কৃষি
ড. এম আব্দুল মোমিন
প্রকাশ : ০৫ অক্টোবর ২০২৫ ১১:২৪ এএম
মানুষের পাঁচটি মৌলিক চাহিদার প্রথমটিই খাদ্য। দেশের ৯০ ভাগ লোকের প্রধান খাবার ভাত। কোনো দেশের শিল্প, সাহিত্য, অর্থনীতি কিংবা রাজনীতি সবকিছুই নিয়ন্ত্রিত হয় এই খাদ্য নিরাপত্তা দিয়ে। দেশের জনসংখ্যা যখন ১৭ কোটি, তখন এত মানুষের খাবারের জোগান দেওয়া সহজ কথা নয়। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও এই বিশাল চ্যালেঞ্জই গত ৫৫ বছর ধরে মোকাবিলা করে যাচ্ছে দেশের ধান বিজ্ঞানীরা। সত্তরের দশকের প্রথম দিকে সদ্য স্বাধীন দেশে প্রবর্তন করা হলো উফশী জাত আইআর৮। ব্রির বিজ্ঞানীরা উদ্ভাবন করলেন তিন মৌসুমে চাষ উপযোগী উচ্চ ফলনশীল ধানের আধুনিক জাত বিআর৩, যা বিপ্লব ধান নামে ব্যাপক পরিচিতি পায় এবং সত্যিকার অর্থেই এই জাতটি দেশের ধান উৎপাদনে বিপ্লবের সূচনা করে। আইআর৮ ও বিপ্লব এই দুটি উফশী জাত প্রবর্তন ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে মূলত আধুনিক ধান চাষের গোড়াপত্তন হয়। শুরু হয় খাদ্য উৎপাদনে নতুন এক অধ্যায়।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত সাড়ে পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে ব্রি এদেশের ক্রমর্বধমান জনসংখ্যার জন্য খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে অসামান্য অবদান রেখে চলেছে। গত ৫৫ বছরে ১১৩ ইনব্রিড ও ৮টি হাইব্রিড মিলিয়ে মোট ১২১টি ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে ব্রি। বাংলাদেশের ভৌগোলিক বৈচিত্র্য যেমনÑ উত্তরে খরা, দক্ষিণে লবণাক্ততা, মধ্যাঞ্চলে বন্যা ও জলমগ্নতাসহ প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবিলায় ব্রি উদ্ভাবন করেছে লবণাক্ত সহনশীল, খরা সহনশীল, জলমগ্নতা সহনশীল, ঠান্ডা সহনশীল, জোয়ার-ভাটা সহনশীলসহ নানা ধরনের ৩৭টি জাত। শুধু প্রতিকূল পরিবেশ সহনশীলতাই নয়, ২৭টি পুষ্টিসমৃদ্ধ ও ১৪টি সরু ও সুগন্ধি চালের ধানও উদ্ভাবন করেছে ব্রি। যেগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানিযোগ্য। বিশ্বের প্রথম জিঙ্কসমৃদ্ধ ধান ব্রি ধান৬২সহ ৭টি জিঙ্কসমৃদ্ধ জাত উদ্ভাবন করে বাংলাদেশকে বিশ্বে গৌরবময় অবস্থানে নিয়ে যায়। বর্তমানে জিঙ্ক, আয়রন, প্রোটিনসমৃদ্ধ জাত কৃষকের হাতে পৌঁছেছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে ব্রি’র গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল অল্প জমি থেকে বেশি পরিমাণ ধান উৎপাদন করা। বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মেটানোই ছিল তখনকার মূল লক্ষ্য। বর্তমানে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়েছে সেই সঙ্গে মানুষের চাহিদা ও রুচির পরিবর্তন এসেছে। তাই উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি সরু-সুগন্ধি এবং রপ্তানির উপযোগী প্রিমিয়াম কোয়ালিটির বেশ কয়েকটি জাত উদ্ভাবন করেছে ব্রি। ধান গবেষণায় যুগান্তকারী সাফল্যের কারণে অনেকে ব্রিকে একটি অন্নদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে থাকেন।
ধান গবেষণার পাশাপাশি কৃষি যান্ত্রিকীকরণেও ব্রি রেখেছে যুগান্তকারী অবদান। ব্রি’র ফার্ম মেশিনারি অ্যান্ড পোস্ট-হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত ৫০টিরও বেশি কৃষিযন্ত্র উদ্ভাবন করেছে।
প্রতিষ্ঠালগ্নে ব্রির কার্যক্রম ছিল সীমিত পরিসরে। কয়েকটি গবেষণা বিভাগ এবং হাতে-গোনা কিছু বিজ্ঞানী নিয়ে কাজ শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্রি প্রসারিত হয়েছে। এখন সদর দপ্তরে রয়েছে ১৯টি গবেষণা বিভাগ, ২০টিরও বেশি আধুনিক গবেষণাগার, উন্নতমানের জার্মপ্লাজম সেন্টার বা জিন ব্যাংক, গ্রিনহাউস, নেট হাউস ও ৭৬ একরেরও বেশি পরীক্ষণ মাঠ। সারা দেশে ১৭টি আঞ্চলিক কার্যালয় এবং ৬টি স্যাটেলাইট স্টেশনের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে এখানে ৩১৮ জন বিজ্ঞানীসহ ৮০০ জনেরও বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করছেন, যাদের মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ উচ্চতর ডিগ্রিধারী।
দেশে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেলেও খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে চারগুণেরও বেশি। ১৯৭০-১৯৭১ সালে এদেশে জনসংখ্যা ছিল ৭ কোটি আর চালের উৎপাদন ছিল মাত্র ১ কোটি টন। ৫৫ বছরের ব্যবধানে আজ ২০২৫ সালে এসে দেশে যখন জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি। আগে যে জমিতে হেক্টরপ্রতি ২-৩ টন ফলন হতো এখন উফশী জাতের ব্যবহারের কারণে ফলন হচ্ছে ৬-৮ টন। বর্তমানে চাল উৎপাদন হচ্ছে ৪ কোটি ১৯ (২০২৪-২৫ অর্থবছর) লাখ টনের বেশি। এই উৎপাদন বৃদ্ধির পেছনে ব্রি উদ্ভাবিত জাতের অবদান প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ। বর্তমানে দেশের মোট ধান জমির প্রায় ৭৭ শতাংশে ব্রি উদ্ভাবিত জাত চাষ করা হয়। বোরো মৌসুমের ধানের ৮২ শতাংশ, আউশ মৌসুমের ৩৬ শতাংশ এবং আমন মৌসুমের ৪৭ শতাংশ জমিতে ব্রি জাতের ধান চাষ হচ্ছে। একসময় নিয়মিত চাল আমদানি করত বাংলাদেশ। কিন্তু ব্রির আধুনিক জাত ও প্রযুক্তির কারণে ১৯৯০ সালের দিকে দেশ খাদ্যে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণতার কাছাকাছি পৌঁছে। বর্তমানে বাংলাদেশ চাল উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয়।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় ব্রি প্রণয়ন করেছে ‘রাইস ভিশন ২০৫০’ এবং ‘ডাবলিং রাইস প্রডাক্টিভিটি’ নামে দুটি কৌশলপত্র। এতে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২০৩০ সালের মধ্যে ধানের উৎপাদনশীলতা দ্বিগুণ করা, ২০৪১ সালের মধ্যে টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ২০৫০ সালের মধ্যে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণ। গবেষণার অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে অতি উচ্চ ফলনশীল জাত (১২-১৪ টন/হেক্টর), হাইব্রিড ও ট্রান্সজেনিক ধান, প্রতিকূল পরিবেশসহিষ্ণু জাত, অধিক ভিটামিন ও আয়রনসমৃদ্ধ ধান এবং রপ্তানিযোগ্য সুগন্ধি জাত উদ্ভাবনে। একই সঙ্গে কৃষি যন্ত্রপাতির উন্নয়ন ও ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষিকে স্মার্ট ও আধুনিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, উৎপাদন গতিশীলতার এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালে চালের উৎপাদন হবে ৪ কোটি ৭২ লাখ টন। বিপরীতে ২০৫০ সালে ২১ কোটি ৫৪ লাখ লোকের খাদ্য চাহিদা পূরণে চাল প্রয়োজন হবে ৪ কোটি ৪৬ লাখ টন। অর্থাৎ চালের বর্তমান উৎপাদন প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালে দেশে ২৬ লাখ টন চাল উদ্বৃত্ত থাকবে। এই অভীষ্ট লক্ষ্য সামনে রেখে ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কাজ করছে ব্রির বিজ্ঞানীরা।
ধান গবেষণায় ব্রি’র সাফল্য ছড়িয়ে দেশের সীমা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও। ব্রি’র উদ্ভাবিত ধানের জাত দেশের সীমা ছাড়িয়ে বিদেশেও আবাদ হচ্ছে। বেশ কিছু দেশে যেমনÑ ভারত, নেপাল, ভুটান, ভিয়েতনাম, মিয়ানমার, চীন, কেনিয়া, ইরাক, ঘানা, গাম্বিয়া, বুরুন্ডি ও সিয়েরালিয়েনসহ অনেক দেশে ব্রি উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত ব্যবহার করছে। পৃথিবীর ১৪টি দেশে বর্তমানে ১৯ জাতের ব্রি ধানের আবাদ হচ্ছে। বিজ্ঞান ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্রি তিনবার স্বাধীনতা দিবস স্বর্ণপদক ও তিনবার রাষ্ট্রপতির স্বর্ণপদক, দুইবার জাতীয় কৃষি পদকসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ৩০টি পুরস্কার লাভ করেছে।
খাদ্যে স্বনির্ভরতার সংগ্রাম থেকে শুরু করে কৃষিকে আধুনিক ও যান্ত্রিকী কৃষিতে রূপান্তরের প্রতিটি পদক্ষেপে ব্রি’র অবদান স্পষ্ট। বলা যায়, ব্রি কেবল একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান নয় বরং এটি খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষকের উন্নয়ন এবং জাতীয় সমৃদ্ধির প্রতীক। দেশের মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় ব্রির সাফল্যের এই ধারা অব্যাহত থাকুক।