গাজায় শান্তিচুক্তি
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১১ অক্টোবর ২০২৫ ১০:২০ এএম
গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তির খবর প্রকাশের পর ফিলিস্তিনি শিশুদের উল্লাস
যুদ্ধের নামে একতরফা বর্বরোচিত আক্রমণ, হত্যা ও পঙ্গুত্ববরণ, অনাহার ও উচ্ছেদের নিষ্ঠুর ইতিহাস রচিত হয়েছে যেখানেÑ অবশেষে সেই গাজায় বহুল প্রতীক্ষিত ও প্রত্যাশিত যুদ্ধবিরতি সম্পন্ন হলো। প্রস্তাবিত এই যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সম্মত হয়েছে হামাস ও ইসরায়েল। টানা দুই বছরেরও বেশি সময় সংঘাত, জিম্মি অবস্থা এবং ভয়াবহ প্রাণহানির পর শান্তির পথে এটা এক মানবিক পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে। ফলে ওই জনপদে আর কোনো রক্তপাত নয়, মানবতার জয়গান ধ্বনিত হোক। সাংবাদিক ও সমাজকর্মীরা গাজার বিভিন্ন স্থানে হেঁটে হেঁটে অন্ধকার রাতে, মোবাইল ফোনের বাতি জ্বালিয়ে মানুষকে শান্তিচুক্তির এই সংবাদ দিচ্ছেন। এমন খবরে গত বৃহস্পতিবার ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি জিম্মিদের পরিবারে নেমে আসে আনন্দের বন্যা। গাজার তরুণরা রাস্তায় নেমে আসে এবং স্লোগান দিয়ে নেচেগেয়ে উল্লাসে মেতে ওঠে। চুক্তি অনুযায়ী, ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস কয়েকদিনের মধ্যে তাদের কাছে থাকা জীবিত ২০ ইসরায়েলি জিম্মিকে মুক্তি দেবে। বিনিময়ে ইসরায়েল ফিলিস্তিনি বন্দিদের ছেড়ে দেবে। একই সঙ্গে ইসরায়েলি সেনারা গাজার অধিকাংশ এলাকা থেকে সরে যাওয়া শুরু করবে। আমরা এই যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে স্বাগত জানাই।
উল্লেখ্য, বহু বছর ধরে গাজা উপত্যকায় চলছে এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত। প্রতিনিয়ত নিহত হচ্ছে শিশু, নারী, বয়স্কসহ নিরীহ সাধারণ মানুষ। মানুষের ঘরবাড়ি-বিদ্যালয়-হাসপাতাল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে, মানবিক বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। উল্লেখ্য, গাজায় টানা দুই বছর ধরে চলা ইসরায়েলি বোমা হামলায় ২০ লাখেরও বেশি বাসিন্দার প্রায় সবাই বাস্তুচ্যুত হয়েছে। নৃশংস হামলায় ভূখণ্ডটিতে ৬৭ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সাম্প্রতিক সময়ে ঘোষিত শান্তিচুক্তি সারা বিশ্বের মানুষের মনে একটুখানি হলেও আশার আলো জ্বেলেছে।
১০ অক্টোবর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘মৃত্যু উপত্যকা গাজায় প্রাণের উচ্ছ্বাস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে জানা গেছে, তিন দিন ধরে মিসরের শার্ম আল শেখে কাতার, তুরস্ক, মিসর ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষের পরোক্ষ আলোচনার পর এই চুক্তিতে রাজি হয় হামাস-ইসরায়েল। ৮ অক্টোবর বুধবার, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজা নিয়ে প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনার প্রথম ধাপেÑ যুদ্ধবিরতি ও বন্দিবিনিময় চুক্তিতে সম্মত হয় ইসরায়েল ও হামাস। এই যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন বিশ্বনেতারা। একই সঙ্গে দুই পক্ষকেই শান্তি প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তনিও গুতেরেস ঘোষণা করেছেন, জাতিসংঘ চুক্তির ‘পূর্ণ বাস্তবায়নে’ সহায়তা করবে এবং গাজায় মানবিক সহায়তা ও পুনর্গঠন কার্যক্রম বাড়াবে। হামাস জানিয়েছে, যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে তারা একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে। এই চুক্তিতে গাজা থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর প্রত্যাহার এবং জিম্মি-বন্দি বিনিময়ের বিষয়গুলো আছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই চুক্তিকে ‘ইসরায়েলের জন্য একটি মহান দিন’ বলে অভিহিত করেছেন। এদিকে যুদ্ধ শেষ করার জন্য ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে চুক্তির খবরে গাজার ফিলিস্তিনিরা ও ইসরায়েলে জিম্মিদের পরিবারগুলো তীব্র উচ্ছ্বাস-আনন্দে উদযাপন করেছে। এ প্রসঙ্গে ট্রুথ সোশ্যালে ডোনাল্ড ট্রাম্প লিখেছেন, ‘ইসরায়েল ও হামাস উভয়েই আমাদের শান্তি পরিকল্পনার প্রথম পর্যায়ে স্বাক্ষর করেছে। এর অর্থ হলো খুব শিগগিরই সব জিম্মিকে মুক্তি দেওয়া হবে এবং ইসরায়েল নিজেদের সেনাদের নির্ধারিত একটি লাইনে সরিয়ে আনবে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানগণও এই চুক্তির পক্ষে তাদের সমর্থন ব্যক্ত করেছেন।
স্পষ্ট বুঝতে পারছি, এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্য হলো যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা এবং মানবিক সহায়তার পথ খুলে দেওয়া। ভুলে গেলে চলবে না, গাজায় চিকিৎসা, খাদ্য ও পানি সংকট এখন ভয়াবহ। এই মানবিক সংকট সবার আগে দূর করতে হবে। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আরব লীগসহ বিশ্বের বিভিন্ন শক্তি চাইছেÑ এই রক্তপাত যেন আর না বাড়ে। আমরা মনে করি, শুধু ঘোষণা নয়, এই ক্ষেত্রে চুক্তির দ্রুত বাস্তবায়ন ও পর্যবেক্ষণের শক্ত অবস্থান জরুরি। কারণ অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, গাজার শান্তিচুক্তি প্রায়ই ভঙ্গ হয়েছে, যার পরিণতি হয়েছে আরও ভয়াবহ যুদ্ধ ও গণহত্যা।
আমরা আরও মনে করি, ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায্য অধিকার, নিজ ভূমিতে স্বাধীনভাবে বসবাস ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটি যতদিন অনিশ্চিত থাকবে, ততদিন শান্তির শেকড় গভীরে গাঁথা সম্ভব নয়। ইসরায়েলি আগ্রাসন বন্ধ না হলে এবং অবরুদ্ধ গাজায় মানবিক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত না হলে, এই চুক্তিও অচিরেই ভঙ্গুর হয়ে পড়বে। অন্যদিকে হামাসসহ ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ সংগঠনগুলোকেও যুদ্ধের চেয়ে রাজনৈতিক সমাধানের পথে অগ্রসর হতে হবে। কারণ যুদ্ধ কখনও স্থায়ী শান্তি আনে নাÑ শুধু ক্ষোভ, প্রতিশোধ ও মৃত্যু বাড়ায়। এই সত্যটি সবাইকে উপলব্ধিতে নিতে হবে। না হলে এই শান্তির বার্তা বিফলে যেতে বাধ্য। মধ্যপ্রাচ্যে টেকসই একটি স্থায়ী শান্তি প্রক্রিয়া সচল করতে হলে দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের মাধ্যমে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র কায়েম করতে হবে। নচেৎ শান্তিচুক্তির টোটকা চিকিৎসা ও সাময়িক যুদ্ধবিরতি অচিরেই ভেঙে পড়বে।
সমগ্র বিশ্ব যেন এক অস্থির যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় মত্ত। গাজাসহ বিশ্বের সকল সংকটপ্রবণ এলাকায় অস্থিরতা জিইয়ে রেখে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। তাই সময় এসেছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় আরও দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার। শুধু সমবেদনা জানালে হবে নাÑ জাতিসংঘ ও শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোকে চুক্তি বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। বিগত সময়ে গাজায় যে ধ্বংসযজ্ঞ চলেছিল তা পুনর্গঠন, শিশুদের শিক্ষা, ওষুধ ও খাদ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করতে দরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। সেদিকে শান্তিপ্রিয় দেশগুলো নজর দেবেনÑ এই প্রত্যাশা আমাদের।
গাজার মানুষ শান্তি চায়, জীবন চায়, ভালোবাসা চায়। তারা আর রক্ত দেখতে চায় না। তাই আজকের এই মুহূর্তে বিশ্ববাসীর একটাই আহ্বানÑ আর গাজায় কোনো রক্তপাত নয়, শান্তিচুক্তি কার্যকর হোক। এবার মানবতা জিতুক।