পর্যবেক্ষণ
সাঈদ বারী, কলাম লেখক ও প্রকাশক
প্রকাশ : ০৩ অক্টোবর ২০২৫ ১১:৫৫ এএম
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবল উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিনের ফ্যাসিস্ট হাসিনার শাসনে জনগণের মধ্যে অসন্তোষ যেমন বেড়েছে, তেমনি বিকল্প নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক শক্তির প্রতি আকাঙ্ক্ষাও ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এমন প্রেক্ষাপটে বিএনপি দেশের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে নতুন আশার প্রতীক হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে, এই প্রথমবারই প্রথম বিএনপি তারেক রহমানের সরাসরি নেতৃত্বে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছে। যা রাজনীতির মঞ্চে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে তরুণ ভোটারদের গুরুত্ব অপরিসীম। জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তরুণ, যারা দীর্ঘ একচেটিয়া ক্ষমতা ও ব্যর্থতায় ক্লান্ত রাজনীতিতে নতুন নেতৃত্ব খুঁজছে। তাদের প্রত্যাশা কর্মসংস্থান, সুশাসন, স্বাধীন মতপ্রকাশ ও সুযোগের ন্যায্যতা। এই প্রজন্ম অনেকাংশে পুরনো রাজনীতির ব্যর্থতা প্রত্যক্ষ করেছে এবং এখন তারা বিকল্প চায়। বিএনপি যদি এই তরুণদের ভাষায় কথা বলতে পারে এবং তাদের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার মতো নীতি প্রণয়ন করতে পারে, তবে ভোটের বড় অংশ তাদের দিকে আসতে পারে। তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন ও সরাসরি নেতৃত্ব তরুণদের কাছে পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে প্রতিভাত হতে পারে।
একই সঙ্গে বিএনপির কাছে রয়েছে অতীতের রাজনৈতিক পুঁজি। জিয়াউর রহমানের সততা, প্রশাসনিক গতিশীলতা এবং সুশাসনের স্মৃতি এখনও অনেক প্রবীণ ভোটারের মনে গেঁথে আছে। খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াই, নারীর ক্ষমতায়নের প্রতীকী উপস্থিতি এবং সাহসী নেতৃত্ব নারীদের কাছে তাকে আজও জনপ্রিয় রেখেছে। যদিও বয়স ও অসুস্থতার কারণে তিনি সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে অংশ নিতে পারছেন না, তবুও তার প্রতি আবেগময় সমর্থন বিএনপির জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে। আওয়ামী দুঃশাসনের অভিযোগ, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং সাধারণ মানুষের হতাশাÑ সব মিলিয়ে একটি বিকল্প শক্তি হিসেবে বিএনপির প্রতি ঝুঁকতে জনগণ অনেকটা তৈরি হয়ে আছে।
বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে মাঠ পর্যায়ে সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি করে রেখেছে। যদিও দমননীতি ও গ্রেপ্তারের কারণে এই কাঠামো দুর্বল হয়েছে, তবে পরিস্থিতি অনুকূলে এলে সেই পুরনো কর্মিবাহিনী দ্রুত সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। নির্বাচনের দিনে ভোটারকে কেন্দ্রে নিয়ে আসা, প্রচারণা চালানো, ভোট পাহারা দেওয়াÑ এসব ক্ষেত্রে মাঠ পর্যায়ের সংগঠন অপরিহার্য। বিএনপির এই সাংগঠনিক শক্তি যদি পুনরুজ্জীবিত করা যায়, তবে তা নির্বাচনী লড়াইয়ে বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।
সবকিছুর কেন্দ্রে রয়েছে নির্বাচন প্রক্রিয়া। জনগণ আজ নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য তীব্রভাবে অপেক্ষা করছে। অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হলে জনআস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিএনপির সম্ভাবনা বাস্তব রূপ নিতে পারে কেবল তখনই, যখন নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হবে। আর সেই প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার জন্য বিএনপিকে কেবল নির্বাচনী প্রচারণা নয়, বরং রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ সৃষ্টি করতেও সচেষ্ট থাকতে হবে।
অবশ্য বিএনপির সামনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রথমত, দলীয় ঐক্য বজায় রাখা জরুরি। দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে দলের ভেতরে ভিন্নমত ও মতবিরোধ তৈরি হয়েছে, যা নির্বাচনী সময়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে। দ্বিতীয়ত, নতুন রাজনৈতিক শক্তি ও তরুণদের প্লাটফর্মও এখন দৃশ্যমান হয়ে উঠছে, যারা ভোট ভাগাভাগির মাধ্যমে বিএনপির সম্ভাবনা কমিয়ে দিতে পারে। তৃতীয়ত, প্রশাসনিক বাধা ও প্রক্রিয়াগত দুর্বলতা থাকলে বিএনপি কার্যত মাঠে পরাজিত অবস্থায় পড়তে পারে। চতুর্থত, নেতৃত্বের প্রশ্নে তারেক রহমান জনপ্রিয় হলেও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার অভাব একটি বিতর্কিত জায়গা হয়ে থাকতে পারে।
বাংলাদেশ এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। জনগণ পরিবর্তন চায়, তরুণরা বিকল্প চায়, নারীরা আশ্বাস চায়, আর সাধারণ মানুষ চায় সুশাসন। বিএনপি যদি তারেক রহমানের নেতৃত্বকে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারে, মাঠ পর্যায়ের সংগঠনকে শক্তিশালী করতে পারে, নারী ও তরুণ ভোটারদের কাছে বাস্তবসম্মত প্রতিশ্রুতি দিতে পারে এবং সর্বোপরি নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিকে জনগণের সঙ্গে একত্রিত করতে পারে, তবে তাদের জয় শুধু সম্ভাবনা নয়, বরং একটি বাস্তব রাজনৈতিক বিকল্পে রূপ নিতে পারে। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন কৌশলগত সুসংগঠন, দায়িত্বশীল নেতৃত্ব এবং জনগণের আস্থা অর্জনের আন্তরিক প্রচেষ্টা।
বাংলাদেশের জনগণ এখন সেই রাজনৈতিক শক্তিকেই বেছে নিতে প্রস্তুত, যারা সত্যিই বিকল্প হিসেবে নিজেদের প্রস্তুত করতে পেরেছে। বিএনপি যদি সেই প্রস্তুতির প্রমাণ দিতে পারে, তবে আগামী নির্বাচনে তাদের জয় কেবল কল্পনা নয়, বাস্তবও হতে পারে।