‘ব্লু নেটওয়ার্ক’ প্রকল্প
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৪ অক্টোবর ২০২৫ ১৩:৪২ পিএম
নদীমেখলা এদেশের রাজধানী ঢাকা একসময় নদীমাতৃক নগরী হিসেবে পরিচিত ছিল। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যাÑ এই চার নদীকে ঘিরে ৬৫টি খাল ছিল ঢাকার প্রাণ। যা ছিল শহরের প্রাকৃতিক জলপ্রবাহের প্রধান মাধ্যম। এসব খাল দিয়ে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন, নৌযান চলাচল ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হতো। বর্তমানে এসবের অধিকাংশই দখল, ভরাট ও দূষণের কারণে বিলুপ্তপ্রায়। সরকারি হিসেবে এখন ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতায় ২৬টি খাল আংশিকভাবে টিকে আছে, বাকিগুলো হারিয়ে গেছে বা নালা-নর্দমার রূপ নিয়েছে। শুধু তাই নয়, রাজধানীর চারপাশে যেসব নদী একসময় পানিপথ ও বাণিজ্যের মূলধারা ছিল, সেগুলোও এখন আবর্জনা ও শিল্পবর্জ্যে ভরাট হয়ে অনেকটা মৃতপ্রায়। অথচ নগরজীবনের ভারসাম্য রক্ষায় নদী ও খাল অপরিহার্য। কিন্তু আমরা নিজেদের হাতেই সেই জীবনরেখা ধ্বংস করে চলছি।
এমন এক বাস্তবতায়, ঢাকার নদী ও খালগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে এবং নগরজীবনে পানি ও পরিবেশগত ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে ৬০ কোটি ডলার মার্কিন ডলার ঋণ সহায়তা দিতে সম্মত হয়েছে বিশ্বব্যাংক। সরকারের পরিকল্পিত ব্লু নেটওয়ার্ক প্রোগ্রামের আওতায় এই অর্থ ব্যয় হবে ঢাকাসহ আশপাশের নদী, খাল ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার পুনর্গঠনে। জানা গেছে, এটি হবে বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ নগর-পরিবেশ পুনর্গঠন কর্মসূচি। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে রাজধানীর জলাবদ্ধতা, নদীদূষণ ও পানি সংকটের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার টেকসই সমাধান মিলবেÑ এই আশা করাই যায়। আশা জাগানিয়া এই সংবাদটি রাজধানীবাসীর জন্য সত্যিই সুখবর বটে।
১৩ অক্টোবর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘ঢাকার নদী বাঁচতে ঋণ দেবে বিশ্বব্যাংক’ শীর্ষক প্রতিবেদনে জানা যায়, প্রকল্পটির প্রথম ধাপের ব্যয় ধরা হয়েছে ১০০ কোটি ডলার, যার প্রায় ৬০ শতাংশ দেবে বিশ্বব্যাংক। ২০২৬ থেকে ২০৩১ সালের মধ্যে এই ধাপ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। পুরো কর্মসূচির মেয়াদ ২০৪০ সাল পর্যন্ত। যা ঢাকাকে একটি টেকসই ও বাসযোগ্য জলনগরে রূপান্তরের রূপরেখা তৈরি করবে। খোদ বিশ্বব্যাংকই প্রকল্পের ধারণাপত্র এবং পরিবেশ ও সামাজিক ব্যবস্থা মূল্যায়ন প্রণয়ন করেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ব্লু নেটওয়ার্কের আওতায় এই প্রোগ্রাম শুধু নদী পুনরুদ্ধারই নয়Ñ বন্যা নিয়ন্ত্রণ, স্যানিটেশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পানি নিরাপত্তার একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরি করবে। এই উদ্যোগের অধীনে নদীগুলোর সঙ্গে যুক্ত খাল ও প্রাকৃতিক জলাশয়ের সংযোগ পুনঃস্থাপন করা হবে।
বিশ্বব্যাংক বলছে, প্রকল্পটির আওতায় নদী ও খালের প্রায় ৪২ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ড্রেনেজ চ্যানেল পুনর্গঠন, নদীতীর সংরক্ষণ, বর্জ্য পরিশোধনাগার স্থাপন, জলাধার সংস্কার এবং জলপথভিত্তিক পরিবহন চালুর মতো একাধিক কার্যক্রম নেওয়া হবে। এতে জলাবদ্ধতা কমবে, নদীর প্রবাহ বাড়বে এবং ঢাকার সামগ্রিক বায়ু ও পানির মান উন্নত হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বাস্তবায়ন হলে ঢাকার নদীগুলো আবারও হবে শহরের জীবনরেখা। তবে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে দখলদার উচ্ছেদ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ। নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা হাজারো স্থাপনা ভাঙা ছাড়া নদী বাঁচানো সম্ভব নয়। তা ছাড়া শিল্পকারখানার বর্জ্য নদীতে ফেলা বন্ধ করতে শক্ত আইন প্রয়োগ জরুরি।
এ কথা সত্য যে, বছরের পর বছর ধরে নদী ও খালগুলো দখল করে গড়ে উঠেছে বহু অবৈধ স্থাপনা। বিশেষ করেÑ প্রভাবশালী মহল, শিল্পমালিক ও ভূমিদস্যুরা নদী দখল করে গুদাম, কারখানা ও বসতি স্থাপন করেছে। এসব কারণে নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে, শিল্পকারখানার বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলার কারণে পানি এতটাই দূষিত হয়েছে যে, সেখানে কোনো প্রাণী বা জলজ উদ্ভিদ টিকে থাকা কঠিন। অতীতে সরকারগুলো নদী রক্ষায় নানা উদ্যোগের কথা বললেও কার্যকারিতা তেমন দেখা যায়নি। নদী কমিশন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ভূমিকা অধিকাংশ ক্ষেত্রে কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ দেখা গেছে। পরিবেশবিষয়ক সংগঠনগুলোর নানা কর্মসূচি দেখা গেলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। মাঝেমধ্যে বিক্ষিপ্ত অভিযান চালিয়ে কিছু দখলদার উচ্ছেদ হয়েছে সত্যি, পরে আবারও দখলদারি বহাল হয়েছে। আমরা মনে করি, স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজন আইনের কঠোর প্রয়োগ, নিয়মিত মনিটরিং ও স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা। এই ক্ষেত্রে নাগরিক সচেতনতা বাড়ানোও অপরিহার্য। সরকার, প্রশাসন ও নাগরিক সমাজ একসঙ্গে কাজ করলে ঢাকার চারপাশের নদী ও খালগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব।
যেকোনো প্রকল্পের অনিয়ম ও দুর্নীতি এখন উন্নয়নের প্রধান অন্তরায়। সরকারি-বেসরকারি বহু প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি, সময় নষ্ট ও কাজের নিম্নমান জনগণের আস্থা নষ্ট করছে। নানা অনিয়মের ফলে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ অপচয় হচ্ছে, আর প্রকৃত উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আমরা চাই, উল্লিখিত প্রকল্পে কঠোর নজরদারি, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হোক। প্রকল্প অনুমোদন থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। উন্নয়ন টেকসই করতে হলে প্রকল্পের অনিয়ম ও দুর্নীতি দূর করতেই হবে।
এ কথা মানতেই হবে, ঢাকার চারপাশের নদীগুলো এই জনপদের লাইফ লাইন। এ ক্ষেত্রে নদীগুলোর গতিপথ পুনরুদ্ধার করে পানির গুণগতমান বাড়ানো হবে এবং নদীপথের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে। এর পাশাপাশি নদীপ্রবাহের সুষ্ঠু নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশগত অবস্থার উন্নয়ন এবং টেকসই নগর ও ভূমি ব্যবস্থাপনা চাই। আমাদের প্রত্যাশা, বহুমুখী ও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রাণপ্রবাহ ফিরিয়ে আনা হবে। ঢাকাকে বাঁচানোর জন্য নদী ও খালগুলো পুনরুদ্ধারের বিকল্প নেই।