে তেল বিক্রি অব্যাহত রাখা যেতে পারে, যাতে নিম্নআয়ের মানুষ কিছুটা স্বস্তি পায়। এছাড়া ভোক্তাদেরও সচেতন হতে হবে, অপ্রয়োজনে অতিরিক্ত তেল ক্রয় না করা এবং স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতে উদ্যোগ নেওয়া।
আমরা মনে করি, দেশে সূর্যমুখী, সয়াবিন ও সরিষার চাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে আমদানিনির্ভরতা কমানো গেলে দীর্ঘমেয়াদে তেলের দাম স্থিতিশীল রাখা সম্ভব। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলোÑ সরকারি তদারকি জোরদার করে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা। আমরা বিশ্বাস করি, সম্মিলিত উদ্যোগেই ভোজ্য তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।