মৎস্য খাত
সাদেকুর রহমান
প্রকাশ : ০৮ অক্টোবর ২০২৫ ১১:২১ এএম
বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। কৃষি খাতের অন্যতম উপখাত হলো মৎস্য খাত। মাছে-ভাতে বাঙালি হিসেবে এই জনপদের মানুষ পরিচিত। এই দেশে জালের মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অসংখ্য নদী। বেশিরভাগ নদীর উৎস হলো হিমালয় পর্বত। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও নদী রক্ষা কমিশনের তথ্যানুযায়ী, দেশে মোট নদ-নদী রয়েছে ১,১৯৪টি। নদীগুলো যেসব স্থান দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে, সেসব এলাকায় প্রচুর মাছের দেখা পাওয়া যায়। মাছের বৈচিত্র্য অনুসারে নামের ভিন্নতা ও লক্ষ্য করা যায়। এসব মাছ এলাকার মানুষের প্রোটিনের চাহিদা পূরণ করে।
বাংলাদেশের প্রাচীন জনপদ হলো নরসিংদী জেলার উয়ারী-বটেশ্বর। এই জনপদের বিভিন্ন রৌপ্য মুদ্রায় বিভিন্ন জাতের মাছের প্রতীক পাওয়া যায়। এগুলোর সময়কাল বলা হয়ে থাকে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ থেকে প্রথম শতক। শুধু তাই নয়, মহাস্থানগড় ও সোমপুর বিহারের বিভিন্ন রৌপ্য মুদ্রায় ও বিভিন্ন ধরনের মাছের প্রতীক পাওয়া যায়।
সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা আমাদের এই বাংলাদেশ। একসময় এই দেশে পুকুর ভরা মাছ ছিল। সাধারণ মানুষের খাবার নিয়ে আলাদা করে চিন্তা করতে হতো না। চাইলেই মাছ খাওয়ার ইচ্ছে পূরণ হতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুর পরিবর্তন হয়ে গেছে। কিছুদিন আগেও নিম্নবিত্তের মানুষ চাইলেই মাছ খেতে পারত না। কারণ বাজারে এত পরিমাণ মাছের জোগান ছিল না। তাদের এই চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে মৎস্য খাতের অভাবনীয় সাফল্য। একসময় এই দেশে প্রকৃতির ওপর নির্ভর করেই মাছ চাষ করা হতো। মানুষের মধ্যে এই ধারণা ছিল যে, মাছ চাষ করে খেতে হবে না। প্রকৃতিগতভাবেই মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। এই দেশের মৎস্য খাতের সঠিকভাবে ব্যবহার দেশের মানুষের জীবনকে করে তুলেছে সুন্দর ও সাবলীল। বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই খাদ্যশস্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠেছে। কৃষির উপখাতের একটি মৎস্য খাতের ক্ষেত্রে ও বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে গেছে। দেশের মানুষের প্রোটিনের চাহিদার একটি বিরাট অংশ পূরণ করে মৎস্য খাত। বিবিএসের তথ্যমতে, বাংলাদেশের মানুষের জনপ্রতি প্রতিদিন প্রোটিনের চাহিদা ৬০ গ্রাম। বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষ প্রোটিনের চাহিদা পূরণের জন্য পাচ্ছে ৬৭.৮০ গ্রাম। এটি পাওয়ার পেছনে মৎস্য খাত অবদান রেখে চলেছে। বাংলাদেশে সাধারণ দুই ধরনের মাছ পাওয়া যায়। ১. স্বাদু পানির মাছ ২. লোনা পানির মাছ।
মিঠা পানির মাঝে মধ্যে উল্লেখ্যোগ্য হলো তেলাপিয়া, পুঁটি, বাইল্যা, পাঙাশ, টেংরা ইত্যাদি। বাংলাদেশে বর্তমানে ৫০০টি মৎস্য অভয়াশ্রম রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ইলিশের জন্য রয়েছে ৬টি। স্বাদু পানির মাছের উৎস হলো আমাদের আশপাশে থাকা নদী, খাল-বিল, হাওর-বাওড় ইত্যাদি। এসব স্থানে প্রাকৃতিকভাবেই মাছের উৎপাদন হয়। এখন যুগের পরিবর্তন হয়েছে৷ মানুষ শুধু প্রাকৃতিকভাবে প্রজননের মাধ্যমে উৎপাদিত মাছের ওপর নির্ভর করে থাকে না। মানুষের প্রোটিনের চাহিদা পূরণের জন্য এসব স্থানেও মাছ চাষ করছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয় ৩৮.৬ হেক্টর এবং বদ্ধ জলাশয় ৮.৫ লাখ হেক্টর। এইসব স্থানে পাঙাশ, তেলাপিয়া, রুই, কৈ মাছের চাষ প্রচুর হয়ে থাকে। বর্তমানে এই মাছগুলো বাংলাদেশের নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের প্রোটিনের চাহিদা পূরণ করার ক্ষেত্রে ভালো ভূমিকা রেখে চলেছে। বাংলাদেশে লোনা পানিতে চিংড়ি মাছের চাষ করা হয়। এই মাছের ও আলাদা চাহিদা রয়েছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ‘দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার ২০২২’- এর প্রতিবেদন অনুসারে অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। বদ্ধ জলাশয়ে চাষকৃত মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম।তেলাপিয়া উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ স্থানে রয়েছে। বিশ্বে ইলিশ উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম।
কৃষি খাতের অনেক উপখাতের মধ্যে একটি হলো মৎস্য খাত। আমাদের জিডিপিতে এই খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৪ অনুসারে এই খাতের অবদান মোট জিডিপির ২.৫৩ শতাংশ এবং কৃষির ২২.২৬ শতাংশ। বাংলাদেশে প্রতিবছর ৫০ লাখ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও পড়েছে মৎস্য খাতে। আমাদের দেশের নদীর নাব্যতা নষ্ট হয়ে গেছে। প্রকৃতিগতভাবেই এখন আর মাছ জন্মায় না। নদী-নালা, খাল-বিলে আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। এর ফলেই মাছ চাষের প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টি হয়েছে। দেশের অনেক পুকুরে এখন মাছ করা হচ্ছে। অনেক কৃষিজমিকে কেটে পুকুরে রূপান্তর করে মাছ চাষ করা হচ্ছে। আবার অনেক পুকুরে মাছ চাষের সঙ্গে সঙ্গে মুরগির খামার করা হচ্ছে। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি চাষ করা হয় তেলাপিয়া, পাঙাশ, রুই, কই ও শিং মাছ। আজকে কার্প জাতীয় মাছের চাষাবাদ ও অনেক করা হচ্ছে। বাজারে চাষের মাছ প্রচুর পাওয়া যায়। মানুষের স্বাদের ও পরিবর্তন হয়েছে। এখন শিং মাছ ও চাষ করা হচ্ছে। দেশের মানুষের চাহিদা পূরণ করে, মাছ এখন বিদেশে ও রপ্তানি করা হচ্ছে।
মাছের রাজা হলো ইলিশ। পদ্মা নদীর ইলিশ মাছের অন্যরকম চাহিদা রয়েছে। এখন শুধু পদ্মাতে নয়, মেঘনা নদীর ইলিশের চাহিদাও রয়েছে। এইসব ইলিশ মাছের স্বাদ, গুণ আলাদা। বিশ্বের ১১টি দেশে ইলিশ উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি ইলিশ উৎপাদিত হয়। বাংলাদেশের ইলিশের চাহিদা বিভিন্ন দেশে রয়েছে। গত অর্থবছরে মৎস্য খাত হতে রপ্তানি করে আয় হয়েছে ৬১৪৪.৯১ কোটি টাকা।
মৎস্য চাষকে আরও যুগোপযোগী করার জন্য সাধারণ চাষিদের সঙ্গে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আরও নিবিড়ভাবে কাজ করে যেতে পারে। এতে করে আমাদের মাছের উৎপাদন বাড়বে এবং রপ্তানি আয়ও বাড়বে। দেশের কাপ্তাই লেক হতে প্রতিদিন প্রচুর ছোট মাছ ধরা হয়ে থাকে। এগুলো বিদেশে রপ্তানি করা হয়।
দেশের কর্মসংস্থানের সৃষ্টির ক্ষেত্রে ও মৎস্য খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। ‘মৎস্য ধরিব খাইবো সুখে, কী আনন্দ লাগছে বুকে’Ñ এই স্লোগানকে সামনে নিয়ে নব্বই দশকের শেষের দিকে বাংলাদেশে মৎস্য খাত আত্মকর্মসংস্থান করার প্রকাশ করে। দেশে বর্তমানে ১২ শতাংশ মানুষ মৎস্য খাতে কর্মরত আছে। বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার অনেক নারীরা ও এই পেশার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। মৎস্য খাতের দিকে নজর দিয়ে দেশের কর্মসংস্থানের পরিমাণ বৃদ্ধি করা যেতে পারে। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর মৎস্য চাষের ওপর বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। এসব প্রশিক্ষণ সম্পর্কে মানুষের মধ্যে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা যেতে পারে। আমাদের দেশের বসতবাড়িতে প্রায় ১৫ লাখের বেশি পুকুর রয়েছে। এইগুলো ব্যবহার করেও কর্মসংস্থানের পরিমাণ বাড়ানো যেতে পারে ওষুধ শিল্পের ক্ষেত্রেও মাছের ব্যবহার রয়েছে। আমাদের দেশের মাছ প্রক্রিয়া করার যথাযথ ব্যবস্থা নেই। একটু প্রক্রিয়া জাত করে বিক্রি করলে আয়ের পরিমাণ বাড়বে। এই যে, নতুন একটু সংযোজন এতে করেও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি হবে।
কাপ্তাই লেক বর্তমানে মাছের অভয়াশ্রম হিসেবে কাজ করছে। এখন হালদা নদীতে প্রচুর মাছ উৎপাদিত হচ্ছে। হালদা নদীতে উৎপাদিত বিদেশি রপ্তানিযোগ্য আট প্রজাতির মাছের চাহিদা ব্যাপক হারে বাড়ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑ বড় আইড়, সাদা টেংরা, বাঁচা, কাজরী, কেচকি, বাঁশপাতা, ছোট আইড়, বাতাসি। গত ২৪-২৫ বাণিজ্যিক বছরে এই আট প্রজাতির ৩৩ লাখ ২০ হাজার ৩০৪ কেজি মাছ ঘাটে অবতরণ হয়েছে। এর মধ্যে সরকার রাজস্ব আদায় করেছে মোট আট কোটি ১০ লাখ ৭৪ হাজার ৩৮৬ টাকা। যদিও হ্রদ থেকে আগের মতো বড় আকারের মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। হ্রদে বর্তমানে ছোট মাছের উৎপাদন বেশি। হ্রদের মৎস্য উৎপাদনের ৯০ ভাগ দখল করেছে ছোট মাছ ‘কাঁচকি, চাপিলা’।
খাদ্যদ্রব্যের সংকট এই খাতকে পিছিয়ে দিচ্ছে। এই দেশে মাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি জন্য যথেষ্ট মানসম্মত খাবার দেওয়া সম্ভব হয় না। এই কারণে আমাদের দেশের পাঙাশ মাছের রঙ ও স্বাদের সঙ্গে ফিলিপাইনের মাছের ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়।
বাংলাদেশে মৎস্য বিনিয়োগ করার জন্য সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি ও এনজিওগুলো কাজ করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষিঋণ ২০২১-২২ নীতিমালায় মৎস্য খাতে ঋণ দেওয়ার কথা বলা আছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুসারে ব্যাংকসমূহ ৮% হারে ঋণ দিয়ে থাকে। এই সুদের হার কমিয়ে ৩-৫ হারে করা যেতে পারে। অনেক সময় মৎস্যচাষিরা দাদন নিয়ে থাকে। তাদের জন্য অর্থ পাওয়ার ব্যবস্থা সহজ করা দরকার। অনেক বেসরকারি ব্যাংক ও মৎস্য খাতে ঋণ প্রদান করে থাকে। কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী উন্নয়ন ব্যাংকের মাধ্যমে এই খাতে আরও বেশি বিনিয়োগ করা যেতে পারে। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট কাজের ৮৫% হলো কৃষিঋণ। ঋণের এটি অনেক সময় কৃষকদের জন্য বেশি হয়ে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী মোট ঋণের ১০ ভাগ মৎস্য খাতে দিতে হবে। কিন্তু বিভিন্ন জটিলতার কারণে তা সম্ভব হয়ে ওঠে না। এখাতের বিকাশের ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে কাজ করে মাছের সঠিক দাম না পাওয়া। এর কারণ হলো বাজারে প্রবেশাধিকার না থাকা ও মধ্যস্বত্বভোগী।
বাংলাদেশ মূলত চিংড়ি মাছ রপ্তানি করে থাকে। মোট মাছ রপ্তানির ৪৫ শতাংশ হলো চিংড়ি। শুঁটকি মাছের আন্তর্জাতিক বাজারে আলাদা চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে ও আমেরিকার বাজারে। প্রতিবছর প্রচুর অর্থ আয় হয় এই সব দেশ হতে। কিন্তু এই খাতে বিনিয়োগ আরও বাড়ানো দরকার। শুঁটকি মাছের মধ্যে প্রচুর ভিটামিন আছে। এটি আমাদের দেশের অনেক মানুষের সামুদ্রিক মাছের চাহিদা পূরণ করে থাকে। বাংলাদেশের দক্ষিণের জেলা কক্সবাজার এই শুঁটকি চাষ বেশি হয়ে থাকে৷ প্রায় ১০ লাখ মানুষ এই কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষি খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপখাত হিসেবে মৎস্য খাত ভূমিকা রেখে চলেছে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এই খাত আমার অর্থনীতিতে পোশাক শিল্প ও রেমিট্যান্সের মতো অবদান রাখতে পারবে। এজন্য দরকার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা।