× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পুলিশ সংস্কার কমিশন

নিরাপদ বাংলাদেশের নিশ্চয়তায় পুলিশ পুনর্গঠিত হোক

সম্পাদকীয়

প্রকাশ : ০৯ অক্টোবর ২০২৫ ১০:০৪ এএম

নিরাপদ বাংলাদেশের নিশ্চয়তায় পুলিশ পুনর্গঠিত হোক

বিগত সময়ে দেশে ফ্যাসিবাদী কাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা ছিল পুলিশের। মুক্তিযুদ্ধে অজস্র প্রাণদানে অর্জিত বাংলাদেশ সেই ধারায় ‘পুলিশি রাষ্ট্রে’ পরিণত হয়েছিল। মানুষের নিরাপত্তার বদলেতাদের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল দমন, পীড়ন, নির্যাতনের মাধ্যমে সরকারের সকল বিরোধিতা স্তব্ধ করা। সরকারের হুকুমে জনগণের সেবক না হয়ে শাসক হয়ে উঠেছিল গুরুত্বপূর্ণ এই সংস্থাটি। অনেকেই সরকারি চাকরির শর্ত ভঙ্গ করে আবির্ভূত হয়েছিল রাজনৈতিক কর্মীর ভূমিকায়। ফলে দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষের ক্ষোভ, ক্রোধ ও ঘৃণার পাত্রে পরিণত হয় পুলিশ। জুলাই ছাত্র-গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা ছিল সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এ সংস্থাটিতে আমূল সংস্কার হবে। সংস্কারের মধ্য দিয়ে পুলিশি রাষ্ট্র থেকে বের হয়ে আসবে বাংলাদেশ। সেই বাস্তবতায়, ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে অন্তর্বর্তী সরকার ‘পুলিশ সংস্কার কমিশন’ গঠন করে। ৯ সদস্যের এই কমিশনের প্রধান ছিলেন সাবেক সচিব সফিকুল হক। কমিশন পুলিশের কার্যক্রম, আইন ও প্রযুক্তিনির্ভর সংস্কারসহ বিভিন্ন সুপারিশ গঠনের দায়িত্ব পান।  উল্লেখ্য, গত বছরের গণ-আন্দোলনের মধ্যে সারা দেশেই পুলিশ সদস্যরা এবং তাদের স্থাপনাগুলো ব্যাপক মাত্রায় জনরোষের শিকার হয়। সে সময় দায়িত্বরত অবস্থায় প্রাণ হারান ৪৪ পুলিশ সদস্য।

দীর্ঘ যাচাই-বাছাই শেষে কমিশন গত ১৫ জানুয়ারি সংস্কারের প্রস্তাব, সুপারিশসহ একটি প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেয়। এতে পুলিশকে সকল ধরনের প্রভাবমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে ১০৮টি সুপারিশ রয়েছে। প্রতিবেদনটিতে একটি স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনেরও সুপারিশ করা হয়েছে, যা পুলিশকে সরাসরি পরিচালনা করবে। সুপারিশে পুলিশের নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি বাড়াতে জোর দিয়ে পৃথক পুলিশ কমিশন গঠনসহ বলপ্রয়োগ, আটক, গ্রেপ্তার ও জিজ্ঞাসাবাদে আমূল পরিবর্তন আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী ও সাক্ষী সুরক্ষায় আইন প্রণয়ন এবং র‍্যাবের প্রয়োজনীয়তা পুনর্মূল্যায়নের সুপারিশ করা হয়। ৩৫২ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ১৪টি সুপারিশ করে কমিশন। কিন্তু সুপারিশ হস্তান্তরের প্রায় ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও পুলিশ সংস্কারে গণমানুষের সে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। বরং বেড়েছে হতাশা এবং শঙ্কা। কেউ কেউ মনে করেন এ মুহূর্তে পুলিশের সংস্কারের বিষয়টি অন্তর্বর্তী সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় নেই। কারণ সুপারিশ বাস্তবায়নের কাজ চলছে খুবই মন্থরগতিতে। 

