প্রথম পর্ব
জিবলু রহমান
প্রকাশ : ১৪ অক্টোবর ২০২৫ ১৩:৫০ পিএম
আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২৫ ১১:৫৩ এএম
তারেক রহমানের পিতা জিয়াউর রহমান এবং মা খালেদা জিয়ার আদরের দেওয়া নাম পিনো। তিনি এমন এক পিতার সন্তান যিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে, মুক্তিযুদ্ধে গৌরবময় অবদান রেখে, ৭ নভেম্বর বিপ্লবের প্রাণপুরুষ হিসেবে একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমন্ডিত জাতিসত্তার নতুন পরিচয়কে সূত্রবদ্ধ করায় ও দেশ গঠনে অবিস্মরণীয় ভূমিকা রেখেছেন। তিনি এমন এক মায়ের সন্তান যিনি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে আপসহীন নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান; তিনবার দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঁচটি করে নির্বাচনী আসনে বিজয়ী হয়ে সফল প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশে-বিদেশে অফুরান ভালোবাসা ও অকুণ্ঠ প্রশংসায় সিক্ত হন এবং সার্কনেত্রী হিসেবে দক্ষিণ এশিয়ায় তার অনন্য ভাবমূর্তি গড়ে তোলেন।
সেই পিতা-মাতার সন্তান হিসেবে তারেক রহমান ‘উন্নয়নের রাজনীতি’ দিয়েই বিপুল আবেগে তার রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন এবং রাজনীতিতে নিয়ে আসেন এক নতুন মাত্রা। প্রখ্যাত সাংবাদিক এবিএম মূসা তার একটি লেখায় এ তরুণ নেতার বিশেষত্ব নিপুণভাবে তুলে ধরেছিলেন।
তারেক রহমানের বয়স তখন মাত্র ৭ বছর। দেশের রাজনীতির গনগনে উত্তাপ। সৈনিক পিতা যুদ্ধে গেছেন। মায়ের সঙ্গে দু’ভাই তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান। আরাফাতের ডাক নাম কোকো। ১৯৭১ সালের সেই ঝঞ্ঝামুখর দিনে পাকিস্তানিরা যখন নেকড়ের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল, আর আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব পিছু হটে গেল, সেই দুঃসময়ে রুখে দাঁড়ালেন মেজর জিয়া। সময়ের সাহসী সৈনিক মেজর জিয়া প্রথমে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন দখলদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে। পরে কালুরঘাটস্থ রেডিওতে দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করেন স্বাধীনতার কথা। সাহায্য চান বিশ্ববিবেকের। সেই ঘোষণায় দিশাহারা জাতি মুহূর্তেই সচল, সজীব, আগুয়ান হয়ে ওঠে। ‘অসীম বল-ভরসা নিয়ে সকলেই মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মাত্র সাত বছর বয়সে সেই ঘোষণার মর্ম তারেক রহমানের বুঝতে পারার কথা নয়।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর আবার একজন জিয়ার প্রয়োজন পড়েছিল দেশ ও জাতির। এ সময় ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের শহীদ মঈনুল সড়কের বাসভবনেই বন্দিদশায় নিপতিত হন সেনাবাহিনী প্রধান জিয়াউর রহমান। গাঢ় অন্ধকারের বুক চিরে যেভাবে সোনালি সূর্য উদ্ভাসিত হয়, তেমনিভাবেই সেদিন বন্দিদশা থেকে সময়ের দাবিতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন জিয়াউর রহমান। সিপাহি-জনতার প্রাণ-অফুরান ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে দেশবাসীর নয়নের মণি হয়ে উঠেছিলেন তিনি।
১৯৭৫ সালের এই ঘটনাবলি যখন চলছিল, তখন তারেকের বয়স ছিল মাত্র ১৩ বছর। সেই বয়সেও এই ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলির মর্মার্থ বোঝা সহজ ছিল না। যখন বয়স হলো, তখন তিনি পিতাকে পাননি কাছে। কারণ প্রেসিডেন্ট জিয়া রাষ্ট্রীয় কাজে এতই ব্যস্ত থাকতেন যে, পরিবারের প্রতি খুব অল্পই নজর দেওয়ার সময় পেতেন; দিনে ১৮ ঘণ্টা কাজে ব্যস্ত থাকতেন তিনি।
এমন অবস্থা চলতে চলতেই ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে আততায়ীর গুলিতে শহীদ হন দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। শেরেবাংলা নগরে তার জানাজায় লাখ লাখ মানুষ যোগ দিয়েছিলেন। জানাজা অনুষ্ঠানে এত বিপুল জনসমাগম কখনও কোথাও দেখা যায়নি আর। ১৮ বছরের তরুণ আজকের তারেক পিতার কফিনে হাত রেখেছিলেন। শেষ বিদায় দিতে গিয়ে তার দুচোখ ছিল অশ্রুসিক্ত, দেশ ও জাতির জন্য আমরণ যিনি কাজ করে গেলেন, সন্তানদের কাছে যিনি অজানাই থাকলেন, তাকে এমনভাবে বিদায় দেওয়া সহজ ছিল না। পিতৃহারা দু শিশুকে মানুষ করেন ‘মা’দেশের সর্বাধিক জনপ্রিয় নেত্রী খালেদা জিয়া। সব সময় মায়ের কাছেই থাকেন তিনি। রাজনৈতিক কারণে কখনও বাসার বাইরে থাকলে বারবার ফোনে কথা বলে নেন মায়ের সঙ্গে।
১৯৯০ সালের ২০ নভেম্বর এক অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে শহীদ মঈনুল রোডের বাড়িতে জোর করে ঢুকে তারেককে আক্রমণ করেছিল। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর উৎফুল্ল জনতার মধ্যে তাকে দেখা গেছে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে। ৯ বছরের শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা থেকে মুক্তির আনন্দে তাকে দেখা গেছে আবেগে অধীর, উৎফুল্ল।
জনপ্রিয়তার মাপকাঠিতে খালেদা জিয়ার পরেই তারেকের অবস্থান। তরুণদের মধ্যে তারেকের জনপ্রিয়তা তুলনাহীন। সততা, নিষ্ঠা, আচার-আচরণ এবং রাজনৈতিক দর্শন দিয়ে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে শুরু করে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, কৃষিবিদ, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, ছাত্র-ছাত্রী, কৃষক-শ্রমিকসহ সর্বস্তরের মানুষের মন জয় করে নিয়েছেন। গ্রামের পর গ্রাম ঘুরে ঘুরে মানুষের সুখ-দুঃখের কথা শুনেছেন। যেখানে দুর্যোগ, দুর্বিপাক সেখানে ছুটে গেছেন তারেক। গ্রামের মানুষ তারেককে কাছে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে যেতেন। জড়িয়ে ধরেছেন বুকে। মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করেছেন মুরুব্বিরা। তারেক রহমানের আচার-আচরণ দেখে এবং বত্তৃতা শুনে অনেকে বলতেনÑ‘এ যে আরেক জিয়া’।
যে বয়সে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এদেশের জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট হিসেবে অভিনন্দিত হয়েছিলেন, সে বয়সে এসে তারেক মানুষের মন জয় করতে চারণের মতো ঘুরেছেন গ্রামে-গঞ্জে। মৃদুভাষী তারেক রহমান খুব সহজেই মানুষের সঙ্গে মিশতে পারেন। সকলের মন জয় করতে পারেন। তার স্মরণশক্তির প্রশংসাও করেছেন অনেক বিজ্ঞ ব্যক্তি। তার মধ্যে শহীদ জিয়ার প্রতিকৃতি দেখতে পান তারা।
অল্প দিনের মধ্যেই তারেক রহমান অর্জন করেন আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা। বাংলার ঘরে ঘরে জিয়া, খালেদা জিয়ার পাশাপাশি শোভা পায় তারেকের ছবি। তারেক রহমানের মতো একজন সৎ, নিষ্ঠাবান, দেশপ্রেমিক ও দূরদর্শী রাজনীতিকের উত্থান দেখে বাংলাদেশের মানুষ নতুন করে স্বপ্ন দেখতে থাকে। মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা দলে দলে রাজনীতিতে আসতে থাকে। রাজনীতির প্রতি যাদের অনীহা ছিল তারাও সমবেত হন তারেকের দলের পতাকাতলে। (চলবে)
জিবলু রহমান
কলাম লেখক ও গবেষক