× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পর্যবেক্ষণ

কানাডায় বাংলা ভাষা চর্চা এখন অনন্য উচ্চতায়

নিরঞ্জন রায়

প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০২৫ ১০:৫৩ এএম

কানাডায় বাংলা ভাষা চর্চা এখন অনন্য উচ্চতায়

বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন পেশার পরিচিত লোকজন টরন্টো শহরে বেড়াতে এলে তাদের অনেককেই আমার বাসায় নিয়ে আসি কিছুটা একান্ত সময় কাটানো, বাংলাদেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাত নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা এবং কিছু অতীত স্মৃতি রোমন্থনের উদ্দেশ্যে। এরকম আমন্ত্রণ যে আমি একা করি তেমন নয়। কানাডার বাংলাদেশিদের মধ্যে একটা ভালো প্রবণতা আছে যে বাংলাদেশ থেকে পরিচিত কেউ এলে, তাকে আমন্ত্রণ করে বিশাল অট্টালিকাসম বাড়িতে এনে হরেকরকম বাংলাদেশি খাবার রান্না করে আপ্যায়ন করা এবং দামি গাড়িতে নিয়ে মহাসড়ক দিয়ে উচ্চগতিতে গাড়ি চালিয়ে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে নিয়ে যাওয়া। অনেকে আরও একধাপ এগিয়ে দামি কোনো রেস্টুরেন্টে নিয়েও আপ্যায়ন করে থাকেন। আমি অবশ্য এর কোনো কাতারেই পড়ি না। কেননা আমার বিশাল আকৃতির বাড়িও নেই এবং নেই কোনো দামি গাড়ি। আর রেস্টুরেন্টের খাবার বরাবরই আমার কাছে অর্থের অপচয় মনে হয় এবং সেখানে মন খুলে কথাও বলা যায় না। আমি যেহেতু কথার পাগল, তাই বাংলাদেশি কাউকে পেলে তার সঙ্গে অতীত স্মৃতি রোমন্থন এবং নিজের পেশার বিষয় নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ হাতছাড়া করতে চাই না। আর এ কারণেই আমি অতিথিদের আমার গরিবালয়ে নিয়ে এসে কথা বলার চেষ্টা করি। 

যারাই আমার বাসায় এসেছেন, তাদের অধিকাংশ মন্তব্য করেছেন এভাবে ‘আপনার বাসায় বসে কথা বলা, আর ঢাকার কোনো বাসায় বসে কথা বলার মধ্যে তেমন পার্থক্য নাই’। আমি যখন জানতে চাই যে কেন আপনাদের এমন ধারণা হলো তখন তারা উত্তর দেন এভাবেÑ ‘দেখেন, আপনার বাসায় চতুরদিকে বাংলা বইপুস্তক, সারাক্ষণ বাংলায় কথাবার্তা, সব সময় চলছে বাংলাদেশি টেলিভিশন চ্যানেল, খাবারে থাকছে কাচকি মাছের চচ্চড়ি আর মসুরের ডাল, বাগানে বাংলাদেশি শাকসবজি এবং সব সময় ফোনে বাংলায় কথা হচ্ছে, তাও আবার অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বসবাসরত বিভিন্নজনের সঙ্গে। ঢাকার একটি বাসার জীবনযাত্রা এরকমই’। জানি আমার সেই পরিচিত ব্যক্তিরা আমাকে একটু বেশি পছন্দ করেন, তাই তারা আমার বাসার বাংলা চর্চাকে অতিরঞ্জিত করে বলেছেন। কিন্তু আমার বিষয়টি অতিরঞ্জিত মনে হলেও উত্তর আমেরিকার বিশাল এই দেশ, কানাডায় এখন যে মাত্রার বাংলা ভাষার চর্চা হয়, তা কিন্তু মোটেই অতিরঞ্জিত নয়। 

কানাডায় আমরা নিজেরা যেমন ভালো বাংলা ভাষার চর্চা করতে পারি, তেমনি আমাদের পরবর্তী প্রজন্মেরও বাংলা চর্চার পর্যাপ্ত সুযোগ আছে এবং তারা সেটা করছেও। কানাডার যে শহরে আমি বসবাস করি, সেটি অন্যতম একটি বৃহৎ বাণিজ্যিক নগরী। টরন্টো, যা একটি বহু সংস্কৃতির নগরী বা মাল্টি কালচারাল সিটি হিসেবেও পরিচিত। এই শহরে বিশ্বের বহু দেশের বহু ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষ বসবাস করে এবং স্বাচ্ছন্দ্যে তাদের নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চা করতে পারে। এমনকি সরকারিভাবে এখানে বহু ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চা উৎসাহিত করা হয়। ফলে অন্যান্য ভাষা ও সংস্কৃতির মতো বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চার সুযোগ পর্যাপ্ত আছে এই টরন্টো শহরে। এখান থেকে তিন চারটি বাংলা পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশিত হয় এবং আছে একাধিক বাংলা টেলিভিশন চ্যানেল। এ ছাড়া বাংলাদেশি কমিউনিটির বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপলক্ষে আছে অনেক প্রকাশনা। এসব প্রকাশনায় কানাডায় বসবাসরত বাংলা ভাষাভাষী লোকজনই লিখে থাকেন। 