উল্লেখ করা প্রয়োজন, পুলিশ ব্যবস্থার কাঠামো, নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, জবাবদিহিতা ও পেশাদারত্ব নিয়ে সমালোচনা দীর্ঘদিনের। যে কারণে ১৮৬১ সালের পুলিশ আইন, ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধি এবং ১৯৪৩ সালের পিআরবি (পুলিশ রেগুলেশন অব বেঙ্গল) যুগোপযোগী করার কথা বারবার বলা হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে ১৯৭৮, ২০০৩ ও ২০১২ সালে গঠিত বিভিন্ন পুলিশ কমিশন সংস্কারে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশের কথা শোনা গিয়েছিল। কিন্তু সুপারিশগুলো যেই তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই রয়ে গেছে। বর্তমান কমিশন বলছে, এ আইনগুলোতে মানবাধিকার সুরক্ষার ধারা যুক্ত করতে হবে। 

৮ অক্টোবর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘পুলিশ কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন কতদূর’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এই প্রশ্নেরই অবতারণা হয়েছে। প্রতিবেদনে পুলিশ সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনায় দেখা যায়Ñ মানবাধিকার সুরক্ষা থেকে শুরু করে আধুনিক ফরেনসিক সুবিধা স্থাপন, নৌপথে অপরাধ দমন, নারী পুলিশ নিয়োগ ও জিপিএস ট্র্যাকিং ব্যবহারের মতো কয়েকটি ক্ষেত্রে কিছু দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু হেল্পলাইন চালু, ভাসমান থানা গঠন কিংবা এফআইআর-বহির্ভূত গ্রেপ্তার রোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলো কার্যকর হয়নি। কমিশনের একাধিক সভা, প্রতিবেদন ও প্রস্তাব যেন কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। মানবাধিকার ব্যক্তিত্ব ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ডা. আবু তোহা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেছেন, সংস্কারের মূল লক্ষ্য হলো পুলিশকে জনবান্ধব ও জবাবদিহিতামূলক করা। কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলেও রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া পূর্ণ সংস্কার সম্ভব নয়। তিনি মনে করেন, জনবান্ধব পুলিশিং নিশ্চিত করতে শুধু সিদ্ধান্ত নয়, কার্যকর বাস্তবায়নই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

আসলে পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা বৃদ্ধিতেও সংস্কার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সংস্কারের মাধ্যমে আইনের সঠিক প্রয়োগ হলে জনগণের মৌলিক অধিকার সুরক্ষার পথ সুগম হবে। তবে এ সংস্কার কার্যক্রমে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সরকারের মহল বিশেষের সদিচ্ছা। অথচ সংস্কারের জন্য সদিচ্ছা ও সমর্থন অপরিহার্য। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ঐকমত্য ও অঙ্গীকারের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা মনে করি, এসব নিশ্চিত করা গেলে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি জনমুখী, জবাবদিহিমূলক, দক্ষ ও নিরপেক্ষ পুলিশি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সম্ভব হবে। পুলিশ সংস্কার কমিশনের সুপারিশ যে একেবারে চাপা পড়ে গেছে তা আমরা বলছি না, তবে সুপারিশগুলো বাস্তবায়নেও কোনো তৎপরতা লক্ষ করছি না। এটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা না করলে আগামীতেও আমরা প্রত্যাশিত জনবান্ধব পুলিশিং ব্যবস্থা পাব না।

তাই সময় এসেছে প্রভাবমুক্ত হয়ে পুলিশ কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের। সুপারিশ অনুযায়ী স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন এবং জনসম্পৃক্ত পুলিশিং ব্যবস্থা জরুরি। এসব পদক্ষেপ ছাড়া জনগণের আস্থা ফেরানো সম্ভব নয়। বাংলাদেশ অগ্রগতির পথে এগোচ্ছে; কিন্তু পুলিশের মতো দায়িত্বশীল প্রশাসনিক কাঠামো যদি ঔপনিবেশিক মানসিকতায় থেকে যায়, তবে সেই অগ্রগতি টেকসই হবে না। তাই এখনই সময়Ñ পুলিশ কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক সাহস দেখানোর। আমরা মনে করি, একটি স্বাধীন, দক্ষ, মানবিক পুলিশ বাহিনী গঠনই হবে সত্যিকারের নিরাপদ বাংলাদেশের নিশ্চয়তা।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা