অ্যানথ্রাক্স
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০২৫ ১০:২৮ এএম
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় অ্যানথ্রাক্স রোগের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে নতুন শঙ্কা তৈরি হয়েছে। গবাদিপশুর পাশাপাশি মানুষও আক্রান্ত হচ্ছে এই রোগে। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকজন আক্রান্ত ঘটনায় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। রংপুরে রোগটির আতঙ্ক চরম আকার ধারণ করেছে। এই রোগে সেখানে ইতোমধ্যে দুজন প্রাণ হারিয়েছেন। আক্রান্ত শতাধিক ব্যক্তি। চিকিৎসা না পেয়ে পশুমৃত্যুর পাশাপাশি ভোগান্তিতে পড়েছে রোগীরাও। স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে রোগীরা উন্নত চিকিৎসা না পেয়ে হিমশিম খাচ্ছে। অনেকে বাধ্য হয়ে বাড়িতে বসেই চিকিৎসা নিচ্ছেন, যা উদ্বেগজনক। স্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, অ্যানথ্রাক্স মূলত ব্যাসিলাস অ্যানথ্রাসিস নামের এক ধরনের ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়ে থাকে, যা মৃত বা আক্রান্ত পশুর সংস্পর্শে এলে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। সাধারণত এটি চামড়া, ফুসফুস ও অন্ত্রের মাধ্যমে সংক্রমিত হয় এবং দ্রুত চিকিৎসা না পেলে প্রাণহানির কারণ হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যেসব প্রাণী জাবর কাটে, যেমন- গরু, ছাগল, ভেড়া এই রোগে বেশি আক্রান্ত হয়। অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু ছোট গুটি আকারের, যেটিকে স্পোর বলে। এই স্পোর মাটিতে অনুকূল পরিবেশে অনেক বছর টিকে থাকতে সক্ষম। সুস্থ গবাদিপশু ঘাস খেতে মাঠে গেলে সেখানে অ্যানথ্রাক্সের স্পোর মুখের মাধ্যমে অনুপ্রবেশ করে। এভাবে গবাদিপশু অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়। অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত প্রাণীর সংস্পর্শে গেলে মানুষও আক্রান্ত হয়। বিশেষজ্ঞরা আরও বলেছেন, পশুর নিয়মিত টিকা না দেওয়া, মৃত পশুর দেহ যথাযথভাবে না পুঁতে ফেলা, মাংস বিক্রিতে অনিয়ম এবং জনসচেতনতার ঘাটতির কারণে এ সংক্রমণ বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রেই মৃত বা অসুস্থ পশুর জবাই করা মাংস খেলে বাড়ে ভয়াবহতা।
আমাদের দেশে অ্যানথ্রাক্স রোগে আক্রান্তের ঘটনা নতুন নয়। প্রতিবছরই এই রোগে আক্রান্তের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। বিশেষ করে, বর্ষার শেষভাগে অঞ্চলভেদে এই রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। প্রতিবারই সরকার তথা সংশ্লিষ্টদের তরফে মানুষকে সতর্ক করা হয়। তবে আশার কথা, এবার এই রোগের বিস্তার রোধ ও নিয়ন্ত্রণে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর জরুরি ও সমন্বিত কার্যক্রম শুরু করেছে। অধিদপ্তর সবাইকে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দিয়েছেন, যা অত্যন্ত সময়োপযোগী।
এ কথা সত্য যে, অ্যানথ্রাক্স রোগ সম্পর্কে সাধারণ মানুষ এখনও খুব বেশি অবহিত নন। ফলে প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দিলেও অনেকেই গুরুত্ব দেন না বা ভুল চিকিৎসা নেন। এর ফলে রোগের জটিলতা বাড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে তা অক্ষমতা বা জীবনহানির কারণ হয়ে ওঠে। পরিসংখ্যান বলছে, দেশে এই রোগে আক্রান্ত অধিকাংশ রোগীর বয়স ২৫ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে, যা কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মধ্যে উদ্বেগজনক প্রবণতা নির্দেশ করে। চিকিৎসাবিদরা বলছেন, অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে সচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিক পর্যায়ে সঠিক পরীক্ষা ও চিকিৎসা পেলে রোগটি সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। কিন্তু দেশে সরকারি হাসপাতালগুলোতে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের অভাব, আধুনিক যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতা এবং গ্রামীণ এলাকায় রোগ নির্ণয়ের সীমিত সুযোগের কারণে চিকিৎসা জটিল হয়ে পড়ছে।
আমরা মনে করি, এমন পরিস্থিতিতে সরকারের উচিত অ্যানথ্রাক্স রোগ বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে গবেষণা ও তথ্যসংগ্রহ শুরু করা। একই সঙ্গে গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোর মাধ্যমে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। এখন প্রয়োজন দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরকে আক্রান্ত এলাকায় জরুরি টিকাদান অভিযান চালাতে হবে। স্থানীয় প্রশাসনকে মৃত পশু নিধন ও মাটি চাপা দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে। স্বাস্থ্য বিভাগকে আক্রান্ত মানুষদের চিকিৎসায় বিশেষ টিম গঠন করতে হবে। পাশাপাশি গণমাধ্যম ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে গ্রামীণ জনগণকে সচেতন করতে হবে যে, আক্রান্ত পশুর মাংস খাওয়া বা ছোঁয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক। মৃত পশুর মাংস খাওয়া বা বিক্রি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন ও প্রাণিসম্পদ দপ্তরকে একযোগে কাজ করে পশুর টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে গণমাধ্যমে প্রচারণা বাড়ানো জরুরি। শুধু তাই নয়, যেসব এলাকায় সংক্রমণ বাড়ছে, সেখানে দ্রুত ভেটেরিনারি টিম পাঠানো, আক্রান্ত পশু নিধন ও নিরাপদে মাটি চাপা দেওয়া নিশ্চিত করতে হবে। মানুষ আক্রান্ত হলে তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসা শুরু করা জরুরি। আমাদের বিশ্বাস, সরকার ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ যদি দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেয় তবে অ্যানথ্রাক্সের বিস্তার রোধ করা সম্ভব।
আসলে অ্যানথ্রাক্স কেবল গবাদিপশুর রোগই নয়, এটি মানুষের জীবন ও দেশের অর্থনীতির সঙ্গে প্রভাবভুক্ত। গবাদিপশুর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে চাষিদের ক্ষতি হয়, মাংসের বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। তাই এখনই যদি সরকার, চিকিৎসক ও জনগণ একসঙ্গে উদ্যোগ নেয়, তবে এ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। আমরা মনে করি, সচেতনতা ও সময়মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাই পারে এর ভয়াবহতা রোধ করতে। আমরা বলব, অ্যানথ্রাক্স নিয়ে আতঙ্ক নয়, সতর্ক ও সচেতন হওয়া জরুরি। এর জন্য স্বাস্থ্য বিভাগ এবং প্রাণিসম্পদ বিভাগকে এগিয়ে আসতে হবে। এখানে সময়ক্ষেপণের কোনো সুযোগ নেই।