ইমেইল থেকে
মোছা. শাকিলা খাতুন
প্রকাশ : ০৪ অক্টোবর ২০২৫ ১১:৫৫ এএম
কন্যাসন্তান আজও যেন এক অচেনা দায়, এক অযাচিত বাস্তবতা, সমাজের এক বিরক্তিকর ছাপ। যুগ পাল্টেছে, পৃথিবী এগিয়েছে, প্রযুক্তির আলোয় আলোকিত হয়েছে গ্রাম থেকে শহর, তবুও আমাদের মানসিকতার গভীরে গেঁথে আছে এক পশ্চাৎপদ চিন্তাÑ কন্যাসন্তান জন্ম মানে অভিশাপ, আর পুত্রসন্তান জন্ম মানে আশীর্বাদ। এই ধারণা কেবল বাংলাদেশেই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার এক বড় অংশজুড়ে বহমান। শহরের বহুতল ফ্ল্যাটের ভেতরে কিংবা প্রত্যন্ত গ্রামের কুঁড়েঘরেÑ সবখানেই এই মানসিকতা কখনও আড়ালে, কখনও প্রকাশ্যে সক্রিয়।
মেয়ে সন্তান জন্মালে হাসি ম্লান হয়ে যায়, আনন্দের বদলে দীর্ঘশ্বাস বয়ে যায়, কখনও-বা মিষ্টির প্যাকেটে ভরে আনা হয় বালু-মাটি। আবার কোথাও এক নারীকে বলা হয়, ছেলে না হলে সংসার টিকবে না। অন্যদিকে আছে এমন পরিবার যেখানে মেয়ে সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য স্বামী দ্বিতীয় বিয়ের হুমকি দেয়, কিংবা শ্বশুরবাড়ি থেকে বের করে দেয়। এইসব ঘটনা নিছক কিছু বিচ্ছিন্ন কাহিনী নয়Ñ এগুলো হলো এক গোটা সমাজের দীর্ঘদিনের পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ।
সন্তান জন্মের ক্ষেত্রে মা-কে দায়ী করার প্রবণতা আমাদের সংস্কৃতিতে ভয়াবহভাবে রূপ নিয়েছে। বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিতÑ সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণ হয় পিতার শুক্রাণুর মাধ্যমে। শুক্রাণুর এক্স ও ওয়াই ক্রোমোজোম মায়ের ডিম্বাণুর সঙ্গে মিলিত হয়ে নির্ধারণ করে সন্তান ছেলে হবে নাকি মেয়ে। মায়ের এখানে কোনো ভূমিকা নেই। তবুও সমাজের অসংখ্য পরিবার বিশ্বাস করে, মেয়ে সন্তান জন্ম দেওয়া মানেই মায়ের ব্যর্থতা। এই ব্যর্থতার দায়ে তাকে অপমান, নির্যাতন কিংবা অবহেলার শিকার হতে হয়।
জাতিসংঘের জনসংখ্যা বিষয়ক তহবিলের পরিসংখ্যান ভীতিকর এক চিত্র তুলে ধরে। প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৫ লাখ মেয়ে শিশুর ভ্রূণ নষ্ট করা হয় শুধু ছেলে সন্তানের আশায়। আরও প্রায় ১৭ লাখ মেয়ে শিশুর মৃত্যু ঘটে জন্মের পর অবহেলা, অযত্ন ও বৈষম্যের কারণে। অর্থাৎ কন্যা হয়ে জন্ম নেওয়াই যেন মৃত্যুদণ্ডের শামিল। এই নির্মম বাস্তবতা আমাদের সভ্যতার অগ্রগতির সব দাবি প্রশ্নবিদ্ধ করে। আমরা কি তবে আবারও সেই অমানবিক যুগে ফিরে যাচ্ছি, যখন কন্যাসন্তান জন্ম নিলে জীবন্ত কবর দেওয়া হতো? আজ হয়তো আর কবর দেওয়া হয় না, কিন্তু গর্ভেই তাদের হত্যা করা হচ্ছে, অথবা জন্মের পর বেঁচে থাকার মতো ন্যূনতম ভালোবাসা ও যত্নটুকুও তারা পাচ্ছে না।
বাংলাদেশের ভেতরেও এই প্রবণতা ভয়াবহ। জরিপে দেখা গেছে, প্রতি ১০০ কন্যাসন্তানের বিপরীতে ১০৫ পুত্রসন্তান জন্ম নিচ্ছে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য যেভাবে হওয়ার কথা, তা ভেঙে যাচ্ছে। এর অর্থ হলো কোথাও না কোথাও কন্যাসন্তান জন্ম ইচ্ছাকৃতভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আরেকটি জরিপ জানাচ্ছে, দেশে প্রায় ১৮ শতাংশ নারী নিজেরাই ছেলে সন্তানকে প্রাধান্য দেন। এটি আরও ভয়ংকর, কারণ এতে বোঝা যায়, নারীরাও এই সামাজিক চাপে বন্দি হয়ে গেছেন। তারা হয়তো ভ্রূণ পরীক্ষা করছেন, আবার জানা গেলে মেয়ে সন্তান, সেটিকে নষ্ট করতেও দ্বিধা করছেন না।
অন্যদিকে গ্রামীণ সমাজে কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়ার পর মায়েদের ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা প্রকট। কোথাও শ্বশুরবাড়ি থেকে বের করে দেওয়া, কোথাও অনাহারে রাখা, আবার কোথাও দ্বিতীয় বিয়ের হুমকি। কন্যাসন্তান জন্মকে পারিবারিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হয়। যৌতুকের চাপও বেড়ে যায়, কারণ মেয়ে মানেই ভবিষ্যতে আরেক বোঝা। অনেকে মনে করেন, মেয়ে পরিবারে অর্থনৈতিক ক্ষতি বয়ে আনে। ফলস্বরূপ মাকে বাড়তি যৌতুক দিতে বাধ্য করা হয়, অথবা অপমানের শিকার হতে হয়।
এই পরিস্থিতি শুধু বাংলাদেশেই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোতেও একই রকম। ভারতে বহু এলাকায় এখনও লিঙ্গনির্ভর গর্ভপাত প্রচলিত। পাকিস্তানে কিংবা নেপালে একই প্রবণতা। এই মানসিকতা ভেঙে না দিলে লিঙ্গসমতা কখনও প্রতিষ্ঠিত হবে না। মেয়েরা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে, স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্যের শিকার হবে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে পিছিয়ে থাকবে। তারা আত্মবিশ্বাস হারাবে, সমাজে নিজেদের মূল্যহীন ভাববে। আর এই দৃষ্টিভঙ্গি সমাজের অগ্রগতিকে থামিয়ে দেবে।
আজ প্রয়োজন এক নতুন সামাজিক চেতনার। মানুষকে বোঝাতে হবে কন্যাসন্তান জন্ম কোনো অপরাধ নয়, বরং আশীর্বাদ। তারা পরিবারকে সমৃদ্ধ করে, সমাজকে এগিয়ে নেয়, দেশকে আলোকিত করে। ইতিহাস সাক্ষী, অসংখ্য কন্যাসন্তান পৃথিবীর মানচিত্র বদলে দিয়েছে। আর তাই কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য মাকে দায়ী করা কেবল অজ্ঞতা নয়, এটি মানবতাবিরোধী মনোভাব। আমাদের দায়িত্ব এই অমানবিক ব্যাধি দূর করা।