ভেনেজুয়েলার তেল
আজাদ-আল-আমিন
প্রকাশ : ১৪ অক্টোবর ২০২৫ ১৩:৫৫ পিএম
এবার শান্তিতে নোবেল পুরস্কারটি পেয়েছেন ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো। শুনে মনে প্রশ্ন এলোÑ ঠিক কী কারণ? মানুষ তো ভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার মানে স্বাধীনতা, মানবাধিকার ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় অনন্য ভূমিকার স্বীকৃতি। তাই জানতে ইচ্ছে হলোÑ বিশ্বের সচেতন মানুষ ও অধিকারকর্মীরা যখন গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর গণহত্যা বন্ধ নিয়ে দেশে দেশে এত বিক্ষোভ করছে, সমুদ্রযাত্রা করে অবরোধ ভাঙতে গিয়ে আটক হয়ে ইসরায়েলের কারাগারে নির্যাতনও সইছে, তখন মারিয়া শান্তি বা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় কী ভূমিকা রাখলেন। সোশ্যাল মিডিয়ায়ও দেখি এ নিয়ে সমালোচনা চলছে। তাই সমীকরণ মেলাতে প্রয়োজন হলো অনেক তথ্য খতিয়ে দেখার আর গভীর বিশ্লেষণের। তাতে বোঝা গেল, এবারও পুরস্কারটি যেন পশ্চিমা শক্তি ও মার্কিন নীতি সমর্থনের জন্য বিতরণ করা হয়েছে।
ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি, দেশটির বিপুল তেল মজুদ, সাধারণ জনগণের কষ্ট এর মধ্যে আবার গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের উচ্চকণ্ঠ দাবিÑ সবকিছুই যেন এক জটিল চিত্র। আসুন, আমরা একসঙ্গে বিষয়গুলো খুঁটিয়ে দেখি।
আলজাজিরার কাছে সময়ের এক প্রতিবেদন বলছে, ভেনেজুয়েলা বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পরিমাণ তেল মজুদ ধারণ করে, যার পরিমাণ প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল! তা হলে তো দেশটির ধনী হওয়ার কথা। অথচ বাস্তবে দেশটির জনগণ দরিদ্র; উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির মধ্যে জীবনযাপন করতে হচ্ছে তাদের। সেখানে এক টাকার জিনিস নাকি বিক্রি হয়েছিল এক কোটি টাকায়! বোঝা যাচ্ছে তো, কত বড় বিপর্যয়!
এখন প্রশ্ন হলো, এত তেল থাকার পরও দেশটি গরিব কেন? রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি পেত্রোলিওস ডে ভেনেজুয়েলা এসএর (পিডিভিএসএ) অদক্ষতা ও দুর্নীতিই এর মূল কারণ। আবার দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণেই কোম্পানিটি কার্যকর হয়ে উঠতে পারছে নাÑ রয়টার্সের এক প্রতিবেদন থেকে এমনই জানলাম। তবে পশ্চিমা মিডিয়ার বাইরে গিয়ে বিষয়গুলো নিয়ে অনুসন্ধান করলে বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিশেষ নেতিবাচক প্রভাবও এর পেছনে কাজ করে।
মিডিয়ার খবরই বলছে, মাচাদো পুরোপুরি স্পষ্টভাবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পক্ষে। তিনি মনে করেন, বিদেশি কোম্পানিকে তেল খাতে আনলে এবং মার্কিন চাপের সমর্থন নিলে অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত হবে। কিন্তু বাস্তবতা অন্যরকম। বিদেশি কোম্পানির হাতে সম্পদ চলে গেলে দেশীয় দক্ষতা তৈরি হয় না। আর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে খাদ্য, ওষুধ ও বিদ্যুতের সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। সাধারণ মানুষ, যারা তেলের দেশভুক্ত, তারাই ভোগান্তি অনুভব করছে।
রয়টার্সেরই এক প্রতিবেদন জানাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের মধ্যে অপরিশোধিত তেল বরাদ্দের জন্য অবিশ্বস্ত মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে লেনদেনের ফলে ২০২০ সাল থেকে ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি রাজস্ব হারিয়েছে।
একটি নিরীক্ষায় দেখা গেছে, পিডিভিএসএ গত তিন বছরে তেল বিক্রির মাত্র ১৬ শতাংশ নগদ অর্থ এনেছে, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের মার্চ মাসের মধ্যে মোট রপ্তানি থেকে ২৫.২৭ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে মাত্র ৪.০৮ বিলিয়ন ডলার পেমেন্ট পেয়েছে। বাকি ২১.২ বিলিয়ন ডলার হলো অপরিশোধিত বিল, যার মধ্যে রয়েছে দীর্ঘদিনের অংশীদার ইরানের সঙ্গে অদলবদল চুক্তির একটি বকেয়া ব্যালেন্সÑ যা বিভিন্ন বিনিময় ব্যবস্থার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা উচিত। ২০২০ সাল থেকে, তেহরান ভেনেজুয়েলার ভারী অপরিশোধিত পণ্যের বিনিময়ে পাম্পিং এবং পরিশোধন কার্যক্রম শুরু করার জন্য পিডিভিএসএ-কে কনডেনসেট, অপরিশোধিত তেলের পাশাপাশি অন্যান্য উপকরণ ও প্রযুক্তিবিদ সরবরাহ করেছে।
