নির্বাচন কমিশনের সংলাপ
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০৮ অক্টোবর ২০২৫ ১১:১৪ এএম
দেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রশ্ন আজ কেবল রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়ই নয়, আগামীতে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ কী হবেÑ তা নির্ধারণেরও অন্যতম শর্ত। এই পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচনে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে সেই বিষয়টি মাথায় রেখে, গণমাধ্যমের শীর্ষ প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংলাপ করেছে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) অপপ্রচার, গুজব মোকাবিলা এবং জনগণের আস্থা অর্জনই নির্বাচন কমিশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন গণমাধ্যমব্যক্তিরা। এ ছাড়া নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের রিটার্নিং অফিসার করা; নির্বাচনে ডিসি, ওসিদের প্রভাব ঠেকানোর পরামর্শ দিয়েছেন তারা। ৬ অক্টোবর সোমবার, নির্বাচন কমিশন ভবনে প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন মিডিয়ার শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গে দুই ধাপে এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।
সংলাপে গণমাধ্যম প্রতিনিধিরা অতীতের জাতীয় নির্বাচনগুলো প্রসঙ্গ তুলে ধরে আসন্ন নির্বাচনটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করার জন্য ইসিকে ‘মেরুদণ্ড’ সোজা করে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগের পরামর্শ দেন। ভোটার ও প্রার্থীদের নিরাপত্তা, কালো টাকার প্রভাব রোধ, তথ্যের অবাধ প্রবাহ, ইসি কর্মকর্তাদের রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব প্রদান ও ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়া, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইসির অধীন আনার মতামত সংলাপে দেওয়া হয়। উল্লেখ্য, সংলাপ শুরুর সূচনা বক্তব্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন একটি ক্রান্তিলগ্নে দায়িত্ব নেওয়ার প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, ‘আমরা স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। আয়নার মতো স্বচ্ছ একটা নির্বাচন করতে চাই। এজন্য গণমাধ্যমসহ সবার সহযোগিতা চাই।’
এ কথা সত্য যে, ফ্যাসিবাদ-উত্তর বাংলাদেশে নতুন করে গণতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করতে হলে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অপরিহার্য। কিন্তু বারবার নির্বাচনী অনিয়ম, প্রশাসনিক প্রভাব ও ভোটকেন্দ্রে সহিংসতার অভিযোগ জনআস্থাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সাংবাদিকরা যথার্থই বলেছেনÑ নির্বাচন কমিশনকে আরও কঠোর হতে হবে। ইসি যদি নিজের ক্ষমতা যথাযথভাবে প্রয়োগ না করে, তাহলে আইন ও সংবিধানে দেওয়া তার মর্যাদা হারাবে।
দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অন্যতম ভিত্তি হলো অবাধ, সুষ্ঠু ও সবার অংশগ্রহণমূলক একটি নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। কিন্তু গত ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের তথাকথিত নির্বাচন সকল অর্থেই এক মহা প্রহসনের নজির সৃষ্টি করেছে। দেখা গেছে, প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর প্রার্থীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে কেন্দ্র দখল ও কারচুপি, কখনও দিনের ভোট রাতে, কখনও আমি আর ডামির মাধ্যমে একতরফা নির্বাচন হয়েছে। সেখানে নির্বাচন কমিশন,আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ রাষ্ট্রযন্ত্রের সব শক্তি ক্ষমতাসীনদের প্রতি আনুগত্যের পরীক্ষা দিয়েছে। দেশবাসী আর সেই পুরনো ছকে ফিরে যেতে চায় না। মানুষ চায় নিজের ভোট নিজে দিয়ে পছন্দের দল ও প্রার্থীকে নির্বাচিত করতে। যে কারণে ছাত্র-জনতার জুলাই অভ্যুত্থান।
আমরা মনে করি, ইসির দায়িত্ব শুধু ভোট গ্রহণই নয়; প্রধান কাজ পুরো নির্বাচনী পরিবেশকে প্রতিযোগিতামূলক ও স্বচ্ছ রাখা। প্রতিযোগী রাজনৈতিক দলগুলোর সমান সুযোগ নিশ্চিত করা, নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা, অর্থের প্রভাব রোধ করা, প্রশাসনের পক্ষপাতিত্ব ঠেকানোÑ এসব ক্ষেত্রেই কমিশনের কঠোর অবস্থান জরুরি। নির্বাচন চলাকালে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও ইসির নৈতিক দায়িত্ব।
বর্তমান ইসির প্রতি জনগণের প্রত্যাশা অনেক। জনগণ চায়, কমিশন যেন প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভর না করে, নিজস্ব নীতি ও আইনি ক্ষমতার ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেয়। বিশেষ করে মনোনয়ন যাচাই, প্রচারণা পর্যবেক্ষণ, ভোটকেন্দ্রে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণÑ প্রতিটি ধাপে ইসিকে দেখাতে হবে দৃঢ়তা। কমিশন যদি নিজেই দুর্বল ভূমিকা নেয়, তাহলে অনিয়মকারীরা উৎসাহিত হবে, আর ভোটাররা হবে নিরুৎসাহিত।
আসলে সুষ্ঠু নির্বাচনের সফলতা নির্ভর করে ইসির সাহসী ও নিরপেক্ষ ভূমিকার ওপর। নির্বাচন কমিশন যদি ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে থেকে সত্যনিষ্ঠ সিদ্ধান্ত নেয়, তবে জনগণ আবারও বিশ্বাস করতে পারবে- গণতন্ত্র এখনও বেঁচে আছে, আর ভোটই দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একমাত্র পথ। আরেকটি বিষয় এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, নির্বাচনে সাংবাদিকদের মতো পর্ববেক্ষকদেরও সম গুরুত্ব রয়েছে। দেখা গেছে, ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগেও নামসর্বস্ব সংস্থাকে পর্যবেক্ষক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। তখনও ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। আমরা চাই, অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের নামে নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানগুলো চিহ্নিত করা হোক। দেখা গেছে, কারও দ্বারা প্ররোচিত বা আনুগত্য হয়ে এসব সংস্থা তাদের প্রতিবেদন তৈরি করে থাকে। যে প্রতিবেদনের ওপর দেশের নাগরিক, এমনকি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরাও আস্থা রাখতে পারেন না। মনে রাখতে হবে, নির্বাচন কেবল রাজনৈতিক দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয় নয়, এটি জনগণের আস্থা অর্জনের প্রশ্ন। ইসিকে তাই দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করতে হবে।
আমরা চাই, ইসি শুধু ভোটের দিন নয়, পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় নজরদারি জোরদার করুক। এক্ষেত্রে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা, ভোটারদের নিরাপত্তা ও পর্যবেক্ষকদের স্বাধীন চলাচল নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আমরা মনে করি, নির্বাচন কমিশন যদি নির্ভীকভাবে আইনের প্রয়োগ করে এবং কোনো চাপ বা প্রভাবের কাছে নতি স্বীকার না করে, তবে জনগণের আস্থা ফিরবে। গণতন্ত্রের স্বার্থে এখন সময় এসেছে, ইসি যেন তার সাংবিধানিক শক্তি প্রমাণ করে, দেখিয়ে দেয় দেশে সত্যিই ভোটের মাধ্যমে জনগণই ক্ষমতার উৎস।