এই শহরে আছে ব্যক্তি মালিকানায় পরিচালিত বেশ কয়েকটি নাচের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং গান, আবৃত্তি ও অভিনয় শেখার স্থান। এসব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র পরিচালনা করেন বাংলাদেশের অনেক গুণী শিল্পী। এমনকি সাহিত্য, বিশেষ করে বাংলাসাহিত্য চর্চার যথেষ্ট সুযোগ হয়েছে এই টরন্টো শহরে। এখানে বেশ কয়েকজন লেখক, কবি-সাহিত্যিক এবং গবেষক আছেন, যেমন সুব্রত দাস, সুজিত কুসুম পাল, চয়ন দাস এবং আরও অনেকে, যারা নিবেদিতভাবে কানাডায় সাহিত্য চর্চার কাজটি এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। এই কাজে অবশ্য নেতৃত্বের ভূমিকায় আছেন সাহিত্যিক এবং গবেষক সুব্রত দাস। তাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় কানাডায় এখন বাংলা সাহিত্য চর্চা এক নতুন মাত্রা লাভ করেছে, যার প্রমাণ মিলল গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত কানাডা সাহিত্য উৎসবে বাংলা ভাষার লেখকদের সফল অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে।

গত তিন থেকে পাঁচই অক্টোবর টরন্টো সংলগ্ন মিসিসাগার সেলিব্রেশন সেন্টারে তিন দিনব্যাপী কানাডা সাহিত্য উৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। ইন্ডো-কানাডা আর্টস কাউন্সিলের সহযোগিতায় বহু ভাষা ও বহু সাংস্কৃতিক এই আয়োজনে কানাডার মূল ধারার সাহিত্যিকের পাশাপাশি বিশ্বের এক ডজনেরও অধিক ভাষার কবি-সাহিত্যিক ও লেখক এই অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন, যাদের মধ্যে রাসকিন বন্ড, আনা ইন, অজয় বিসারিয়া, শচীন বিলগাওনকারের মতো বিখ্যাত ব্যক্তিরাও ছিলেন। ভাষা সাহিত্যের ক্ষেত্রে এরকম একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে বাংলা ভাষার ১৭ জন কবি, সাহিত্যিক ও লেখক অংশ নিয়েছিলেন, যার নেতৃত্ব দিয়েছেন সুব্রত কুমার দাস। বাংলা ভাষার পর্বটি ছিল ৪ অক্টোবর এবং মোট চারটি অংশে অনুষ্ঠানটি সাজানো হয়েছিল, যেখানে ছিল ‘কানাডার বাঙালি লেখক, বাঙালি কবিদের স্বরচিত কবিতা পাঠ, বাঙালিদের কাছে কানাডার সাহিত্য এবং অভিবাসী লেখকের চ্যালেঞ্জ। এরকম অনুষ্ঠানে বাংলা ভাষার লেখকদের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার চর্চা কানাডার মূলধারার সাহিত্য চর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পেরেছে, যা অন্যতম একটি বড় অর্জন।

কানাডায় বাংলা ভাষা চর্চার এই যে সফলতা এটি মোটেই এক দিনে হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করার ফলেই এভাবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলা ভাষার প্রসার ঘটছে। বিশেষ করে, কানাডায় বাংলাসাহিত্য চর্চার সুযোগ এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সুব্রত দাসের উল্লেখযোগ্য অবদান আছে। তিনি নিজে একজন সাহিত্যিক, লেখক এবং গবেষক হলেও তার ভূমিকা শুধুমাত্র নিজের লেখালেখির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি, যেমনটা আমরা অনেকেই করেছি। তিনি কানাডায় বাংলা সাহিত্য চর্চা এবং বাংলায় লেখালেখির বিষয়টা সবার বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছেন এবং এখনও করে চলেছেন। তিনি কানাডায় বাংলা সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে যে কাজটা অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে করতে পেরেছেন, তা হচ্ছে বাংলা সাহিত্য এবং কানাডার মূলধারার সাহিত্যের মধ্যে একটি সেতুবন্ধ রচনা। এই সেতুবন্ধের ওপর ভিত্তি করে বাংলা সাহিত্য অনেক দূরে এগিয়ে যেতে পারবে। আমাদের আছে বিশাল এবং সমৃদ্ধ এক সাহিত্য ভান্ডার, যা সঠিক সেতু ও পথে পেলে দ্রুতই এগিয়ে যাবে। কাজটা সুব্রত দাস যে একা করছেন তেমন নয়। তার সঙ্গে যুক্ত থেকে অবদান রাখছেন আরও কয়েকজন কবি, সাহিত্যিক, যাদের অনেককে আমি চিনি এবং তারা হলেন সুজিত কুসুম পাল, শেখর গোমেজ, চয়ন দাস। মূলত সুব্রত দাসের নেতৃত্বে একটি টিম এই কাজটি করে যাচ্ছে। 

আমার নিজেরও এই কানাডা সাহিত্য উৎসবে অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়েছিল। আমি সাধারণত বাঙালিদের আয়োজিত কোনো অনুষ্ঠানে যেতে চাই না। কারণ অনুষ্ঠানগুলো এতই অগোছালো, এলোমেলো এবং একেবারেই অপরিকল্পিতভাবে আয়োজন করা হয়, যা রীতিমতো বিরক্তির কারণ। বিশেষ করে, সময় জ্ঞান তো একেবারেই থাকে না। সেদিক থেকে এই অনুষ্ঠানটি ছিল একেবারেই ব্যতিক্রম। একদম গোছানো এবং সুপরিকল্পিতভাবে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। সময়ের ব্যাপারে তো একেবারে শতভাগ নিয়মানুবর্তিতা অনুসরণ করা হয়েছে। চার পর্বে তিনজন করে আলোচক প্রতি পর্বে এবং সঞ্চালকসহ মোট ১৭ জন কথা বলেছেন একেবারে বেঁধে দেওয়া নির্ধারিত সময়ের মধ্যে, যা এক কথায় অসাধারণ। অনুষ্ঠান আয়োজনের ওপর কতটা দখল থাকলে এভাবে সময়মতো সব আলোচনা শেষ করা যায়, তা এই অনুষ্ঠানে প্রমাণিত হয়েছে। শুধু তাই নয় কানাডার মূলধারার আয়োজনে এরকম একটি অনুষ্ঠান আয়োজনে যে মাত্রার পেশাদারত্বের পরিচয় দেওয়া হয়েছে, তা নিঃসন্দেহ প্রশংসার দাবিদার। সুব্রত দাস শুধুমাত্র একজন সাহিত্যিক ও গবেষকই নম, সেই সঙ্গে তিনি যে একজন দক্ষ অনুষ্ঠান আয়োজক, তাও তিনি প্রমাণ করেছেন।

সুব্রত দাসের সফল নেতৃত্বে যে টিম কানাডায় বাংলা ভাষা এবং সাহিত্য চর্চার বিষয় নিয়ে কাজ করছেন তাতে তাদের প্রচেষ্টায় বাংলা সাহিত্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভালো জায়গা করে নিতে পারবে এবং বেশ পরিচিতি লাভ করবে। এই কাজে অনেক চ্যালেঞ্জ আছে। কিন্তু চ্যালেঞ্জের চেয়ে সুযোগ এবং স্কোপ অনেক বেশি আছে। বাংলা ভাষায় যে সমৃদ্ধ সাহিত্য ভান্ডার আছে, তাকে কীভাবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ছড়িয়ে দেওয়া যায় সেই প্রচেষ্টা গ্রহণ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে, আমাদের ভালো কিছু সাহিত্যকর্ম ইংরেজিতে অনুবাদ করে প্রকাশ করতে পারলে আন্তর্জাতিক পাঠকদের মাঝে সবচেয়ে ভালো সাড়া পাওয়া যাবে। এখন তো বাংলাদেশি অনেক কবি, সাহিত্যিকেরই বাংলা এবং ইংরেজি, দুই ভাষাতেই সমান পারদর্শিতা আছে। তাদের কাজে লাগাতে পারলে এই কাজটি খুব সহজে সম্পন্ন করা সম্ভব। প্রথমদিকে নিজেদের অর্থ দিয়ে এই কাজটি শুরু করে কিছুদূর এগিয়ে নিতে পারলে, পরবর্তীতে এটি ভালো লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হতে পারে। প্রথমদিকের কাজের জন্য বাংলাদেশ সরকার বা বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের সহযোগিতা লাগবে। বিষয়টি কীভাবে সম্ভব, তা ব্যাখ্যা করতে গেলে বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন, যার সুযোগ এখানে নেই। নিঃসন্দেহে কানাডায় বাংলা ভাষা এবং সাহিত্য চর্চা এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। তাই এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। 

  • সার্টিফাইড অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা