পার্বত্য চট্টগ্রাম
এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া, রাজনীতিক ও কলাম লেখক
প্রকাশ : ০৬ অক্টোবর ২০২৫ ১১:০৬ এএম
খাগড়াছড়িতে ধর্ষণের একটি অপ্রমাণিত অভিযোগকে পুঁজি করে পাহাড়কে অশান্ত করার পরিকল্পনা এঁটেছিল দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরাÑ এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট। পাহাড় তথা পার্বত্য অঞ্চলকে অশান্ত করার ষড়যন্ত্র চলছে দীর্ঘ সময় ধরেই। বিভিন্ন স্থান থেকে এ বিষয়ে সরকারকে বারবার সতর্ক করা হলেও প্রশাসন কিংবা সরকারের যেন সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। আর এ অবহেলার ফলেই পার্বত্য চট্টগ্রামে বারবার অশান্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ডের প্রতি এমন উদাসীনতা কখনোই কাম্য নয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে অনেক আগে থেকেই একটি আন্তর্জাতিক পরিকল্পনা চালু রয়েছে, সবাইকে এ বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে। সাম্প্রতিককালে কুকি-চিনের ঘটনা দেশবাসী ও নিরাপত্তা বাহিনীকেও চিন্তিত করেছে। যেটা আমরা সাদা চোখে দেখছি, সেটার পেছনেও পর্দার অন্তরালের কারণ আছে। অভিযোগ উঠেছে, আমাদের পার্বত্য অঞ্চল, ভারতের একটি অঞ্চল ও মিয়ানমারের একটি অঞ্চল নিয়ে কোনো কোনো বৈশ্বিক শক্তির আলাদা পরিকল্পনা আছে। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্যই হয়তো-বা তারা নানাভাবে ষড়যন্ত্র করছে। এজন্য আমাদের সজাগ থাকতে হবে, যাতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আমাদের ভূখণ্ড নিয়ে কোনো ষড়যন্ত্রই সফল হতে না পারে।
আমাদের স্মরণে আছে, চলতি বছরের ১৫, ২১, ২৩ জানুয়ারি ইউপিডিএফ (মূল) দলের সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় নানারকম অস্ত্র ও গোলাবারুদ। এর মধ্যে রয়েছেÑ প্রাণঘাতী অস্ত্র, বিমানবিধ্বংসী অস্ত্র এবং লকেট লঞ্চার, গ্রেনেড, এ কে ৪৭, ম্যাগাজিন, এমন্ড৪ কার্বাইন, ৪০ এমএম গ্রেনেড লঞ্চার, চায়না রাইফেল, নাইন এমএম পিস্তল, এসএলআর, এসএমজি, এলজি, বিমানবিধ্বংসী রিমোট কন্ট্রোল বোমা, গ্রেনেড, হেভি মেশিনগান, জি-৩ রাইফেল, স্নাইপার রাইফেল। এসব অত্যাধুনিক প্রাণঘাতী অস্ত্রের মজুদ রয়েছে দেশের তিন পার্বত্য জেলাÑ খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙামাটিতে থাকা পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের হাতে। বিশ্লেষকদের ধারণা, এসব অস্ত্রের জন্য খাগড়াছড়ির মণিপুরের তারাবন এলাকায় রয়েছে অস্ত্রের গুদাম। খুন, গুম, চাঁদাবাজি, অপহরণ আর আধিপত্য বিস্তারে ব্যবহার করা হচ্ছে এসব অস্ত্র। ফলে অশান্ত হয়ে উঠছে পাহাড়। বিপুল পরিমাণ অস্ত্রের মজুদ, চাঁদাবাজি আর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সন্ত্রাসীরা স্বপ্ন দেখছে জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠার। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভারতের ত্রিপুরা ও মিজোরাম রাজ্যের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানচিত্র যোগ করে কল্পিত ‘জুম্মল্যান্ড’-এর মানচিত্র প্রচার করা হচ্ছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে চারটি আঞ্চলিক সংগঠনের সশস্ত্র গ্রুপের রয়েছে আর্ম ক্যাডার ও সেমি আর্ম ক্যাডার বাহিনী। এর মধ্যে আর্ম ক্যাডারের সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার। অন্যদিকে সেমি আর্ম ক্যাডারের সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি। সেমি আর্ম ক্যাডাররা অস্ত্রে প্রশিক্ষিত। তারা ভবিষ্যতে সংগঠনগুলোর জন্য কাজে লাগে। এসব সন্ত্রাসীর কাছে কয়েক হাজার আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে।
দীর্ঘ সময় দলেই পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোকে অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করছে ষড়যন্ত্রকারী আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী। কোনো এক অজ্ঞাত কারণেই বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জায়গায় সেনা চৌকিগুলো উঠিয়ে নেওয়া হয়। ফলে সহিংসতা ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমের মাত্রা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পায়। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক ও ভয়ংকর দুঃসংবাদÑ এই উগ্রবাদী পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা পাহাড়িদের সঙ্গে মিশে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার জন্য লোকালয়ে আসছে। এতে করে স্থানীয় লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক তৈরির পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ অস্তিত্ব সংকটের সম্মুখীন হচ্ছে। এ সমস্ত সন্ত্রাসী কার্যকলাপের কারণে পাহাড়ি কৃষকরা জুম চাষ, গাছ-বাগান পরিচর্যা, কৃষি খামার, মৎস্য ও গরু-মহিষের খামার এবং ফলের বাগান পরিচর্যার জন্য পাহাড়ে যেতে পারছে না। সাধারণ মানুষ আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠার মধ্যে জীবনযাপন করতেছে।
এমতাবস্থায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবিলম্বে পাহাড়ি সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর কার্যক্রম বন্ধ করে পাহাড়ি এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা নিতে হবে। পার্বত্য এলাকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি খ্রিস্টান রাজ্য বানানোর আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র অব্যাহত আছে। অন্যদিকে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কাছে তিন পার্বত্য জেলা নিয়ে স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের প্রস্তাব ইউপিডিএফ নেতা মাইকেল চাকমার উত্থাপনের পর পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই পরিস্থিতির মধ্যে বার্মার আরাকান আর্মিকে করিডোর দেওয়ার ভয়াবহ চিন্তাও দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকিস্বরূপ হবে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি পার্বত্য চট্টগ্রামে আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নতুন ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে। ছাত্র-জনতার প্রতিরোধের মুখে নজিরবিহীন গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে। এ সরকারকে বেকায়দায় ফেলা এবং দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির যে নানামুখী অপচেষ্টা তারই অংশ হিসেবে পাহাড়ে নৈরাজ্য সৃষ্টির লক্ষ্যে একের পর এক চক্রান্ত চলছে। সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে নানা অপতথ্য ও মিথ্যাচার করে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করছে বলে নানা অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এই সকল অপপ্রচারের সঙ্গে নতুন করে যোগ হয়েছে নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যক্রমকে ব্যাহত করার জন্য ধর্মীয় অনুভূতির অপব্যবহার। দুষ্কৃতকারী দমনে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক পরিচালিত যেকোনো অভিযানকে ওই স্থানের ধর্মীয় উপাসনালয়, কিয়াংঘর কিংবা ভাবনা কেন্দ্রে নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক আক্রমণ বা পবিত্রতা লঙ্ঘনের তকমা দিয়ে তারা স্থানীয় ধর্মভীরু জনসাধারণের মনে বিদ্বেষ তৈরির চেষ্টা করে যাচ্ছে। একই সঙ্গে তারা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলেও এ-সংক্রান্ত মিথ্যা তথ্য প্রচারের মাধ্যমে নিরাপত্তা বাহিনীর ভাবমর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টাও অব্যাহত রেখেছে। একটি চিহ্নিত আবদার নিরাপত্তা বাহিনী যেন পাহাড়ের সকল স্থানে অবস্থান না নেয়। স্থানীয়দের সূত্রমতে, ভূ-প্রকৃতিগত কারণে বন্দুকভাঙ্গা এলাকাটি দুষ্কৃত সহায়ক তথা অপরাধপ্রবণ এলাকা। উক্ত এলাকার দুর্গমতার সুযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ জেএসএস ও ইউপিডিএফ নামধারী আঞ্চলিক দলগুলোর সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা এলাকাটিকে সন্ত্রাসের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করে রেখেছে। এমনকি ওই স্থানের দখল নিয়ে নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে গত কয়েক বছরে নিহত হয়েছে প্রায় ২০-২৫ জন সশস্ত্র সন্ত্রাসী। মূলত এ কারণেই সেনাবাহিনী ওই অঞ্চলে সন্ত্রাস নির্মূলে উক্ত অভিযান পরিচালনা করে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে বাইরে থেকে ষড়যন্ত্র হচ্ছেÑ এটি অনেকটাই দিবালোকের মতো স্পষ্ট। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর পক্ষ থেকে এবং স্থানীয় অনেকেই বলেছেন, পাহাড়কে অশান্ত করতে একটি মহল ষড়যন্ত্র করছে। যার যার অবস্থান থেকে দল-মত-নির্বিশেষে ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, তাতে ষড়যন্ত্র রোধ করা কঠিন। বেশি প্রয়োজন ধৈর্য ও ঐক্যের। আমাদের বাংলাদেশি হিসেবে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। উগ্র সন্ত্রাসীদেরকে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে চিরতরে বিতাড়িত ও নিষিদ্ধ করতে হবে, এ অঞ্চলে দীর্ঘদিনের বৈষম্য দূর করে ন্যায় ও সম-অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবেÑ একই সঙ্গে বাঙালি ও উপজাতি উভয়ের জন্য শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। সকলকে মনে রাখতে হবে, পার্বত্য চট্টগ্রাম শুধু উপজাতিদের জন্য নয়, শুধু বাঙালিদের জন্যও নয়। এটি বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশÑ এটি সবার, সমগ্র জাতির সম্পদ। তাই সরকারের উচিত হবে, এই ষড়যন্ত্রকে রুখে দিতে হবে জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে, বৈষম্যের অবসান ঘটাতে হবে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামকে সন্ত্রাসমুক্ত করে শান্তি ও স্থিতিশীলতার পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের এই সংকট আপাতদৃষ্টিতে সশস্ত্র সংগঠনগুলোর আধিপত্যের লড়াই মনে হলেও এটি মূলত আধিপত্যবাদী শক্তির ষড়যন্ত্রের অংশ, যা এই অঞ্চলের মানুষের জনজীবনকে বিপন্ন করার পাশাপাশি অনগ্রসর এলাকার উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির স্বপ্নকেও বাধাগ্রস্ত করছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্থিরতা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রভাব পড়বে খুব সহজেই। অন্তর্বর্তী সরকারের রাজনৈতিক কৌশল আর বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ভারতবিরোধী মনোভাবে সমতলে অস্থিরতা তৈরিতে সুবিধা করতে না পেরে এবার পার্বত্য চট্টগ্রামকে টার্গেট করেছে ষড়যন্ত্রকারীরা। এটা শুধু গোপনে নয়, প্রকাশ্যেই করা হচ্ছে। ভারতীয় মিডিয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে প্রচার করা উস্কানিমূলক তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করলেই এই অভিযোগের সত্যতা মিলবে। এই ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করতে হলে শুধু প্রশাসনিক নয়, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত থাকতে হবে। সেখানে বসবাস করা বাঙালি ছাড়াও ১৮টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষকে আস্থায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে সরকারকে।