তবে পিডিভিএসএ’র অভ্যন্তরীণ সূত্র রয়টার্সকে জানায়, নথিতে দেখা গেছে নির্বাহীরা অজানা ট্যাঙ্কারগুলোকে অর্থ পরিশোধ না করলেও দেশ ছেড়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন, যা থেকে আনুমানিক ৩.৬ বিলিয়ন ডলার সম্ভাব্যভাবে পুনরুদ্ধারযোগ্য। মানে এখানে বড় ধরনের দুর্নীতি হয়েছে।
এরপরও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশটির তেল উৎপাদন ২০১৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে ১.৯ মিলিয়ন ব্যারেল থেকে ২০২০ সালের দ্বিতীয়ার্ধে সাড়ে তিন লাখ ব্যারেলেরও কম হয়েছে। গত বছর দেশটির তেল থেকে আয় ছিল আনুমানিক ৪.৭ বিলিয়ন ডলার, যা পাঁচ বছর আগের ৫৬ বিলিয়ন ডলারের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কম এবং বর্তমানে অচিহ্নিত রপ্তানিতে যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তার সমান।
এ কথা ঠিক, পিডিভিএসএ তেলের রাজস্ব থেকে কোটি কোটি ডলার দুর্নীতির শিকার হয়েছে। দুর্নীতি ও অদক্ষতা দেশের অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তবে বিদেশি কোম্পানি নিয়ন্ত্রণে এলে দেশের নিজস্ব সক্ষমতা গড়ে ওঠে নাÑ এটাও বিভিন্ন দেশ দেখেছে।
তবে মাচাদো পিডিভিএসএ’র বেসরকারিকরণের পক্ষে। তিনি যুক্তি দিচ্ছেন, বিদেশি বিনিয়োগে উৎপাদন বাড়বে। কিন্তু বিভিন্ন দেশের উদাহরণ থেকে এটি আমরা ভাবতে বাধ্যÑ বিদেশি নিয়ন্ত্রণে গেলে দেশীয় শ্রমশক্তি ও প্রযুক্তি উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। নাইজেরিয়ার উদাহরণ এখানে প্রাসঙ্গিক। বিদেশি বিনিয়োগ করলে হোস্ট দেশের নিয়ন্ত্রণ না থাকলে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি হয়। মাচোদার বিবেচনায় কি এসব আশঙ্কা কাজ করে না? এ প্রশ্ন দেখা দেবেই।
এখন আসি নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার বিষয়ে। সাধারণত মানবাধিকার ও শান্তির প্রচেষ্টার জন্য এ পুরস্কার দেওয়ার কথা। কিন্তু যখন পুরস্কার এমন ব্যক্তিকে দেওয়া হয়, যিনি বিদেশি হস্তক্ষেপের পক্ষে এবং বেসরকারিকরণ সমর্থন করেন, তখন পুরস্কারের উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।
দেশের সাধারণ মানুষ যারা হাইপার-ইনফ্লেশন, খাদ্য সংকট, বিদ্যুৎ ঘাটতি, দৈনন্দিন কষ্টের মধ্যে আছে, তাদের ওপর মাচাদোর নীতির প্রভাব মারাত্মক। তবে তার জনতুষ্টির নীতি ও পশ্চিমা সমর্থনের কৌশল কখনোই জনজীবনযাত্রা উন্নয়নে এখনও তো সহায়ক হয়নি।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মাচাদোর নীতির সমালোচনাও করছেন। পশ্চিমা সমর্থন নিশ্চিত করার জন্য এমন নীতি গ্রহণ করা হয়েছে বা হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের ক্ষতি করছেÑ এটি নোবেল শান্তি পুরস্কারের মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
যখন বিশ্বের লাখ লাখ সচেতন মানুষ গাজায় গণহত্যা বন্ধে করণীয় সব ধরনের চেষ্টা করে আসছে, তখন মাচাদো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি নীতিকেই সমর্থন করেছেন। ২০২০ সালে মাচাদোর ভেন্তে ভেনেজুয়েলা ও নেতানিয়াহুর লিকুড পার্টির মধ্যে চুক্তিও হয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, ‘রাজনৈতিক, আদর্শগত ও সামাজিক বিষয়’, ‘নীতি, ভূ‐রাজনীতি ও নিরাপত্তা’ ক্ষেত্রে সহায়তার উদ্দেশ্যে এই সম্পর্ক গড়ে তোলা হবে। ফলে ৭ অক্টোবরের হামলাকে ‘সন্ত্রাসী’ বলা মাচাদোর গাজায় গণহত্যা নিয়ে নীরবতার সমালোচনা এখনও হচ্ছে বিভিন্ন মহলে। এখন সেই মাচাদো পেয়ে গেলেন নোবেল শান্তি পুরস্কারÑ যিনি প্রকৃত অর্থে শান্তি, মানবাধিকার এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে কতটা অবদান রেখেছেন তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
আজাদ-আল-আমিন
সাংবাদিক