অটোরিকশার দৌরাত্ম্য
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০৫ অক্টোবর ২০২৫ ১১:১৭ এএম
দেশের যোগাযোগব্যবস্থায় এক সময় শহর থেকে গ্রাম সর্বত্রই স্বল্প দূরত্বের অন্যতম বাহন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল রিকশা। তিন চাকার এই বাহনটির সঙ্গে মানুষের বন্ধন ছিল গভীর এবং প্রাসঙ্গিক। বিশেষ করে সহজেলভ্য, পরিবেশবান্ধব এবং কম খরচে চলাচলের সুবিধার জন্য। কিন্তু সময়ের হাত ধরে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এই রিকশা এখন রূপ নিয়েছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায়। যাকে প্রযুক্তির ভাষায় ‘ইজিবাইক’ও বলা হয়। পরিবর্তনটি যাত্রীদের চলাচলে কিছুটা আরাম এনেছে সত্যি। তবে এখন তা খুবই বিপজ্জনক। যা গোটা দেশের সড়ক ব্যবস্থাকে এক গভীর সংকটে ঠেলে দিয়েছে। প্রথমদিকে শহরাঞ্চলে সীমিত পরিসরে ব্যাটারিচালিত এই বাহনটি দেখা গেলেও এখন প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে মহাসড়ক পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। খোদ রাজধানীতেই দাপিয়ে বেড়াচ্ছেÑ ট্রাক, বাস, অ্যাম্বুলেন্সসহ উচ্চগতির যানবাহনের পাশাপাশি। অনুমোদনহীন, বেপরোয়া ও অনিয়ন্ত্রিত অটোরিকশাগুলো এখন রাজধানীর যানজটের অন্যতম কারণ। এই খুদে যানের কার্যকর কোনো ব্রেক সিস্টেম নেই। অধিকাংশ চালকের নেই কোনো ট্রেনিং, নেই লাইসেন্সও।
বিস্ময়কর সত্য হচ্ছে, হাইকোর্টের এক নির্দেশনায় মহাসড়কে এ ধরনের অটোরিকশার চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ কোথাও চোখে পড়ছে না। উল্টো তাদের বেপরোয়া চলাচল প্রতিনিয়তই বাড়িয়ে তুলছে দুর্ঘটনা, প্রাণহানি এবং ভোগান্তি। রিকশায় উঠলে চালকরা যেন সামনে-পেছনে তাকানোর সুযোগই পান না। হঠাৎ ব্রেক কিংবা অপ্রত্যাশিত মোড় নেওয়া যাত্রীদের জন্য এক ভয়ের অভিজ্ঞতা। ফলে প্রতিদিনই ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। দ্রুতগতির গাড়ি থেকে শুরু করে সাধারণ পথচারীÑ সবাই পড়ছেন বিপদের মুখে। তবুও থামছে না, থামানো যাচ্ছে না অটোরিকশার দৌরাত্ম্য।
৪ অক্টোবর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ “‘টেসলায়’ বরবাদ পথের শৃঙ্খলা” শীর্ষক প্রতিবেদন বলছে, রাজধানীতে অটোরিকশার মোট সংখ্যা কত তার সঠিক পরিসংখ্যান কারও জানা নেই। বরং প্রতিদিনই বিভিন্ন পেশা থেকে শ্রমজীবী মানুষ অটোরিকশা চালকের পেশায় ভিড় করছে। কেবল অলিগলিই নয়, রাজধানীর প্রধান সড়কগুলো প্রায় দখল করে ফেলেছে অটোরিকশা। কোনোভাবেই তা আটকানো যাচ্ছে না। চালক, মালিক, ট্রাফিক পুলিশ, সাধারণ যাত্রী, পথচারীÑ সবারই আতঙ্ক যেন এই বাহনটি। জানা গেছে, ঢাকাতেই প্রায় ১৫ লাখ অটোরিকশা রয়েছে। পায়েচালিত রিকশার ভাড়া বেড়ে যাওয়ায়, তুলনামূলক কম খরচে যাতায়াতে মানুষ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দিকে ঝুঁকছে। অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ করে নিতে হয় বিদ্যুতের মাধ্যমে। এর জন্য অনেকেই এই যানবাহনকে বাংলাদেশের ‘টেসলা’ নামে ডেকে থাকেন। এ অটোরিকশায় আয় যেমন বেশি, তেমনি বিনিয়োগও উঠে আসে দ্রুত। ফলে এর বিস্তার দ্রুত বাড়ছে বিপজ্জনক হারে। এ বিষয়ে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হাদিউজ্জামান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমাদের দেশের মতো এত সহজভাবে যান্ত্রিক যান নিয়ে রাস্তায় নামার নজির পৃথিবীতে নেই। এটা নিয়ে সব সময় রাজনীতি হয়েছে। সরকারের এই যান নিয়ন্ত্রণের ইচ্ছা কখনোই ছিল না। এর পিছনে প্রায় ১০-১৫ হাজার কোটি টাকার মার্কেট তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে বহুপক্ষীয় স্বার্থ আছে। বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে সামষ্টিক নীতিমালা তৈরি করতে হবে। কারণ এটা এখন কেবল জীবিকা নয়, একটা ব্যবসা। এখানে অনেক স্টেকহোল্ডার। তাই সরকারকে কৌশলী হতে হবে।’ এই মন্তব্যের সূত্র ধরে বলতে চাই, সরকারকে বহুপাক্ষিক সমীক্ষা করে এখনই অটোরিকশার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। অন্যথায় সময় যতই গড়াবে সংকটটি ততই ঘনীভূত হবে। ভুলে গেলে চলবে না, ঢাকায় অটোরিকশা দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি কেবল যানজটই বাড়াচ্ছে না, সড়কের শৃঙ্খলাও নষ্ট করছে।
আমরা মনে করি, রাজধানী থেকে ধীরে ধীরে অটোরিকশা বন্ধ করতে হলে পরিকল্পিত পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, সরকারকে বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। যেসব রুটে অটোরিকশা চলে, সেখানে পর্যাপ্ত বাস সার্ভিস চালু করা জরুরি। পাশাপাশি ছোট আকারের ইলেকট্রিক মিনি বাস বা শাটল বাস চালু করা যেতে পারে, যা যাত্রীদের দ্রুত ও নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছতে সহায়তা করবে। দ্বিতীয়ত, অটোরিকশা চালকদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ জীবিকার তাগিদে অনেকেই এই পেশায় যুক্ত। তাদের জন্য ড্রাইভিং ট্রেনিং, বিকল্প কর্মসংস্থান ও সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা দরকার, যাতে হঠাৎ অটোরিকশা বন্ধ হয়ে গেলে তারা বিপদে না পড়ে। তৃতীয়ত, রাজধানীতে নির্দিষ্ট সড়ক ও রুটে অটোরিকশা প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে এবং নিয়ম ভাঙলে কঠোর জরিমানার ব্যবস্থা নিতে হবে। সড়কের শৃঙ্খলা ফেরাতে বিদ্যমান আইনের পাশাপাশি প্রয়োজনে আরও কঠিন বিধি যুক্ত করে, তা যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, মেট্রোরেল ও বিআরটি প্রকল্পকে আরও কার্যকর ও যাত্রীবান্ধব করতে হবে, যাতে মানুষ স্বেচ্ছায় এই আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকে পড়ে। আমরা চাই, ঢাকার সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং যানজট কমাতে অটোরিকশা ধাপে ধাপে বন্ধ করা হোক। তবে তা অবশ্যই বিকল্প পরিবহন ও চালকদের পুনর্বাসনের মাধ্যমে হতে হবে, যাতে যাত্রীসেবা ও জীবিকা দুটোরই ভারসাম্য রক্ষা হয়।