× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

অর্থনীতি

গৃহস্থালি কাজে নারীর শ্রমের মূল্যায়ন জরুরি

ড. মিহির কুমার রায়, গবেষক ও অধ্যাপক

প্রকাশ : ০৫ অক্টোবর ২০২৫ ১১:২১ এএম

গৃহস্থালি কাজে নারীর শ্রমের মূল্যায়ন জরুরি

জিডিপিতে গৃহকর্মের অবৈতনিক কাজের অবদান ৬ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। বিনা বেতনে, অদেখা নয়, বাংলাদেশ নারীদের বিনা বেতনে সেবা এবং গৃহস্থালির কাজ স্বীকৃতি দিয়ে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং ইউএন উইমেন বাংলাদেশ, বিশ্বব্যাপী উইমেন কাউন্ট প্রোগ্রামের সহায়তায় এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) প্রোডাকশন সেলেলাইট অ্যাকাউন্টে (এইচপিএসএ) কারিগরি সহায়তায় প্রকল্পে বাংলাদেশে অবৈতনিক গৃহস্থালি এবং যত্নের কাজের এই অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বিনা বেতনে গৃহস্থালি এবং যত্নের কাজ যেমন রান্না করা, লন্ড্রি পরিষ্কার করা, গৃহস্থালি ব্যবস্থাপনা এবং শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং স্বাস্থ্যগত সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য সেবা করা অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু নারীরা বেশিরভাগ কাজই সম্পাদন করেন, যা অপরিহার্য কিন্তু প্রচলিত অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান থেকে বাদ দেওয়া হয়। আরও জানানো হয়, বিবিএস সময় ব্যবহার জরিপ ২০২১ এবং শ্রমশক্তি জরিপ ২০২২-এর ওপর ভিত্তি করে এইচপিএসএ অনুমান করে যে, ২০২১ সালে অবৈতনিক গৃহস্থালি এবং যত্নের কাজের অবদান ৬ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন টাকা, যা জিডিপির ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ। 

অবৈতনিক কাজের যে অবদান এর মধ্যে ৮৫ শতাংশ ছিল নারীদের অবদান। ইউএন উইমেন বাংলাদেশের প্রোগ্রাম বিশ্লেষক মিসেস নুবায়রা জেহিন একটি কেয়ার ক্যালকুলেটর ব্যবহার করে প্রতিবেদনের প্রেক্ষাপট নির্ধারণ করেন। যেটি একটি টুল যা ব্যক্তিদের প্রতিদিন অবৈতনিক গৃহস্থালি এবং যত্নের কাজে ব্যয় করা সময় পরিমাপ করতে সাহায্য করে। বিবিএস জানায়, আইন ও নীতিমালার সঙ্গে অবৈতনিক কাজকে একীভূত করার জন্য একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা দরকার। এ ছাড়া জাতীয় বাজেট এবং উন্নয়ন কৌশলগুলোতে ঘরের কাজের বিষয়টি অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। উপযুক্ত যত্নের চাকরি এবং অবৈতনিক কাজের ওপর টেকসই অর্থায়ন ও নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ নিশ্চিত করতে হবে। পুরুষ ও ছেলেদের যত্নের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যমে সামাজিক রীতিনীতিকে চ্যালেঞ্জ করা প্রয়োজন।

সম্প্রতি বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে (বিআইডিএস) ‘কেয়ার রেসপনসিবিলিটি অ্যান্ড উইমেনস ওয়ার্ক ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে নারীর গৃহস্থালি কাজের ব্যস্ততা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বিষয়ে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। যেমনÑ 

এক. ১৫-২৪ বছরের নারীরা শ্রমবাজারে অংশগ্রহণে গৃহস্থালির কাজকে প্রধান বাধা হিসেবে দেখছেন। নারী সপ্তাহে গৃহস্থালির ২০ ঘণ্টা কাজ করেন। কিন্তু একই বয়সি পুরুষরা সপ্তাহে মাত্র ৫ ঘণ্টা কাজ করেন। অর্থাৎ গৃহস্থালিতে নারীরা পুরুষের চেয়ে চার গুণ বেশি কাজ করেন। 

দুই. যৌথ পরিবারের নারীরা গৃহস্থালির কাজে কম সময় ব্যয় করেন। ফলে উৎপাদনমুখী কাজের সুযোগ তাদের বেশি থাকে। 

তিন. শিশুর প্রতি যত্ন নারীর কাজে বড় প্রভাব ফেলে। বাড়িতে যদি পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশু থাকে, তবে নারীর উৎপাদনশীল কাজে সময় কমে যায় আর গৃহস্থালি কাজে সময় বেড়ে যায়।

চার. শিক্ষার ক্ষেত্রেও ভিন্নতা রয়েছে। প্রাথমিক বা মাধ্যমিক শিক্ষায় বড় পার্থক্য না থাকলেও উচ্চশিক্ষা পাওয়া নারীরা বাইরে কাজ করার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বেশি স্বাধীনতা পান। 

পাঁচ. শিক্ষিত হয়েও প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের বাইরে থেকে যাচ্ছে বাংলাদেশের নারীদের বড় একটি অংশ। পরিবারের সেবাযত্নের দায়িত্ব বর্তানোয় বাইরের কাজে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না তারা।

ছয়. এমনকি ৬৫ বছরের বেশি বয়সি নারীরাও পুরুষের তুলনায় দ্বিগুণ সময় গৃহস্থালির কাজে ব্যয় করেন। একইভাবে ২০১৬ সালের শ্রমশক্তি জরিপের (এলএফএস) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশে নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ বাড়লেও তা মূলত গৃহভিত্তিক কাজের মাধ্যমে বাড়ছে; অফিস, কারখানা বা কৃষিকাজের মতো প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান দিয়ে নয়। কর্মজীবী নারীদের একটি বড় অংশ শিশু, বয়স্ক বা অসুস্থ সদস্যদের যত্ন এবং সংসারের কাজ সামলে আয় করছে। এখনও ৬৬ শতাংশ নারী শ্রমশক্তির বাইরে রয়েছেন, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ২০ শতাংশ। দেখা যায়, গ্রামীণ নারীদের ঘরের বাইরের কৃষিকাজে অংশগ্রহণ ২০১০ সালে ৬৪ শতাংশ থেকে কমে ২০১৬ সালে ২১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তারা কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং অন্যান্য অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজের দিকে ঝুঁকেছেন। অন্যদিকে শহুরে নারীদেরও ঘরের বাইরের কাজে অংশগ্রহণ কমেছে।

উল্লিখিত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায়, কর্মক্ষম অধিকাংশ নারীই আজও ঘরের কাজে মাত্রাতিরিক্ত সময় দেওয়ায় তার যে অফিস-আদালতে কাজের মেধা রয়েছে, তা তিনি জানতেই পারেন না। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় বিয়ের আগে ভালো চাকরিতে থাকলেও বিয়ের পর স্বামীর আবাসস্থল ও কর্মস্থলে চলে যেতে হয় বলে তিনি তার ভালো চাকরিটিও ছাড়তে দ্বিধা করেন না। অসংখ্য মেধাবী প্রকৌশলী, বিজ্ঞানের ছাত্রী তার ভালো পেশা ছেড়ে স্বামীর সঙ্গে বিদেশে পাড়ি জমান। ফলে নারীর মেধার অপচয় হয়। গৃহস্থালির কাজে আমাদের দেশে হোম মেকার নারীরা অতিরিক্ত ব্যস্ত থাকায়, তারা এর পাশাপাশি আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হওয়ার যে পথ তা বন্ধ হয়ে যায়। গৃহস্থালির কাজ যদি তাকে কম করতে হতো, তবে তিনি এর পাশাপাশি সাইড বিজনেস করতে পারতেন, উদ্যোক্তা হতে পারতেন। কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট এমন যে, ঘরের যাবতীয় কাজ যেমনÑ রান্নাবান্না, বাসার সবার দেখভাল, শিশুদের স্কুল থেকে আনা-নেওয়া, শিশুর পড়াশোনার খোঁজ রাখাÑ সবকিছু নারীর একাই করতে হয়। 

স্বাভাবিকভাবেই নারী এরপর আর কোনো কিছু করার এনার্জি পান না। কিন্তু তাকে এর পাশাপাশি কাজের সুযোগ দিলে তিনি হয়তো তার অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগাতে পারতেন। পরিবারকে আর্থিক সাপোর্ট দিতে পারতেন। তার মানসিক শান্তি বজায় থাকত। আমাদের দেশে যারা কর্মজীবী নারী তারাও অফিসের কাজের পর বাসার কাজে অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু সেই কর্মজীবী নারীকে যদি ঘরে কিছুটা অবসর দেওয়া হতো, তবে তিনি হতে পারতেন একজন লেখক চিত্রশিল্পী। আরেকটি বিষয় হলো, আমাদের দেশে এখন যৌথ পরিবার নেই বললেই চলে। এর ভয়াবহ ফল হলোÑ সন্তান মানুষ করার জন্য মায়ের পাশে কেউ নেই এবং তাই বেশিরভাগ নারীকে চাকরি ছাড়তে হচ্ছে। ওপরের প্রতিবেদনেই দেখা যায় যে, যৌথ পরিবারের নারীরা গৃহস্থালির কাজে কম সময় ব্যয় করেন। ফলে উৎপাদনমুখী কাজের সুযোগ তাদের বেশি থাকে। সেই সঙ্গে আরেকটি আশঙ্কাজনক বিষয় হচ্ছে যে, দেশে মাত্র ৫৫ শতাংশ শিশুকে মাতৃদুগ্ধ পান করানো হয়। আগে এটি বেশি ছিল, এখন কমে গেছে। শিশুদের তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এর কারণ যেসব মা চাকরি করতে ঘরের বাইরে বের হচ্ছেন সেখানে ডে কেয়ারের অভাবে সন্তানকে সঙ্গে নিতে পারছেন না, শিশু বঞ্চিত হচ্ছে তার প্রাপ্য অমূল্য খাদ্য থেকে। 

দেখা গেছে, পোশাক কারখানায় ডে কেয়ার সেন্টারগুলোও অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত সুফল দিতে ব্যর্থ হয়, ফলে মায়েরা সন্তানদের সেখানে নিয়ে যেতে পারেন না। অস্থির এ সময়ে যেখানে দ্রব্যমূল্য আকাশচুম্বী, সেখানে একজনের আয়ে সংসার চালাতে বেশিরভাগ মধ্যবিত্ত পরিবার হিমশিম খাচ্ছে। এ অবস্থায় পরিবার পালনসহ নারীর নিজস্বতা প্রকাশের জন্য বিভিন্ন পেশায় জড়ানো আবশ্যক। তাই বিষয়গুলোর ওপর আরও বিস্তারিত সামাজিক গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা