শ্রদ্ধাঞ্জলি
মযহারুল ইসলাম বাবলা
প্রকাশ : ১২ অক্টোবর ২০২৫ ১১:৫৪ এএম
আহমদ রফিক
আমাদের সমাজে হাতেগোনা যে দু-চারজন জ্ঞানী, বিবেকবান, নীতিনিষ্ঠ পণ্ডিত আছেন এবং ছিলেন তাদেরই একজন আহমদ রফিক। যিনি আমাদের ক্ষমতার রাজনীতির কেনাবেচার হাটে পার্থিব লোভ-লালসায় নিজেকে কখনও বিকিয়ে দেননি। বিপরীতে শাসকগোষ্ঠীর অগণতান্ত্রিক-স্বেচ্ছাচারী এবং ফ্যাসিবাদী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বরাবর সোচ্চার থেকেছেন। প্রতিবাদে জনগণের কাতারে এসে শামিল হয়েছেন।
আহমদ রফিক যিনি কারও রফিক স্যার, কারও রফিক ভাই। যাকে আমরা জাতীয় নানা দুঃসময়ে কাছে পেয়েছি। যিনি মতাদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গিতে অটল থাকতে আমাদের উদ্বুদ্ধ করেছেন। সময়, জ্ঞানের ব্যত্যয়ে যিনি কাউকে ছেড়ে কথা বলেননি। রফিক ভাই ঘড়ির কাঁটা ধরে যেমন নিজে চলতেন, অন্যকেও তেমনি সময়জ্ঞানে সচেতন হতে বাধ্য করতেন। এ ক্ষেত্রে তিনি বড়ই কঠোর।
রফিক ভাই কিশোর বয়সেই তার চিন্তা-মনন ও দৃষ্টিভঙ্গির উজ্জ্বল চেতনা গড়ে উঠেছিল। সমাজের ধনবৈষম্য, শ্রেণিবিভক্তি, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অনাচার এসব দেখে তিনি ক্ষুব্ধ হয়েছেন বটে, তবে হতাশাগ্রস্ত হননি। বরং বিদ্যমান অনাচারী-ব্যবস্থা থেকে মুক্তির উপায়টি তিনি সঠিকভাবে বুঝতে পেরে ক্রমেই মার্কসবাদী হয়ে ওঠেন। ছাত্র হিসেবে ছিলেন খুবই মেধাবান। মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিকে মেধাতালিকায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর সংগত কারণে পরিবারের আকাঙ্ক্ষায় ও ইচ্ছায় তাকে ডাক্তারি পড়তে ভর্তি হতে হয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র আহমদ রফিক জড়িয়ে পড়েন কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে।
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে প্রত্যক্ষ যুক্ততার কারণে একুশে ফেব্রুয়ারি পরবর্তীতে ভাষা মতিনকে বন্দি করা হয় এবং মেডিকেল কলেজের ছাত্র আহমদ রফিকের ওপর হুলিয়া জারি হলে বাধ্য হয়ে তাকে আত্মগোপনে যেতে হয়। প্রায় দুই বছর ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে পুলিশি নজর এড়িয়ে গোপনে বসবাস করেন। সেই সময়ে চরম আর্থিক অনটনে খেয়ে-না খেয়ে জীবন কাটাতে হয়েছে। যুক্তফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেও ছাত্রত্ব ফিরে পাওয়ার বিষয়টির সমাধান হয়নি। ওদিকে পরিবারের মেধাবী ছেলেটি আর ডাক্তার হতে পারল না, এমন শঙ্কায় পরিবারের মধ্যেও তীব্র হতাশা নেমে আসে। বহু কাঠখড় পুড়িয়ে অবশেষে হুলিয়া প্রত্যাহারের পর আবার তিনি মেডিকেল কলেজের ছাত্রত্ব ফিরে পান এবং ইচ্ছাশক্তির কঠিন দৃঢ়তায় এমবিবিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। লক্ষ্য বাস্তবায়নে তার একরোখা একাগ্রতাই এতে প্রমাণ করেছে। যেটি তিনি জীবনভর বহন করে এসেছেন। ডাক্তার হয়েও ডাক্তারি পেশায় তিনি যুক্ত হননি। করেননি সরকারি স্বাস্থ্য বিভাগের চাকরি এবং প্রাইভেট প্র্যাক্টিসও।
সম্পূর্ণ ভিন্নতর পেশায় থেকেও তিনি সাহিত্য-সংস্কৃতি, গবেষণা এবং রাজনৈতিক মতাদর্শিতা থেকে কখনও বিচ্ছিন্ন থাকেননি। ‘নাগরিক’ নামের মাসিক পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন দীর্ঘদিন। ভাষা-আন্দোলন নিয়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং নানামুখী গবেষণামূলক রচনা লিখেছেন। লিখেছেন অসংখ্য প্রবন্ধ-গবেষণা গ্রন্থ। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তার গবেষণা গ্রন্থগুলো কেবল দেশে নয়, ভারতেও সমান জনপ্রিয়। ভারত থেকে সম্মাননাসহ ট্যাগোর রিসার্স ইনস্টিটিউট তাকে রবীন্দ্রতত্ত্বাচার্য উপাধি দিয়েছে। বাংলা একাডেমির উদ্যোগে রবীন্দ্রজীবনী একটি খণ্ড তিনি লিখেছেন। সেটি প্রকাশিত হয়েছে এবং বাংলা একাডেমির ক্রমাগত অনুরোধেও শারীরিক অসুস্থতার জন্য লেখা সম্ভব হয়নি। লেখক-গবেষক হিসেবে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, রাষ্ট্রীয় একুশে পদকসহ অসংখ্য পদক-সম্মাননা তিনি পেয়েছেন।
রফিক ভাই অত্যন্ত সহজ-সরল একজন মানুষ ছিলেন। যেমন মানবিক তেমনই স্নেহপ্রবণ। তার অতি সাধারণ জীবনযাপন আমাদের জন্য অনুকরণীয় বলেই মান্য করি। পার্থিব লোভ-লালসা, অর্থ-বিত্তের মোহ তাকে কখনও পথভ্রষ্ট-আদর্শচ্যুত করতে পারেনি। সারাটি জীবন নির্লোভ-নির্মোহ জীবন কাটিয়েছেন। প্রায় আড়াই যুগ আগে স্ত্রী মারা গেছেন। নিঃসন্তান রফিক ভাইকে আগলে রেখেছেন দুজন নারী-পুরুষ। তারাই তাকে দেখভাল করেন। স্ত্রীর জীবদ্দশা থেকেই তারা দুজন তাদের পরিবারে যুক্ত হয়ে আছেন। ওই দুজনকে নিয়েই রফিক ভাই নিউ ইস্কাটনের ভাড়া বাসায় একটি সমতার পরিবারে বসবাস করছেন। ডাক্তার বলে নয়, সুদূর কৈশোর থেকেই অত্যন্ত নিয়মানুবর্তিতায় জীবনযাপন করেছেন। খাদ্যাভ্যাস হতে প্রতিটি ক্ষেত্রেই খুবই পরিমিত ছিল তার জীবনাচার। পরিণত বয়সেও তারুণ্যে ভাটা পড়েনি। বার্ধক্যজনিত রোগ-ভোগ পোহাতে হয়েছে। কিন্তু এতে তার কর্মস্পৃহা কখনও থেমে থাকেনি। নিয়মিত লিখেছেন, করেছেন গবেষণা। পড়াশোনাও নিয়মিত করতেন। জাতীয় ক্রান্তিলগ্নে প্রতিবাদীদের পাশে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদেও শামিল হয়েছেন। ১৯১৭ সাল ছিল অক্টোবর বিপ্লবের শতবর্ষ। বিশ্বব্যাপী অক্টোবর বিপ্লবের শতবর্ষ উদযাপিত হয়েছিল। আমাদের দেশেও সব বামপন্থী দলগুলোর সমন্বয়ে জাতীয়ভাবে উদযাপিত হয়েছিল। অক্টোবর বিপ্লব শতবর্ষ উদযাপন জাতীয় কমিটির তিনি এবং অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী যুগ্মভাবে আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া রফিক ভাই রবীন্দ্রনাথ ও বাংলা ভাষাকে সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে নিজের উপার্জিত সব অর্থের বিনিময়ে গড়ে তুলেছিলেন অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান।
আহমদ রফিকের জন্ম ১৯২৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। তিনি রাজধানীর নিউ ইস্কাটনে একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। তার স্ত্রী মারা গেছেন ২০০৬ সালে। তিনি নিঃসন্তান। আমাদের সবার অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার প্রিয় ব্যক্তিত্ব রফিক ভাই গত ২ অক্টোবর ইন্তেকাল করেন।
তার চিরবিদায়ে আমাদের গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।
মযহারুল ইসলাম বাবলা
নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত