× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

রাজনৈতিক অস্থিরতা

বিনিয়োগ সম্ভাবনার পথে বড় বাধা

সাইফুল ইসলাম শান্ত, সাংবাদিক

প্রকাশ : ০৫ অক্টোবর ২০২৫ ১১:২৮ এএম

বিনিয়োগ সম্ভাবনার পথে বড় বাধা

গত এক দশকে দেশের অর্থনীতির আকার বেড়েছে কয়েকগুণ। রপ্তানি আয়ে তৈরি পোশাকশিল্প বিশ্বব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দখল করেছে এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নÑ সেতু, মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে দেশকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। উৎপাদনশীল শিল্প, আইসিটি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, অবকাঠামো ও সেবা খাতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহও বেড়েছে। এত সুযোগ-সম্ভাবনার মাঝেও একটি অদৃশ্য অথচ বাস্তব বাধা ক্রমশ মাথা চাড়া দিয়ে উঠছেÑ তা হলো মব সন্ত্রাস। এ ধরনের অরাজকতা শুধু সামাজিক স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে না, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করে।

যেকোনো দেশেই বিদেশি বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আইনের শাসন। বিনিয়োগকারীরা চান তাদের মূলধন যেন নিরাপদ থাকে। দীর্ঘমেয়াদে তারা যেন ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন। কিন্তু বছরব্যাপী দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা যাচ্ছে মব সন্ত্রাস করে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করা। কখনও গুজব ছড়িয়ে, কখনও সামান্য চুরির অভিযোগে নিরীহ মানুষও এমন নির্মম পরিস্থিতির শিকার হচ্ছে। এই অরাজকতা বিনিয়োগকারীদের মনে প্রশ্ন তোলেÑ দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আসলে কতটা নিয়ন্ত্রণে?

বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শুধু কাগজে-কলমে অর্থনৈতিক সূচক দেখেন না। তারা স্থানীয় পরিবেশ, সামাজিক স্থিতি এবং জনগণের মানসিকতাকেও গুরুত্ব দেন। মব সন্ত্রাস যখন প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়, তখন এটি বিনিয়োগকারীদের চোখে রাষ্ট্রীয় আইনের দুর্বলতার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। যে দেশে মানুষ নিজের হাতে আইন তুলে নেয়, সে দেশে বিনিয়োগের আইনি সুরক্ষা কতটা কার্যকর হবে এ প্রশ্নই বড় হয়ে ওঠে। ভারত, ভিয়েতনাম বা ইন্দোনেশিয়ার মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো যখন বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে এগিয়ে আছে তখন বাংলাদেশে মব সন্ত্রাসের খবর বিনিয়োগকারীদের সরে যেতে প্রলুব্ধ করতে পারে।

এখানে প্রশ্ন ওঠেÑ কেন মানুষ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিশ্বাস না করে নিজ হাতে বিচার করতে চায়? এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে।

বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে মামলা-মোকদ্দমা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। অনেকেই মনে করেন অভিযোগ জানালেও অপরাধী শাস্তি পাবে না। এ ছাড়া ডিজিটাল এই যুগে কয়েক মিনিটের মধ্যেই ভুয়া খবর ছড়িয়ে পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে মানুষ মনে করে তাৎক্ষণিক শাস্তিই হলো একমাত্র সমাধান। কিন্তু এই ‘তাৎক্ষণিক বিচার’ই মূলত বড় বিপদ ডেকে আনে।

একটি বিদেশি কোম্পানি যখন বাংলাদেশে কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা করে, তারা প্রথমে খোঁজ নেন দেশের শ্রম আইন, ভূমি ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ও বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে। মব সন্ত্রাসের মতো অমানবিক বাস্তবতা তাদের কাছে বার্তা পাঠায় যেÑ সামাজিক স্থিতিশীলতা এখনও দুর্বল। এতে করে বিনিয়োগের জন্য দরকারি আস্থা তৈরি হয় না। অনেক সময় দেশীয় বিনিয়োগকারীরাও ঝুঁকি নিতে চান না, নতুন উদ্যোগ থেকে পিছিয়ে যান। এর ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও বড় বাধা তৈরি হয়। 

গণপিটুনির ভিডিও বা ছবি যখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়, তখন তা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের নৃশংস ও অসহনশীল একটি চিত্র তুলে ধরে। দেশের সব অর্জন তখন আড়ালে চলে যায়। মনে রাখতে হবে বিনিয়োগ শুধু অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি মনস্তাত্ত্বিক আস্থার বিষয়ও। বিনিয়োগকারীর মনে যদি আশঙ্কা জন্মে, তবে তারা অন্যত্র সুযোগ খোঁজেনÑ এটাই স্বাভাবিক।।

এই সমস্যার সমাধান সহজ নয়। তবে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে ধীরে ধীরে সুফল পাওয়া যেতে পারে- যেমন: দ্রুত ও দৃশ্যমান বিচার : মব সন্ত্রাসে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। কয়েকটি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি জনগণের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে।

আইনের শাসন জোরদার : পুলিশ প্রশাসনকে আরও কার্যকর করতে হবে এবং জনগণের কাছে তাদের জবাবদিহি বাড়াতে হবে।

জনসচেতনতা বৃদ্ধি : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব প্রতিরোধে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। স্কুল, কলেজ ও গ্রামে সচেতনতা কর্মসূচি চালাতে হবে।

বিনিয়োগবান্ধব বার্তা : সরকারকে আন্তর্জাতিক মহলে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে যে বাংলাদেশে বিনিয়োগ নিরাপদ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

সুশাসন প্রতিষ্ঠা : দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে স্বচ্ছ বিচারব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এতে সবার মধ্যে আস্থা সৃষ্টি হবে। 

বাংলাদেশ ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের কাতারে পৌঁছানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে বিদেশি বিনিয়োগের ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু মব সন্ত্রাসের মতো অরাজকতা যদি বন্ধ করা না যায়, তবে বিনিয়োগের সম্ভাবনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে  কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়, সমাজকেও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।

দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন যাত্রা এখন বৈশ্বিক অঙ্গনে প্রশংসিত। বিনিয়োগবান্ধব অবকাঠামো, দক্ষ শ্রমশক্তি ও ভৌগোলিক অবস্থান আমাদের সামনে এক সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু মব সন্ত্রাস সংস্কৃতি এই অগ্রগতির জন্য বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি শুধু নিরীহ মানুষের জীবন কেড়ে নেয় না, আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নে কোনো আপস করা যাবে না, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইনের শাসনই হতে হবে সর্বোচ্চ শক্তি। সরকার যদি এই অরাজকতা বন্ধ করতে সক্ষম হয়, তবে দেশে বিদেশি বিনিয়োগ প্রবাহ বাড়বে। অর্থনীতি আরও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে এবং উন্নত দেশের লক্ষ্যে যাত্রা হবে অনেক বেশি নিশ্চিত।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা