ইমেইল থেকে
জেসমিন চৌধুরী
প্রকাশ : ০৪ অক্টোবর ২০২৫ ১২:১৯ পিএম
আমাদের জাতীয় বাস্তবতায় গরিব ও অসহায় গর্ভবতী মায়েদের স্বাস্থ্যঝুঁকির চিত্র এক গভীর সংকটের নামান্তর। পুষ্টির মারাত্মক ঘাটতি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অপ্রাপ্যতা, চিকিৎসা সুবিধার অপ্রতুলতা, কুসংস্কারাচ্ছন্ন সামাজিক মানসিকতা, পারিবারিক অবহেলা এবং রাষ্ট্রীয় উদাসীনতাÑ সবকিছু মিলিত হয়ে তাদের জীবনকে মৃত্যুভয়ের শীতল অন্ধকারে নিক্ষেপ করেছে। অথচ এই নারীরাই আগামী দিনের নাগরিককে পৃথিবীর আলো দেখাবেন। তাদের অনিরাপদ মাতৃত্ব মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বকে বিপন্ন করা।
দারিদ্র্য নামক অদৃশ্য শৃঙ্খল তাদের প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় যেন অমোঘ বিধিনিষেধের মতো উপস্থিত। ভোর থেকে গভীর রজনি পর্যন্ত দিনমজুরের স্ত্রী, রিকশাচালকের জীবন সঙ্গিনী কিংবা শহরের বস্তিবাসী পোশাক কর্মী নারীÑ প্রত্যেকেই সংসারের ভার বহন করতে গিয়ে গর্ভাবস্থার প্রয়োজনীয় যত্ন থেকে বঞ্চিত হন। খাবারের টেবিলে পর্যাপ্ত আহারই যখন অনুপস্থিত, তখন গর্ভধারণকৃত মায়ের জন্য বিশেষ পুষ্টিকর খাদ্য সংগ্রহ প্রায় অসম্ভব। তাদের নিত্যদিনের খাদ্যতালিকা সীমাবদ্ধ থাকে ভাত, আলু, ডাল কিংবা সামান্য শাকসবজিতে। দুধ, ডিম, মাছ কিংবা মাংস তাদের কাছে দুর্লভ স্বপ্নমাত্র। বাস্তবতা হলো, পুষ্টির অভাবে রক্তশূন্যতায় ভোগেন এবং প্রসবকালে সামান্য রক্তক্ষরণই তাদের জীবনহানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে তাদের অবস্থা আরও শোচনীয়। গ্রামীণ অঞ্চলে কিংবা শহরের প্রান্তিক এলাকায় বসবাসকারী নারীরা চিকিৎসাসেবার নাগাল পান না। একজন গর্ভবতী নারীর অন্তত চারবার চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অপরিহার্য। কিন্তু অর্থাভাবে, দূরত্বের কারণে কিংবা চিকিৎসাকেন্দ্রের অপ্রতুলতার দরুন তারা তা করতে পারেন না। স্থানীয় কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতেও চিকিৎসক অনুপস্থিত থাকেন, ওষুধ থাকে না, প্রশিক্ষিত ধাত্রীও পাওয়া যায় না। ফলে তাদের নির্ভর করতে হয় অদক্ষ ধাত্রী বা কবিরাজের ওপর, যা প্রসবকালীন জটিলতার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে।
বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যুর হার এখনও উদ্বেগজনক। পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি লাখে প্রায় ১৬৫ জন মা প্রসবজনিত জটিলতায় প্রাণ হারান। এর মধ্যে গরিব ও অসহায় শ্রেণির নারীরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। এ মৃত্যুর পেছনে প্রধান কারণ হলোÑ রক্তশূন্যতা, ঝুঁকিপূর্ণ প্রসব, চিকিৎসকের অনুপস্থিতি ও দারিদ্র্যজনিত সীমাবদ্ধতা। এ যেন রাষ্ট্রের জন্য লজ্জাজনক সত্য।
আসলে গর্ভবতী মায়ের শারীরিক দুর্বলতা আর মানসিক চাপ সমাজের এক দীর্ঘস্থায়ী লঘু চেতনার প্রতিফলন। মাতৃত্বকে বোঝা নয়, বরং আশীর্বাদ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রÑ তিনটি স্তর একযোগে যদি কাজ করে, তবে গরিব মায়ের জীবনধারার মান উন্নত হবে। শিক্ষার মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি, পুষ্টির মাধ্যমে শারীরিক সুস্থতা, চিকিৎসা সহজলভ্য করার মাধ্যমে ঝুঁকি হ্রাস এবং সামাজিক সহমর্মিতার মাধ্যমে মানসিক চাপ কমানো সম্ভব। আমরা চাই, মা নিরাপদে থাকুক, শিশু সুস্থভাবে জন্ম নিকÑ তবে সত্যিকারের উন্নয়ন ও মানবিক সমাজের স্বপ্ন পূর্ণ হবে।