তারেক রহমান
সাঈদ বারী, কলাম লেখক ও প্রকাশক
প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০২৫ ১০:৫৮ এএম
বিবিসি বাংলার সাম্প্রতিক দুই পর্বে সম্প্রচারিত সাক্ষাৎকারে দীর্ঘ দেড় যুগ পর প্রথমবারের মতো গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। লন্ডন থেকে অনলাইনে নেওয়া এই সাক্ষাৎকারটি শুধু একটি সংবাদঘটনা নয়Ñ এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী মুহূর্ত। কারণ প্রায় ষোলো বছর ধরে যার কণ্ঠ মিডিয়ায় শোনা যায়নি, যাকে নিয়ে প্রচারের ওপর ছিল আদালতের নিষেধাজ্ঞা, সেই মানুষটি হঠাৎ আবার জনসম্মুখে ফিরে এসেছেন পরিষ্কার ভাষায়, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কেন্দ্রে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে ফ্যাসিবাদের একচ্ছত্র আধিপত্য বিরাজ করেছে। বাকস্বাধীনতা, গণমাধ্যম, আদালত, প্রশাসনÑ সবখানেই দেখা গেছে নিয়ন্ত্রণ ও ভয়ের আবহ। এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের এই উপস্থিতি অনেকের কাছে এক ধরনের ‘প্রতিধ্বনি’, যা দমিয়ে রাখা রাজনৈতিক কণ্ঠের পুনর্জন্মের ইঙ্গিত বহন করে। হাইকোর্টের সেই রায়Ñ যেখানে বলা হয়েছিল, তার কোনো বক্তব্য প্রচার করা যাবে না, ছিল প্রকৃতপক্ষে একটি দমননীতির প্রতিফলন। সেই রায়ের পর তার কণ্ঠ জনপরিসরে অনুপস্থিত ছিল। কিন্তু সময় বদলেছে, রাজনীতির মঞ্চও পাল্টাচ্ছে, আর সেই পালাবদলের মুহূর্তে তার এই সাক্ষাৎকার যেন নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে দিল।
সাক্ষাৎকারের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তারেক রহমানের কণ্ঠে যে আত্মবিশ্বাস, সংযম ও কৌশল ধরা পড়েছে, তা তার রাজনৈতিক পরিপক্বতার প্রমাণ রাখে। তিনি বলেছেন, ‘যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে জনগণই’। একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই বাক্যটি শুধু রাজনৈতিক আহ্বান নয়Ñ এটি গণতন্ত্রের প্রতি আস্থার এক ঘোষণাপত্র। যাদের ধারণা ছিল বিএনপি এখনও পুরনো ধ্যানধারণার মধ্যে আটকে আছে, তাদের কাছে এই বক্তব্য নতুন ভাবনার দরজা খুলে দেবে।
তবে তারেক রহমানের বক্তব্যে সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় ছিলÑ তিনি ‘ব্যক্তি’ নয়, ‘জনগণ’কে কেন্দ্র করে রাজনীতির কথা বলেছেন। তার বক্তব্যে আরও একটি দিক বিশেষভাবে উজ্জ্বল, আর তা হলো দেশে ফিরে আসার অঙ্গীকার। তিনি স্পষ্ট বলেছেন, যুক্তিসংগত কারণেই এখনও দেশে ফেরেননি, কিন্তু সময় এসেছে, এবং তিনি শিগগিরই ফিরবেন। এই বাক্যটিই সামাজিক মাধ্যমে ঢেউ তুলেছে। সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে বিএনপির কর্মী-সমর্থকরাÑ এই ঘোষণায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। কারণ গত দেড় দশক ধরে ‘তারেক কি ফিরবেন?’Ñ এই প্রশ্নটাই ছিল বিএনপির রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। এখন সেই অনিশ্চয়তা যেন কিছুটা দূর হয়েছে।
তবে এই সাক্ষাৎকার শুধু আবেগের বিষয় নয়, এটি রাজনৈতিক বার্তা ও কৌশলের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি যখন বলেন যে, ‘যেকোনো সুষ্ঠু নির্বাচনে আমি নিজেকে বিরত রাখতে পারব না’ তখন এটি কেবল ভবিষ্যৎ নির্বাচনের প্রস্তুতির ইঙ্গিত নয়, বরং একটি নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের পূর্বাভাসও বটে। দেশের রাজনীতি বর্তমানে যে অচলাবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সেখানে তার এই মন্তব্য ক্ষমতাসীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলসমূহÑ উভয় পক্ষের জন্যই নতুন ভাবনার সূচনা করেছে।
এই সাক্ষাৎকারের পর থেকেই সোশ্যাল মিডিয়া, টকশো এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। অনেকে বলছেন, এই একটি সাক্ষাৎকারেই তারেক রহমান জনমানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছেন, আবার কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেনÑ তিনি কি বাস্তব নীতিনির্ধারণে ততটাই প্রস্তুত, যতটা বক্তৃতায় আত্মবিশ্বাসী?
সমালোচকরা বলছেন, সাক্ষাৎকারে তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু স্পষ্টভাবে বলেননিÑ যেমন দুর্নীতি, প্রশাসন সংস্কার, অর্থনৈতিক নীতি, কিংবা বিচারব্যবস্থার সংস্কার। তবে এখানে একটি বাস্তবতা রয়েছেÑ দীর্ঘদিন নির্বাসনে থেকে হঠাৎ গণমাধ্যমে ফিরে এসে সবকিছু বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয়। বরং তিনি যে রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা দিয়েছেনÑ গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, জনগণের অধিকার তা এখনকার প্রেক্ষাপটে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
বিবিসি বাংলাÑ এই সাক্ষাৎকারের প্লাটফর্ম হিসেবেও যথেষ্ট আলোচিত হয়েছে। কেউ বলেছেন, আন্তর্জাতিক মিডিয়া হিসেবে এটি একটি নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য জায়গা, তাই তারেক রহমানের জন্য এটি ছিল উপযুক্ত মঞ্চ। আবার কেউ বলছেন, সাক্ষাৎকারে আরও কঠিন, সমালোচনামূলক প্রশ্ন আসতে পারত। কিন্তু যে বিষয়টি অস্বীকার করার উপায় নেই, তা হলোÑ দীর্ঘদিনের নীরবতার পর এটাই তার সবচেয়ে স্পষ্ট ও ভারসাম্যপূর্ণ যোগাযোগ, যা রাজনীতির জমাটবাধা পরিস্থিতিতে এক ধরনের নতুন প্রাণসঞ্চার করেছে।
এই সাক্ষাৎকারের আরেকটি তাৎপর্য হলোÑ এটি বিএনপির ভেতরকার স্থবিরতাকে ভেঙে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে নেতাকর্মীরা একধরনের নেতৃত্বশূন্যতায় ভুগছিলেন। তার কণ্ঠস্বর সেই শূন্যতা কিছুটা পূরণ করেছে। অনেকেই বলছেন, তার এরকম আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উপস্থিতিই দলের মনোবল ফিরিয়ে এনেছে। বিএনপির রাজনীতি আবারও প্রাণ ফিরে পাচ্ছে, আর সেটির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন তারেক রহমান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সাক্ষাৎকারটি বাংলাদেশের ক্ষমতার ভারসাম্যে একটি মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন এনেছে। একসময় যাকে ‘নিষিদ্ধ’ ঘোষণা করা হয়েছিল, আজ তাকে ঘিরে নতুন আলোচনার ঢেউ উঠেছে। এটাই রাজনীতির অদ্ভুত বাস্তবতাÑ যে কণ্ঠ একসময় নিঃশেষ করার চেষ্টা করা হয়, সেই কণ্ঠই পরবর্তীকালে হয়ে ওঠে পরিবর্তনের প্রতীক।
তারেক রহমানের এই সাক্ষাৎকার প্রমাণ করেছে, বাংলাদেশের রাজনীতি এখন আর একমুখী নয়। জনগণ এখন শোনে, বিচার করে, এবং অপেক্ষা করে বিকল্পের। এই বিকল্প হয়ে উঠতে হলে তার সামনে রয়েছে দীর্ঘপথ, তবে শুরুটা নিঃসন্দেহে জোরালো হয়েছে।
তারেক রহমানের কণ্ঠের পুনর্জাগরণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন প্রতিশ্রুতির জন্ম দিয়েছে। এই সাক্ষাৎকারে তিনি যে ভদ্র, সংযত, কিন্তু আত্মবিশ্বাসী সুরে কথা বলেছেন, তা মনে করিয়ে দেয়Ñ নেতৃত্ব মানে কেবল ক্ষমতা নয়, বরং দায়িত্ব, ত্যাগ ও জনগণের প্রতি অঙ্গীকার। এখন সময় বলে দেবে, এই সাক্ষাৎকার একটি সাময়িক মিডিয়া ঘটনা হয়ে থাকবে, নাকি হয়ে উঠবে রাজনৈতিক নবযুগের সূচনা।