রাজনীতি
মো. ইলিয়াস হোসেন
প্রকাশ : ০২ অক্টোবর ২০২৫ ১১:৪৭ এএম
২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের ‘খলনায়ক’ শেখ হাসিনা সরকারের সর্বশেষ প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল গত ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪, তার পদত্যাগের আগে দেওয়া বক্তব্যে দেশের নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কারের নিমিত্তে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর সমরূপতার (হোমজিনিটি) প্রেক্ষিতে ভবিষ্যতে সংখানুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচনের বিষয়ে প্রস্তাবনা রেখে যান, যা গত এক বছর যাবৎ বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল এবং সুশীল সমাজে এ নিয়ে বেশ আলোচনা হয়েছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক গঠিত ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ বেশ কয়েকটি ধর্মীয় রাজনৈতিক দলের ‘পিআর’ পদ্ধতিতে নির্বাচনে ব্যাপক আগ্রহের প্রেক্ষিতে আগামীর নির্বাচন আয়োজন কিছুটা অনিশ্চয়তায় পড়বে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। তবে এই পদ্ধতি আমাদের দেশের আম-জনতার কাছে কতটুকু গ্রহণযোগ্য সেটাই সর্বাগ্রে বিবেচ্য। তার আগে বর্তমান বিশ্বে প্রচলিত নির্বাচন ব্যবস্থা সম্পর্কে একটু জানা দরকার।
বিশ্বে বেশ কয়েকটি প্রচলিত নির্বাচন ব্যবস্থা রয়েছে, যার মাধ্যমে দেশগুলো তাদের জনগণের ভোটে সরকার নির্বাচন করে। নিচে প্রধান নির্বাচন পদ্ধতিগুলো তুলে ধরা হলো : ১। প্রথম পাস্ট দ্য পোস্ট, ২। আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর পদ্ধতি), ৩। রানঅফ নির্বাচন, ৪। র্যাঙ্কড চয়েস ভোটিং এবং ৫। মিশ্র নির্বাচন ব্যবস্থা।
প্রতিটি পদ্ধতির নিজস্ব সুবিধা ও অসুবিধা রয়েছে, যা সেই দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ এবং সামাজিক কাঠামোর ওপর নির্ভর করে। তবে আমি প্রথম দুটি পদ্ধতি নিয়েই আলাপ করতে চাই। কারণ, এদের মধ্যে প্রথমটি বর্তমানে বাংলাদেশে প্রচলিত আছে, আর দ্বিতীয়টি, বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনের অনুসরণের জন্য বিশেষ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের প্রচারণা চলছে, যা বর্তমানে প্রিন্ট এবং ইলেক্ট্রনিকসহ সোশ্যাল মিডিয়াতে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। প্রথমে আশা যাক,
প্রথম পাস্ট দ্য পোস্ট (ফার্স্ট পাস্ট দি পোস্ট)
এটি সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের ভিত্তিতে কাজ করা একটি পদ্ধতি, যেখানে একটি নির্দিষ্ট আসনে যে প্রার্থী সবচেয়ে বেশি ভোট পান, তিনি নির্বাচিত হন। ব্রিটেন, ভারত, কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো অনেক দেশে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। পাকিস্তান এবং বাংলাদেশেও ওয়েস্ট মিনিস্টার পদ্ধতিতে এ যাবৎ জাতীয় নির্বাচন হয়ে আসছে।
সুবিধা : এই পদ্ধতিতে ভোট গণনা এবং বিজয়ী নির্ধারণ সহজ এবং সরল। এই ধরনের নির্বাচনে সাধারণত বৃহৎ দলগুলো জয়ী হয়। ফলে একক দল ক্ষমতায় আসে এবং স্থিতিশীল সরকার গঠন হয়। এ ছাড়াও নির্বাচিত প্রার্থীর সঙ্গে তার নির্বাচনী এলাকার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপিত হয়। এতে ভোটের টার্ন-আউট ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়।
অসুবিধা : ছোট দল বা স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সাধারণত এই পদ্ধতিতে সাফল্য অর্জন করতে পারে না। কোনো প্রার্থী নির্বাচনে হারলে তার পক্ষে দেওয়া ভোটগুলো কার্যত বিফলে যায়। ফলে এতে অসম প্রতিনিধিত্ব অর্থাৎ ভোটের সংখ্যা এবং আসনের অনুপাতের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি হয়।
আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (প্রপোরশনেট রিপ্রেজেন্টেশনÑ পিআর)
এই পদ্ধতিতে দলগুলো প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে সংসদে আসন পায়। মূলত দলভিত্তিক নির্বাচনের প্রতীকের ওপর ভোটিং হয় এবং দলগুলো তাদের প্রাপ্ত আসনের অনুপাতে সংসদ সদস্য মনোনীত করে। জার্মানি, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ইসরায়েলসহ বিভিন্ন দেশে এই পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়।
সুবিধা : এই পদ্ধতিতে প্রতিটি ভোটের মূল্য থাকে এবং আসন বণ্টনে সঠিক প্রতিনিধিত্বের নিশ্চয়তা দেয়। ছোট দলগুলো সংসদে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ পায় এবং নানা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিনিধিত্ব সংসদে থাকে, যা নীতিনির্ধারণে বৈচিত্র্য আনে।
অসুবিধা : এই পদ্ধতির নির্বাচনে প্রায়ই কোনো একক দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়। ফলে জোট সরকার গঠন করতে হয়, যা স্থিতিশীলতার অভাব তৈরি করতে পারে। এতে নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া ধীর হতে পারে, কারণ বিভিন্ন দলের মধ্যে সমঝোতা প্রয়োজন হয়। তা ছাড়া এলাকাভিত্তিক কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থী না থাকা এবং দলের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে সদস্য নির্বাচিত হওয়ায় সংসদ সদস্যরা সরাসরি এলাকাবাসীর কাছে জবাবদিহি করতে কম বাধ্য থাকেন।
প্রতিটি নির্বাচন পদ্ধতির নিজস্ব সুবিধা ও অসুবিধা রয়েছে। প্রথম পাস্ট দ্য পোস্ট পদ্ধতিটি সহজ হলেও গণভোটের অপচয় ঘটায়। আনুপাতিক পদ্ধতি ছোট দলগুলোর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে, তবে জোট সরকারের ঝুঁকি বাড়ায়। কোনো পদ্ধতিই এককভাবে নিখুঁত নয়, তবে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে সঠিক নির্বাচন পদ্ধতি নির্বাচন করা গুরুত্বপূর্ণ।
ব্রিটিশ আমল থেকেই ভারতীয় উপমহাদেশে ওয়েস্ট মিনিস্টার পদ্ধতিতেই সকল জাতীয় নির্বাচন হয়ে আসছে। ব্রিটিশদের পর পাকিস্তান এবং ৭১-এর পরে স্বাধীন বাংলাদেশেও একই পদ্ধতিতে সকল জাতীয় নির্বাচন ‘প্রথম পাস্ট দ্য পোস্ট’ পরিচালিত হয়ে আসছে। যা আমাদের আম-জনতার মজ্জাগত। এই পদ্ধতিতে প্রান্তিক ভোটারের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীর সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের সুযোগ থাকে। ফলে ভোটারের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পায়। শুধু তাই-ই নয়, এতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীও ব্যাপক জনসংযোগ করে নিজের বিজয় নিশ্চিত করতে সচেষ্ট হয়। ফলে নির্বাচিত হওয়ার পরেও এলাকার প্রতি তার দায়বদ্ধতা এবং জবাবদিহিতা তৈরি হয়।
আমাদের দেশের জন্য প্রচলিত পদ্ধতিই যথাযথ বলে আমি মনে করি। এর সপক্ষের যুক্তিগুলো নিম্নরূপ- ১। পদ্ধতিটি আমাদের প্রান্তিক/তৃণমূল পর্যায়ের ভোটার থেকে শুরু করে শহরের সকলেরই জানা এবং ভোট গণনাও সহজ ও সরল, ২। এই পদ্ধতিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী/ নির্বাচিত প্রতিনিধির সঙ্গে তৃণমূল ভোটারদের সরাসরি সংযুক্তি ঘটে, যা এলাকার প্রতি জবাবদিহিতা এবং দায়বদ্ধতার সৃষ্টি করে।, ৩। এই পদ্ধতিতে ভোট কাস্টিং অনেক বেশি হয়, কারণ এতে উভয় পক্ষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ থাকে, ৪। নির্বাচিত প্রতিনিধি এলাকার সকল ধরনের সমস্যার বিষয়ে অবগত থাকায় তার সমাধান এবং এলাকার উন্নয়নের জন্য জাতীয় সংসদে কথা বলার সুযোগ পেতে পারেন। একইভাবে তৃণমূল পর্যায়ের লোকজনও সরাসরি তাদের নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের সমস্যার বিষয়ে অবগত করতে পারে। এতে সামাজিক বন্ধন অটুট থাকে, এবং ৫। অপরদিকে, আনুপাতিক সংখ্যার ভিত্তিতে সংসদ সদস্য নর্বাচিত হলে, তাদের সঙ্গে তৃণমূল জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ থাকার সম্ভাবনা কমে যেতে পারে। কারণ, যিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবেন তিনি যে এলাকায় নির্বাচনের প্রচারণা করেছেন সেই এলাকার প্রতিনিধি নাও হতে পারেন। এমনকি যিনি নির্বাচনে প্রচারণা করবেন তিনি সদস্য পদ নাও পেতে পারেন। এই পদ্ধতিতে যে সমস্যা সবচেয়ে বড় আকারে দেখা দেবে তা হলো :
ক. কাস্টিং ভোটের সংখ্যানুপাতের ভিত্তিতে সদস্য সংখ্যা নির্ধারিত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল কীভাবে তাদের অনুকূলে প্রাপ্ত সদস্যদের নির্বাচন করবেন তা নির্ভর করছে দলের নীতিনির্ধারকদের ওপরেÑ যেখানে অসচ্ছতা, অনিয়ম এবং দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হতে পারে। এ ছাড়াও অ-রাজনৈতিক ব্যক্তিদের অনুপ্রবেশ ঘটার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে, যেহেতু রাজনৈতিক দলের মধ্যেই যেখানে গণতন্ত্রের অভাব রয়েছে।
খ. দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হওয়ায় স্থানীয় জনগণের সঙ্গে দলের প্রচারণায় নিয়োজিত ব্যক্তির জনসংযোগ স্থাপনে আগ্রহের ঘাটতি পরিলক্ষিত হতে পারে। এতে সামগ্রিকভাবে ভোটের টার্ন-আউট ব্যাপক হারে কমে যেতে পারে। কেননা যিনি প্রচারণা করছেন তিনি নিজেই জানেন না তিনি আসলেই সদস্য পদ পাবেন কি না? ফলে স্থানীয় তৃণমূল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে রাজনৈতিক দলের নেতার জনবিচ্ছিন্ন হওয়া। এতে সার্বিকভাবে নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়ার শামিল।
গ. অনেকের ধারণাÑ এই পদ্ধতি অনুসরণের ফলে নির্বাচিত সরকারের স্বৈরাচারী হওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবেÑ আমি তা মনে করি না। কারণ কোনো বড় দল যদি দ্বিতীয়/তৃতীয় সারির কোনো দলের সঙ্গে জোট করে নির্বাচন করে, তাতে প্রতিবারেই তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ পাবে, চারিত্রিকভাবে তারাও যদি চায়, স্বৈরাচারী হওয়া থেকে তাদেরকে কি বিরত রাখা যাবে?
তাই নির্বাচন পদ্ধতির দিকে নজর না দিয়ে আমাদের উচিত আমাদের স্ব স্ব চরিত্রের উন্নয়ন করা, চিন্তাভাবনায় সততা, নিষ্ঠা, ন্যায্যতা এবং সাম্যতার ভিত মজবুত করা। পদ্ধতি যেটাই হোকÑ আমরা নিজেরা নৈতিকভাবে যতদিন না সৎ, নিষ্ঠাবান এবং মানবিক হতে পারব, ততদিন আমাদের সমাজ থেকে এই জঞ্জাল কখনোই দূর হবে না। তা ছাড়া নেতা নির্বাচনেও আমাদেরকে প্রচলিত পদ্ধতি এবং ধারণা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। রাজনীতির ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়Ñ যে নেতা সময়ের দাবি বুঝতে পারেন, তিনিই স্থায়ীভাবে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেন। তাই আজকের এই সময়ে, শুধু প্রতিশ্রুতিতে নয়, বরং সৎ, স্বচ্ছ, প্রযুক্তি-সচেতন, মানবিক, উদ্ভাবনী, জবাবদিহিমূলক ও দূরদর্শীসম্পন্ন জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে।
তাই আসুন, সংসদ নির্বাচনে প্রচলিত নিয়মেই আমরা এগিয়ে যাই। একই সঙ্গে দেশের দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের উৎপত্তিস্থল স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে নতুন করে ঢেলে সাজাই। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় নতুন পদ্ধতি অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে সংস্কার করে তাকে শক্তিশালী করি। তাহলেই স্থানীয় সরকার এবং জাতীয় সংসদের মধ্যে একটি ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হবে।